হারিয়ে যাওয়া ঝুলনের স্মৃতি, মাটির পুতুলে ঐতিহ্য বাঁচানোর লড়াই

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 14 h ago
হারিয়ে যাওয়া ঝুলনের স্মৃতি, মাটির পুতুলে ঐতিহ্য বাঁচানোর লড়াই
হারিয়ে যাওয়া ঝুলনের স্মৃতি, মাটির পুতুলে ঐতিহ্য বাঁচানোর লড়াই

শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

একটা সময় ছিল, শ্রাবণ-ভাদ্র মাস এলেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যেত ঝুলনের প্রস্তুতি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাটির পুতুল, কাগজ, কাঠ, রং, মাটি আর নানা ঘরোয়া উপকরণ দিয়ে সাজিয়ে তুলত নিজেদের ছোট্ট এক জগৎ। কোথাও রাধা-কৃষ্ণের দোলনা, কোথাও বৃন্দাবনের আবহ, কোথাও আবার গ্রামবাংলার ছবি। ছোট্ট সেই ঝুলনের মঞ্চেই ফুটে উঠত শিশুদের কল্পনার এক আশ্চর্য পৃথিবী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঝুলন যেন হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির ঘর থেকে। আজকের প্রজন্মের অনেক শিশুই হয়তো জানে না, ‘ঝুলন’ কী।

ঝুলন মানেই ছিল শৈশবের এক টুকরো আনন্দ

 
ঝুলন উৎসবের মূল আকর্ষণ রাধা-কৃষ্ণের দোলনায় দোলা। কিন্তু তাকে ঘিরে তৈরি হতো আরও বিস্তৃত এক পরিবেশ। মাটির পুতুল দিয়ে সাজানো হতো ঘরবাড়ি, গাছপালা, পুকুর, মাঠ, মানুষজন, গরু-ছাগল—কখনও তৈরি হতো পৌরাণিক দৃশ্য, কখনও বা ফুটে উঠত একেবারে চেনা গ্রামবাংলা।
পরিবারের বড়রা পাশে থাকলেও মূল পরিকল্পনা ও আনন্দটা থাকত শিশুদের হাতেই। তাই ঝুলন ছিল শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এর সঙ্গে মিশে ছিল শিশুমনের কল্পনা, সৃজনশীলতা, শিল্পচর্চা এবং পরিবারের সকলকে নিয়ে আনন্দ করার এক সুন্দর পরম্পরা।উন্মাদনা কমেছে, হারিয়ে যাচ্ছে পুতুল তৈরির কারিগরিওবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে এখনও ঝুলন উৎসব পালিত হয়। কোথাও মন্দিরে, কোথাও বাড়িতে, কোথাও বা পাড়ার উদ্যোগে। কিন্তু আগের মতো ঘরে ঘরে সেই উৎসাহ-উন্মাদনা আর চোখে পড়ে না।
 
একসময় ঝুলনের পুতুলের জন্য কুমোরপাড়াগুলিতে ব্যস্ততা থাকত। শিশুদের চাহিদা মেটাতে কারিগররা দিন-রাত পুতুল তৈরি করতেন। কৃষ্ণনগর-সহ বাংলার বিভিন্ন জায়গায় এখনও মাটির পুতুল তৈরি হয়। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু পরিবারের পক্ষে দূরে গিয়ে সেই পুতুল সংগ্রহ করা সহজ নয়। তার থেকেও বড় কথা, চাহিদাই যখন কমেছে, তখন এই পুতুল তৈরির পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার আগ্রহও কমে এসেছে।এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের খোঁজ করতেই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গেলাম কুমোরপাড়ায়। খোঁজ করতে করতে দেখা মিলল এমন এক বাড়ির, যেখানে এখনও তৈরি হয় ঝুলনের পুতুল।
 

পাঁচ দশক ধরে ঐতিহ্য আগলে রবীন্দ্রনাথ

 
এই বাড়ির শিল্পী রবীন্দ্রনাথ পাল। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী কৃষ্ণা পাল। দু’জনে মিলে এখনও ভালোবাসা দিয়ে ধরে রেখেছেন ঝুলনের পুতুল তৈরির সেই পুরনো পরম্পরা।রবীন্দ্রনাথবাবুর এই কাজের অভিজ্ঞতা পাঁচ দশকেরও বেশি। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ঝুলনের পুতুল তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন। তাঁর স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট সেই দিনগুলির ছবি, যখন ঝুলনের পুতুলের বিপুল চাহিদা ছিল।
 
একসময় সারাদিন-রাত বসে পুতুল তৈরি করতে হতো। খাওয়া-দাওয়ার সময় পর্যন্ত পাওয়া যেত না। রাত দেড়টা, দুটো, এমনকি তিনটে পর্যন্ত কাজ চলত। আবার ভোরবেলা উঠে কাজে হাত দিতে হতো। এত কাজের পরেও যেন কাজ শেষ হতো না।আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। চাহিদা প্রায় নেই বললেই চলে। তবুও পেশাটি ছাড়েননি তিনি।
 
কারণ, তাঁর কাছে এটি শুধুই উপার্জনের কাজ নয়—এটি ভালোবাসার কাজ, নিজের শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি স্মৃতি এবং বাংলার একটি পুরনো ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।পুতুলের শরীরে কৃষ্ণার হাত, চোখ আঁকেন রবীন্দ্রনাথ বিয়ের পর থেকে প্রায় ২৪ বছর ধরে এই কাজে যুক্ত কৃষ্ণা পালও। পুতুল তৈরির প্রায় সমস্ত দায়িত্বই তাঁর কাঁধে।
 
মাটি দিয়ে পুতুলের অবয়ব তৈরি থেকে শুরু করে সাজসজ্জা—প্রায় সব কাজই করেন তিনি। আর তাঁর স্বামীর বিশেষ দায়িত্ব পুতুলের চোখ আঁকা। কৃষ্ণাদেবীর কথায়, এই কাজে তাঁর স্বামীই মূল কারিগর।দু’জনে মিলে কাজটি করে চলেছেন। একজনের হাতে তৈরি হয় পুতুলের শরীর, অন্যজনের তুলিতে ফুটে ওঠে তার চোখ। যেন মাটির পুতুলের মধ্যে দু’জনের ভালোবাসা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও মিশে থাকে।মাটি নেই, বেড়েছে খরচ—তবুও থামেনি চেষ্টাএই শিল্প টিকিয়ে রাখা এখন আর সহজ নয়। পুতুল তৈরির উপযুক্ত মাটি পাওয়াও আগের মতো সহজ নয়। তার সঙ্গে বেড়েছে রং এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণের দাম। ফলে পুতুল তৈরির খরচও অনেকটাই বেড়েছে।
 
কিন্তু সেই তুলনায় বিক্রি বা চাহিদা নেই। সরকারি বা অন্য কোনও আর্থিক সহায়তাও তাঁরা পান না। ফলে অর্থনৈতিকভাবে এই কাজ থেকে বিশেষ লাভ থাকে না। বলা যায়, লাভের হিসাবের বাইরে গিয়েই তাঁরা কাজটি করে চলেছেন।ঝুলন থাকবে কি না, জানেন না তাঁরাআর কতদিন এই কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন, তা রবীন্দ্রনাথ-কৃষ্ণা নিজেরাও জানেন না। কারণ তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম এই কাজ গ্রহণ করবে কি না, সেই নিশ্চয়তাও নেই। তবুও যতদিন সম্ভব, ততদিন তাঁরা চেষ্টা করে যেতে চান।
 
আজ যখন বাংলার ঘরে ঘরে ঝুলনের সেই পুরনো উন্মাদনা আর নেই, তখন কুমোরপাড়ার এই ছোট্ট বাড়িতে তৈরি হওয়া মাটির পুতুলগুলো যেন অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।রাধা-কৃষ্ণের ছোট্ট দোলনা, মাটির মানুষ, ছোট্ট ঘরবাড়ি—সব মিলিয়ে সেখানে শুধু একটি উৎসবের সামগ্রী তৈরি হয় না। তৈরি হয় বাংলার হারিয়ে যেতে বসা শৈশবের স্মৃতি।
 
হয়তো একদিন ঝুলনের সেই ঘরোয়া উৎসব আরও ক্ষীণ হয়ে যাবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ও কৃষ্ণা পালের মতো শিল্পীরা যতদিন মাটি ছুঁয়ে পুতুল গড়বেন, ততদিন বাংলার সেই হারিয়ে যাওয়া ঝুলনের গল্পটুকু বেঁচে থাকবে।