এক সফটওয়্যার বদলে দিল নাগাল্যান্ড-সহ চার রাজ্যের চার পরিবারের ভাগ্য
আওয়াজ - দ্য ভয়েস / নয়াদিল্লি
মানবতার কোনও নির্দিষ্ট ধর্ম বা ঠিকানা নেই। হাসপাতালের চার দেওয়ালের বাইরে ঘৃণার প্রাচীর যতই উঁচু হোক না কেন, ওয়ার্ডের ভিতরে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা প্রতিটি মুখই এক। সেখানে কোনও হিন্দু, মুসলিম বা খ্রিস্টান থাকে না; থাকে শুধুমাত্র একটাই পরিচয়, সেটি হল ‘মানবতা’। সম্প্রতি দেশের রাজধানী দিল্লিতে এমনই এক অভূতপূর্ব মানবিক অলৌকিকতার সাক্ষী হয়েছে মানুষ, যা ধর্ম এবং রাজ্যের সমস্ত ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে এক অনন্য নজির তৈরি করেছে।
এই গোটা কাহিনি এমন একটি সফটওয়্যারকে ঘিরে, যা চারটি ভিন্ন ধর্ম এবং চারটি দূরবর্তী রাজ্যের চার পরিবারকে একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে। এই সম্পূর্ণ চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ফোর-ওয়ে কিডনি সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট’ (Four-way kidney swap transplant)। সফটওয়্যারের সাহায্যে দাতা ও রোগীর সঠিক জোড়া নির্ধারণ করে একই দিনে একাধিক সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে উত্তর ভারতে এটিই প্রথম ঘটনা বলে জানা যায়।
গোটা বিষয়টি কী ছিল এবং কীভাবে সম্ভব হল?
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চারটি পরিবার এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁদের প্রত্যেকের রোগীর জন্য কিডনি প্রতিস্থাপনের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। চারটি পরিবারের প্রতিটিতেই কিডনি দাতা ছিলেন, কিন্তু চিকিৎসাজনিত কারণ, ভিন্ন ব্লাড গ্রুপ অথবা অ্যান্টিবডি ম্যাচ না হওয়ার কারণে তাঁরা সরাসরি নিজেদের প্রিয়জনকে কিডনি দান করতে পারছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে রোগীদের জীবন বাঁচানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি এবং একটি বিশেষ সফটওয়্যার এই কঠিন কাজটিকে সহজ করে তুলল। এই প্রযুক্তিটির নাম অ্যালায়েন্স ফর পেয়ার্ড কিডনি ডোনেশন (Alliance for Paired Kidney Donation) বা সংক্ষেপে APKD সফটওয়্যার। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে চারটি পরিবারের দাতা ও রোগীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। এরপর এমন একটি চক্র তৈরি হয়, যেখানে প্রতিটি পরিবারের দাতা কোনও অপরিচিত রোগীর জন্য ভগবানের মতো হয়ে দাঁড়ান।
চার রাজ্য ও চার ধর্মের এক অনন্য শৃঙ্খল
এই চিকিৎসা শৃঙ্খলে জম্মু-কাশ্মীর, দিল্লি, বিহার এবং নাগাল্যান্ডের পরিবারগুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল। নাগাল্যান্ডের ৩৪ বছর বয়সি ছুছুংলা পংগেনের দ্বিতীয়বার কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন ছিল। তাঁর ভাই এরিকোকবার কিডনি তাঁর শরীরের সঙ্গে মেলেনি, কারণ তাঁর শরীরে ইতিমধ্যেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
একইভাবে জম্মু-কাশ্মীরের ৪৭ বছর বয়সি আব্দুল রউফ ভাট এবং তাঁর বোন নাজনীন রহমানের কিডনি ম্যাচ করেনি। চিকিৎসাজনিত কারণে দিল্লির ৪৬ বছর বয়সি শিবানী খুরানাকে তাঁর স্বামী বরুণ খুরানা নিজের কিডনি দিতে পারেননি। বিহারের ৩৪ বছর বয়সি লাল বাহাদুর এবং তাঁর স্ত্রী নিধি কুমারীর রক্তের গ্রুপ পরস্পরের সঙ্গে মেলেনি।
যখন সফটওয়্যারটি এই সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করল, তখন একটি আশ্চর্যজনক এবং নিখুঁত জোড়া সামনে এল। দিল্লির বরুণ খুরানা নাগাল্যান্ডের ছুছুংলা পংগেনকে কিডনি দান করলেন। নাগাল্যান্ডের এরিকোকবা পংগেন বিহারের লাল বাহাদুরের জীবন রক্ষা করলেন। বিহারের নিধি কুমারী জম্মু-কাশ্মীরের আব্দুল রউফ ভাটকে কিডনি দান করলেন। অন্যদিকে, জম্মু-কাশ্মীরের নাজনীন রহমান ভাট দিল্লির শিবানী খুরানাকে নতুন জীবন দিলেন। এভাবেই চারটি পরিবার একে অপরের হাত ধরল এবং রক্তের কোনও সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও মানবতার এক দৃঢ় শৃঙ্খল গড়ে উঠল।
এক সফটওয়্যার বদলে দিল নাগাল্যান্ড-সহ চার রাজ্যের চার পরিবারের ভাগ্য
চিকিৎসার পাশাপাশি ছিল বড় আইনি চ্যালেঞ্জ
এই ধরনের ‘ফোর-ওয়ে কিডনি এক্সচেঞ্জ’ বাস্তবায়ন করা মোটেই সহজ ছিল না। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি ছিল বহু আইনি জটিলতাও। ভারতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য একাধিক আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। নথিপত্রের একটি দীর্ঘ তালিকা ছিল এবং বারবার আদালতে হাজির হতে হয়েছিল।
বিষয়টির জটিলতার কথা মাথায় রেখে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়। কয়েক মাস ধরে চলা আইনি ও প্রশাসনিক লড়াইয়ের পর আদালতের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই পরবর্তী চিকিৎসার প্রস্তুতি শুরু করা সম্ভব হয়। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় চিকিৎসকদের দল দিন-রাত একনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন।
ম্যাক্স হাসপাতালে ম্যারাথন অস্ত্রোপচার
দক্ষিণ দিল্লির সাকেতে অবস্থিত ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল-এ এই সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। হাসপাতালের নেফ্রোলজি ও রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট মেডিসিন বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. দীনেশ খুল্লার এবং ইউরোলজি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. অনন্ত কুমারের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দল এই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জুলাই সকাল প্রায় ৭টা থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পাঁচটি পৃথক অপারেশন থিয়েটারে একই সঙ্গে আটটি অস্ত্রোপচার করা হয়। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা প্রায় ৬টা পর্যন্ত চলা এই ম্যারাথন অস্ত্রোপচারে চারজন দাতার শরীর থেকে নিরাপদে কিডনি বের করা হয় এবং এরপর তা চারজন পৃথক রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়।
চিকিৎসকদের মতে, এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল। প্রতিটি রোগী ও দাতার জন্য প্রয়োজনীয় ইমিউনোলজিক্যাল পরীক্ষা করা হয়েছিল, যাতে কোনও ধরনের ঝুঁকি না থাকে। অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার পর সমস্ত রোগী ও দাতার স্বাস্থ্যের ওপর নিরন্তর নজর রাখা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চারজন রোগী এবং তাঁদের চারজন দাতাই এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং তাঁদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি ও মানবতার বিশাল জয়
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করা গেলে তা মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান সময়ে যখন সমাজকে বিভক্ত করে এমন খবর প্রায়ই শিরোনাম দখল করে, তখন এই ধরনের মানবিক উদ্যোগ আমাদের বিশ্বাস করায় যে মানবতা এখনও বেঁচে আছে। জম্মু-কাশ্মীর থেকে নাগাল্যান্ড এবং বিহার থেকে দিল্লি পর্যন্ত মানুষের এভাবে একত্রিত হওয়া প্রমাণ করে যে যন্ত্রণা ও নিরাময়ের কোনও ধর্ম হয় না।
চিকিৎসকদের মতে, পেয়ার্ড কিডনি এক্সচেঞ্জ (Paired kidney exchange) সেই হাজার হাজার রোগীর জন্য এক বড় আশার আলো, যাঁদের পরিবারে দাতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র মেডিক্যাল ম্যাচিং না হওয়ার কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। দেশের অন্যান্য বড় হাসপাতালগুলিও যদি এই ধরনের সফটওয়্যার এবং সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট (swap transplant) প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে, তাহলে প্রতি বছর অগণিত মানুষের মূল্যবান জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।