ড. কশিশ আজিজ
অনিকা মাহেশ্বরী/ নয়াদিল্লি
ড. কশিশ আজিজের পথচলা শুধু সাফল্যের এক ধারাবাহিক অধ্যায় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সংগ্রাম, উচ্চশিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অনুপ্রেরণামূলক সমন্বয়। তাঁর জীবন ও কর্মজীবন ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি ভারতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের অগ্রগতি এবং নারীর ক্ষমতায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরে।
১৯৮৭ সালে দিল্লিতে জন্মগ্রহণকারী ড. কশিশ আজিজ এক পাঞ্জাবি মুসলিম পরিবারের সন্তান। বর্তমানে তিনি ইউনিকিউর ইন্ডিয়া লিমিটেডে কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স/কোয়ালিটি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত। কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা এবং দৃঢ় সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তাঁর বিশ্বাস, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের মূল উদ্দেশ্য হল জনস্বাস্থ্যকে পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষিত করা। আর সেই লক্ষ্যে সমগ্র ব্যবস্থাকে নিয়মিত উন্নতি ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “গুণমান কখনও কাকতালীয় বিষয় নয়; এটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সৎ প্রচেষ্টা, বুদ্ধিদীপ্ত দিকনির্দেশনা এবং দক্ষ বাস্তবায়নের ফল।” তাঁর মতে, একাধিক বিকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত নির্বাচনই গুণমানের প্রতিনিধিত্ব করে।
তিনি প্রায়ই তাঁর টিমকে একটি সহজ কিন্তু কঠোর বার্তা দেন, “হয় গুণমানকে আঁকড়ে ধরো, নয়তো চাকরি ছেড়ে দাও।” তিনি এটিকে একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখেন এবং শুধুমাত্র পেশাগত নয়, নৈতিক শৃঙ্খলা হিসেবেও বিবেচনা করেন। তিনি আরও বলেন, “শুধুমাত্র একটি সুস্থ ঘোড়াই শক্তিশালী গাড়ি টানতে পারে।” অর্থাৎ, যেকোনও প্রতিষ্ঠানের সাফল্য তার গুণমান ও শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল।
ড. কশিশ তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের কথা বলতে গিয়ে জানান, তিনি একটি ঐতিহ্যবাহী পাঞ্জাবি মুসলিম পরিবার থেকে এসেছেন, যেখানে মহিলাদের কাজ করাকে প্রায়ই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হতো না এবং অনেক সময় অল্প বয়সেই তাঁদের বিয়ে ঠিক করে দেওয়া হতো। এমন সামাজিক পরিবেশে নিজের শিক্ষা ও কর্মজীবন এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁকে গভীর সংগ্রাম করতে হয়েছে। তাঁর মতে, এই যাত্রা সহজ ছিল না, তবে আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রম তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা দিল্লি পাবলিক স্কুলে। ২০০৪ সালে তিনি স্কুলের পড়াশোনা সম্পূর্ণ করেন। এরপর জামিয়া হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসিতে স্নাতক (B.Pharm) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি মাস্টার্স ইন ফার্মাসিউটিক্স করেন, যার বিশেষায়ন ছিল কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স। অসাধারণ ফলাফলের জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত ড. এ.পি.জে. আবদুল কালামের হাত থেকে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন।
এরপর ফার্মাসিউটিক্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তরের পক্ষ থেকে “ইনস্পায়ার ফেলোশিপ”ও লাভ করেন। তিনি কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্সের বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত এবং একজন টেকনোলজিস্ট হিসেবেও স্বীকৃত। বর্তমানে তিনি IIM লখনউ থেকে এমবিএও করছেন। পাশাপাশি তিনি FOPIE-এর যুব শাখার সদস্য ও সচিব পদে রয়েছেন এবং IDMA (Indian Drug Manufacturers Association)-এরও সদস্য।
নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ২০০৭ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় এবং ২১ বছর বয়সে তিনি প্রথম সন্তানের জন্ম দেন। এর পরও তিনি মাস্টার্সে ভর্তি হন। সেই সময় শ্বশুরবাড়ির কাছ থেকে বিষয়টি গোপন রেখে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে পরিবারে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি পরীক্ষায় বসেন এবং পড়াশোনা চালিয়ে যান। এই সময় নিজের মায়ের সহযোগিতায় তিনি সন্তানের যত্ন নেন এবং বাবার সংস্থাতেও সক্রিয়ভাবে অবদান রাখেন। নিজের সাফল্যের জন্য তিনি প্রধানত তাঁর বাবাকেই কৃতিত্ব দেন, কারণ প্রচলিত রক্ষণশীল চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে তাঁর বাবা সবসময় তাঁকে সমর্থন করেছেন।
ড. কশিশ আরও জানান, তাঁর ছোট ছেলে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত, যার বিষয়টি তাঁর দ্বিতীয় জন্মদিনের কাছাকাছি সময়ে শনাক্ত হয়। এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের এক আবেগঘন ও অনুপ্রেরণাদায়ক মোড় হয়ে ওঠে। তিনি এই অভিজ্ঞতাকেই নিজের অনুপ্রেরণায় পরিণত করেছেন এবং বর্তমানে বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের কল্যাণে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন।
পেশাগতভাবে তিনি ২০০৮ সাল থেকে ইউনিকিউর ইন্ডিয়া লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত এবং নয়ডা ইউনিট থেকে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। তিনি তাঁর বাবা আবদুল মতীনের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। নয়ডা, গ্রেটার নয়ডা এবং রুরকির প্ল্যান্টগুলির পরিচালনা ও পরিদর্শনের দায়িত্বও তিনি সামলান। তাঁর লক্ষ্য হল উচ্চমানের স্বাস্থ্যপণ্য সরবরাহ করা এবং কোনও স্তরেই যেন ভোক্তার স্বাস্থ্য ও কল্যাণের সঙ্গে আপস না হয়, তা নিশ্চিত করা।
তিনি ফার্মা শিল্পকে একটি অত্যন্ত জটিল ও নির্ভুল ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে ওষুধের পরিমাণ মাইক্রোগ্রাম স্তর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রতিটি ব্যাচের পরীক্ষা, ভ্যালিডেশন এবং গবেষণা বাধ্যতামূলক। তাঁর বক্তব্য, এই প্রক্রিয়া শুধুমাত্র উৎপাদন নয়, বরং “দায়িত্ব এবং জীবন সুরক্ষার” কাজ। তাই তিনি সবসময় মানুষকে পরামর্শ দেন, শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে এবং নিজের ইচ্ছায় ওষুধ খাওয়া বা self-medication এড়িয়ে চলতে।
তিনি আরও জানান, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প WHO, FDA এবং DCGI-এর মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে কাজ করে। এখানে সবসময় “inspection ready” থাকা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, ফার্মা শিল্পে গুণমান ও compliance-এর সঙ্গে কোনওভাবেই আপস করা যায় না।
কোভিড-১৯ মহামারিকে তিনি তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় হিসেবে মনে করেন। সেই সময় ওষুধ, কর্মী এবং কাঁচামালের তীব্র ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তাঁর টিম একদিনের জন্যও উৎপাদন বন্ধ করেনি। সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী প্যারাসিটামল এবং স্যানিটাইজারের মতো প্রয়োজনীয় ওষুধের উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়। সেই সময় যাতায়াত, লজিস্টিকস এবং কর্মীদের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে এই অভিজ্ঞতা তাঁর টিমকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
তাঁর কথায়, কোভিড তাঁকে টিমের প্রতিটি স্তরের মানুষের সঙ্গে, গার্ড থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্ট পর্যন্ত, আরও গভীরভাবে যুক্ত করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা এবং কাঁচামালের ঘাটতির মতো বৈশ্বিক পরিস্থিতি ফার্মা শিল্পের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, যা অনেক সময় কোভিডের সময়ের চেয়েও কঠিন বলে মনে হয়।
ফার্মা শিল্পে খরচ ও গুণমানের ভারসাম্য নিয়ে তিনি বলেন, খরচ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হলেও গুণমানের সঙ্গে আপস করা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। এজন্য lean manufacturing, automation এবং system optimization-এর মতো পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়।
তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, গত ১০ বছরে ভারতীয় ফার্মা শিল্প উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে এবং বর্তমানে ভারত “ফার্মেসি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড” হিসেবে পরিচিত। এখন এই শিল্প শুধুমাত্র উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং গবেষণা, কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক মানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ড. কশিশ তাঁর কর্মজীবনের শুরুর দিনগুলিও স্মরণ করেন। তখন তিনি প্রতিদিন সাউথ দিল্লি থেকে মোদীনগর পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য যেতেন। কখনও নিজের পারিবারিক পরিচয়ের সুযোগ নেননি; বরং গ্রাউন্ড লেভেল থেকে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। ল্যাবে কাজ করার সময় বহুবার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তবে সেই অভিজ্ঞতাগুলিই তাঁর কাছে শিক্ষার ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
ড. কশিশ আজিজ
তিনি মনে করেন, ফার্মা শিল্পে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, তবে এখনও এই ক্ষেত্রটি অনেকটাই পুরুষ-প্রধান। যদিও বর্তমানে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং মহিলারা প্রতিটি স্তরেই নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছেন।তরুণদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, নিজেদের fundamentals শক্ত রাখুন, ইতিবাচক চিন্তাভাবনা গ্রহণ করুন এবং নিয়মিত শিখতে থাকুন, কারণ শেখার কোনও শেষ নেই। তাঁর মতে, একজন মানুষ যে ক্ষেত্রে কাজ করেন, তা সরাসরি কোনও না কোনও রোগীর জীবনের সঙ্গে যুক্ত। তাই দায়িত্ব ও সততাই সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যোগ, ফিটনেস এবং শিল্পকলার প্রতি আগ্রহী। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণও দেন। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলতে তিনি পছন্দ করেন, কারণ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁকে নতুন শক্তি ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।
শেষ পর্যন্ত ড. কশিশ আজিজের জীবনবার্তা একটাই, জীবনে কিছুই অসম্ভব নয়। ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় হলে, পরিশ্রম অব্যাহত থাকলে এবং লক্ষ্য স্পষ্ট থাকলে, সবচেয়ে ছোট সূচনাও একদিন বিশাল সাফল্যে পরিণত হতে পারে। ঠিক যেমন একটি ছোট নৌকা ধীরে ধীরে একদিন বিশাল জাহাজে পরিণত হয়।