দুর্ঘটনায় হারিয়েছিলেন এক চোখের দৃষ্টি, কিন্তু অদম্য সাহসে মনসুর আলি খান পতৌদি হয়ে উঠেছিলেন ক্রিকেটের ‘টাইগার’

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 40 m ago
মনসুর আলি খান পতৌদি
মনসুর আলি খান পতৌদি
 
অনিকা মাহেশ্বরী / নয়াদিল্লি

একটি ভয়াবহ মোটর দুর্ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিয়েছিল মনসুর আলি খান পতৌদির জীবন। গাড়ির ভাঙা কাচের আঘাতে তিনি হারিয়েছিলেন একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি। এমন পরিস্থিতিতে অনেকের কাছেই ক্রিকেট কেরিয়ার থামিয়ে দেওয়াই স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হতে পারত। কিন্তু পতৌদি ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। দুর্ঘটনার ধাক্কা, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কিংবা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, কোনও কিছুই তাঁকে ব্যাট হাতে মাঠে ফেরার পথ থেকে সরাতে পারেনি। তিনি আবার ব্যাট তুলে নিয়েছিলেন এবং প্রমাণ করেছিলেন, অদম্য সাহস ও ইচ্ছাশক্তির সামনে শরীরের সীমাবদ্ধতাও হার মানে। ক্রিকেট বিশ্ব তাই তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘টাইগার’ নামে অভিহিত করেছিল। নবাব পরিবারে জন্ম নেওয়ায় তাঁর জীবনে নাম, প্রতিপত্তি ও সা-সুবিধার অভাব ছিল না। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর পরিচয় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নয়; নিজের প্রতিভা, লড়াকু মানসিকতা এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমেই তিনি সেই পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন।

মনসুর আলি খান পতৌদি শুধু ভারতের অন্যতম মহান ব্যাটসম্যান ছিলেন না, তিনি ছিলেন এমন একজন অধিনায়ক, যিনি ভারতীয় ক্রিকেট দলকে জয়ের স্বপ্ন দেখার আত্মবিশ্বাস দিয়েছিলেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে ভারতীয় টেস্ট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করে পতৌদি এমন এক সময়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যখন বিদেশের মাটিতে জয়লাভ করা ভারতীয় ক্রিকেটের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। তাঁর এই কাহিনি শুধু ক্রিকেটের কাহিনি নয়; এটি এমন একজন মানুষের জীবনগাথা, যিনি একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরও নিজের জীবনকে নতুন করে সাজিয়েছিলেন এবং মাত্র একটি চোখের দৃষ্টি নিয়েই বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর বোলারদের নির্ভয়ে মোকাবিলা করেছিলেন।
 
মনসুর আলি খান পতৌদি এবং তাঁর স্ত্রী অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর
 
ক্রিকেটের প্রতি আকর্ষণ এবং এক নবাব পরিবারের ছেলে
 
মনসুর আলি খান পতৌদির জন্ম হয়েছিল ১৯৪১ সালের ৫ জানুয়ারি ভোপালে। তিনি পতৌদি রাজ্যের নবাব পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং পিতা ইফতিখার আলি খান পতৌদির উত্তরাধিকারী ছিলেন। তাঁর পিতাও একজন ক্রিকেটার ছিলেন এবং ইংল্যান্ড ও ভারত, দুই দেশের হয়েই টেস্ট ক্রিকেট খেলেছিলেন। কিন্তু ‘নবাব’ হওয়া এবং ক্রিকেটে সফল হওয়া দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। মনসুর পড়াশোনার সময় থেকেই ক্রিকেটে নিজের অসাধারণ প্রতিভার প্রদর্শন করতে শুরু করেছিলেন।
 
ইংল্যান্ডের সম্মানীয় ‘উইনচেস্টার কলেজ’-এ তিনি ক্রিকেট খেলতেন এবং ১৯৫৯ সালে স্কুল দলের অধিনায়কত্ব করেছিলেন। সেই বছরই তিনি ১,০৬৮ রান সংগ্রহ করে স্কুলের প্রায় চার দশক পুরনো রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। তাঁর এই প্রতিভা দেখে কোচ তাঁকে ভবিষ্যতের ‘ডন ব্র্যাডম্যান’ বলেও অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু নিয়তি তাঁর জন্য এমন এক টার্নিং পয়েন্ট তৈরি করে রেখেছিল, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
 
২০ বছর বয়সে সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং দৃষ্টিশক্তি হারানো
 
১ জুলাই, ১৯৬১ সাল। ইংল্যান্ডের হোভে ঘটে যাওয়া একটি মোটর দুর্ঘটনা মনসুর আলি খান পতৌদির জীবন চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছিল। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের একটি ভাঙা কাচের টুকরো তাঁর ডান চোখে ঢুকে গিয়েছিল, যার ফলে সেই চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেন তিনি। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর এবং তাঁর ক্রিকেট কেরিয়ার দ্রুত এগিয়ে চলেছিল। একবার কল্পনা করুন, যে খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তাঁর দৃষ্টিশক্তি, সেই দৃষ্টিই অসম্পূর্ণ হয়ে পড়েছিল।
 
ক্রিকেটে একজন ব্যাটসম্যানকে বলের গতি, দিক ও দৈর্ঘ্য মুহূর্তের মধ্যে নির্ধারণ করতে হয়। দুটি চোখে বল দেখা এবং তার গভীরতা বোঝাই যেখানে কঠিন, সেখানে মাত্র একটি চোখে এই চ্যালেঞ্জ কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা অনুমান করাও সহজ নয়। কিন্তু পতৌদি ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি আবার হাতে ব্যাট তুলে নিয়েছিলেন। আর এখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়।
 
দুর্ঘটনার পর প্রত্যাবর্তন: ‘টাইগার’-এর প্রকৃত পরিচয়
 
দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই পতৌদি ক্রিকেটের মাঠে ফিরে এসেছিলেন। এটি শুধু মাঠে প্রত্যাবর্তন ছিল না; এটি ছিল সেই মানসিকতার বিরুদ্ধে এক লড়াই, যা হয়তো বলত যে একটি চোখের দৃষ্টি হারানোর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা অসম্ভব। কিন্তু পতৌদি অসম্ভবকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। BCCI-এর মতে, তিনি তাঁর ক্রিকেট কেরিয়ারের একটি বড় অংশ একটি চোখের দৃষ্টি ছাড়াই খেলেছিলেন এবং তারপরও বিশ্বমানের ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল এক আগ্রাসী মনোভাব। তিনি এমন ব্যাটসম্যান ছিলেন না, যিনি বোলারকে ভয় পেতেন। তাঁর খেলার ধরনে যে আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠত, পরবর্তী সময়ে সেটিই তাঁর অধিনায়কত্বেরও মূল পরিচয় হয়ে উঠেছিল।
 
মনসুর আলি খান পতৌদি
 
মাত্র ২১ বছর বয়সে ভারতীয় দলের অধিনায়ক
 
১৯৬১-৬২ সালে পতৌদি ভারতের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু তার কিছু সময় পরেই তাঁর কাঁধে এমন এক দায়িত্ব এসে পড়ে, যা বর্তমান সময়েও যেকোনও তরুণ খেলোয়াড়ের জন্য অত্যন্ত বড় বিষয়। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি ভারতীয় টেস্ট দলের অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন। সেই সময় তিনি টেস্ট ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব করা কনিষ্ঠতম খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন ছিলেন এবং তাঁর এই রেকর্ড কয়েক দশক ধরে আলোচনায় ছিল।
 
পতৌদির সামনে শুধু ম্যাচ জেতার চ্যালেঞ্জ ছিল না, তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটারদের চিন্তাধারাও বদলাতে হয়েছিল। সেই সময় বিদেশি দলের বিরুদ্ধে ভারতকে প্রায়ই সংগ্রাম করতে হতো এবং বহু সময় টেস্ট ম্যাচ ড্র করতে পারাটাই একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু পতৌদির চিন্তাধারা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর বার্তা ছিল একেবারে স্পষ্ট: ম্যাচ জেতার জন্য খেলো। এই চিন্তাধারা ধীরে ধীরে ভারতীয় ক্রিকেটে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল।
 
যে অধিনায়ক ভারতীয় ক্রিকেটকে আগ্রাসী হতে শিখিয়েছিলেন
 
পতৌদির অধিনায়কত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর আগ্রাসী চিন্তাধারা। মাঠে risk নিতে তিনি কখনও ভয় পেতেন না। তিনি খেলোয়াড়দের নিজেদের সামর্থ্যের উপর বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় দলের ফিল্ডিংয়েও ব্যাপক উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছিল। BCCI-এর মতে, পতৌদি নিজেই একজন দুর্দান্ত ফিল্ডার ছিলেন এবং তিনি ভারতীয় দলের খেলোয়াড়দেরও উন্নত ফিল্ডিং করতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তাঁর অধিনায়কত্বেই ভারতীয় দল উন্নত ক্যাচিং এবং স্পিন বোলিংয়ের এক শক্তিশালী পরিচয় গড়ে তুলেছিল।
 
এই সময়েই ভারতীয় ক্রিকেটের বিখ্যাত স্পিন চতুষ্টয়ের বেশ কয়েকজন সদস্য দলে প্রবেশ করেছিলেন বা নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন, বিষাণ সিং বেদী, ভাগবত চন্দ্রশেখর, এরাপল্লি প্রসন্ন এবং এস ভেঙ্কটরাঘবন। পতৌদি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতীয় পরিস্থিতিতে স্পিন বোলিং একটি বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। তাই তিনি সেই শক্তিকে দলের রণনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছিলেন।
 
১৯৬৪ সাল: অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেই অনবদ্য ইনিংস
 
১৯৬৪ সালে অস্ট্রেলিয়া দল ভারত সফরে এসেছিল। চেন্নাই টেস্টে পতৌদি একটি দুর্দান্ত শতরান করেছিলেন। এরপর মুম্বইয়ের ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে তিনি দুই ইনিংসে যথাক্রমে ৮৬ ও ৫৩ রান সংগ্রহ করেছিলেন। ভারত সেই টেস্ট দুই উইকেটে জয়লাভ করেছিল এবং সেই জয়ে পতৌদির দুই ইনিংসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সেই সময় অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ অত্যন্ত শক্তিশালী বলে বিবেচিত হতো। এমন পরিস্থিতিতেও পতৌদি তীব্র চাপের মধ্যে রান সংগ্রহ করেছিলেন। মাত্র একটি চোখে ব্যাট করা সেই তরুণ অধিনায়ক এখন প্রতিপক্ষ দলের বোলারদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিলেন।
 
মনসুর আলি খান পতৌদি
 
১৯৬৭-৬৮: নিউজিল্যান্ডে ইতিহাস সৃষ্টি
 
পতৌদির অধিনায়কত্বের সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছিল ১৯৬৭-৬৮ সালে। তাঁর নেতৃত্বে ভারত প্রথমবার নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয় করেছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি ছিল এক অত্যন্ত ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিদেশের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয় করা সেই সময় ভারতের কাছে ছিল বিরল সাফল্য। পতৌদি তাঁর দলকে সেই পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ভারতীয় ক্রিকেটকে এই বিশ্বাস দিয়েছিলেন যে ভারত বিদেশেও জয়লাভ করতে পারে। এই সাফল্যের কারণেই পতৌদি শুধু একজন দুর্দান্ত ব্যাটসম্যান হিসেবে নয়, বরং ভারতীয় ক্রিকেটের একজন দূরদর্শী অধিনায়ক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
 
মেলবোর্নে একটি চোখ ও একটি পা নিয়ে খেলা সেই দুর্দান্ত ইনিংস
 
পতৌদির লড়াকু মানসিকতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলির মধ্যে একটি হল ১৯৬৭-৬৮ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় মেলবোর্ন টেস্টে খেলা তাঁর ৭৫ রানের ইনিংসটি। সেই ইনিংসটি তিনি চোটগ্রস্ত অবস্থায় খেলেছিলেন। একটি চোখের দৃষ্টি না থাকার পরও এবং পায়ে চোট নিয়েও যেভাবে তিনি অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা তাঁর চরিত্র বোঝার জন্য যথেষ্ট। পরবর্তী সময়ে বহু মহান ক্রিকেটার বলেছিলেন যে তাঁর দুটি চোখই যদি ঠিক থাকত, তাহলে হয়তো তাঁর রেকর্ড আরও অসাধারণ হতো। কিন্তু পতৌদি কখনও নিজের একটি চোখের দৃষ্টিহীনতাকে নিজের পরিচয় হতে দেননি। তাঁর একমাত্র পরিচয় ছিল, ‘টাইগার’।
 
অর্জুন পুরস্কার এবং জাতীয় স্বীকৃতি (১৯৬৪)
 
১৯৬৪ সালে মনসুর আলি খান পতৌদিকে সম্মানীয় ‘অর্জুন পুরস্কার’-এ সম্মানিত করা হয়েছিল। BCCI-এর সরকারি তালিকায় ১৯৬৪ সালের অর্জুন পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে ‘M A K Pataudi – Cricket’ নামটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি তাঁর ক্রিকেট কেরিয়ারের প্রথম দিকের বড় জাতীয় স্বীকৃতিগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল। এরপর ১৯৬৭ সালে তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানও প্রদান করা হয়। অর্জুন পুরস্কার তাঁর সেই জীবনসংগ্রামকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, যেখানে একজন তরুণ ক্রিকেটার দুর্ঘটনার পর প্রত্যাবর্তন করে ভারতীয় দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং দেশকে বিদেশের মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ের স্বাদ দিয়েছিলেন।
 
৪৬টি টেস্ট, ২,৭৯৩ রান এবং ৪০টি ম্যাচে অধিনায়কত্ব
 
পতৌদি ভারতের হয়ে মোট ৪৬টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন। এতে তিনি ৬টি শতরানসহ ২,৭৯৩ রান সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর সর্বোচ্চ স্কোর ছিল অপরাজিত ২০৩ রান। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর ব্যাটিং পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে ছিল। তিনি ৪০টি টেস্ট ম্যাচে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং তার মধ্যে ৯টিতে ভারত জয়লাভ করেছিল। তাঁর অধিনায়কত্ব ভারতীয় ক্রিকেটকে এমন একটি চিন্তাধারা দিয়েছিল, যেখানে জয়ের জন্য ঝুঁকি নেওয়া নেওয়া কোনও দুর্বলতা ছিল না, বরং ছিল একটি প্রয়োজনীয় অংশ।
 
একজন নবাব, কিন্তু মাঠে শুধুই একজন খেলোয়াড়

ক্রিকেটের বাইরেও পতৌদির জীবন ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তিনি পতৌদি রাজ্যের নবাব পরিবারের সন্তান ছিলেন। কিন্তু ক্রিকেটের মাঠে তিনি নিজের পরিচয় শুধুমাত্র কঠোর পরিশ্রম ও খেলার মাধ্যমেই গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বলিউড অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁদের তিন সন্তান, সৈফ আলি খান, সোহা আলি খান ও সাবা আলি খান। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস। নিজের রাজকীয় পটভূমি থাকা সত্ত্বেও তিনি দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে অত্যন্ত সহজভাবে মিশে যেতেন।
 
মনসুর আলি খান পতৌদি
 
BCCI-এর একটি স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে, যখন তিনি প্রথমবার ভারতীয় দলের নেট অনুশীলনে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে সামগ্রী বহন করার জন্য মানুষের একটি পুরো দল এসেছিল। সতীর্থ খেলোয়াড়রা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তাঁকে কীভাবে সম্বোধন করবেন। তখন পতৌদি পরিবেশটা হালকা করে হেসে বলেছিলেন, “আমাকে শুধু ‘প্যাট’ বা ‘টাইগার’ বলে ডাকবে।” এটাই ছিল তাঁর স্বভাব, বাইরে নবাবের পরিচয়, কিন্তু দলের মধ্যে একজন সাধারণ খেলোয়াড়।
 
সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি: একটি চোখে গোটা বিশ্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ

মনসুর আলি খান পতৌদির সমগ্র জীবন থেকে যদি একটি কাহিনি বেছে নিতে হয়, তাহলে সেটি নিশ্চিতভাবেই হবে দুর্ঘটনার পর তাঁর প্রত্যাবর্তন। এমন একজন ক্রিকেটার, যার দৃষ্টিশক্তি ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি, আর সেই দৃষ্টিই একদিন তাঁকে হারাতে হয়েছিল। তবুও তিনি ক্রিকেট ছাড়েননি। তিনি আবার ব্যাটিং করেছেন। টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন। ভারতের অধিনায়কত্ব করেছেন। বিদেশের মাটিতে জয় এনে দিয়েছেন। এবং বিশ্বের সেরা বোলারদের নির্ভয়ে মোকাবিলা করেছেন।
 
ভি ভি এস লক্ষ্মণ পতৌদিকে স্মরণ করে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছিলেন: “একটি চোখে ব্যাটিং করা কতটা কঠিন, তা বোঝার জন্য একজন ব্যাটসম্যানকে একটি চোখ বন্ধ করে বলের মুখোমুখি হয়ে দেখতে হবে। একটি চোখে বলটির গভীরতা ও দৈর্ঘ্য বোঝা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।” পতৌদি এই কঠিন পরিস্থিতি শুধু একবার নয়, নিজের প্রায় সমগ্র আন্তর্জাতিক কেরিয়ারজুড়েই অতিক্রম করেছিলেন। তাই তাঁর কাহিনির সবচেয়ে বড় বার্তাটি হয়তো এটাই, পরিস্থিতি আপনার সামর্থ্যকে নির্ধারণ করে না, আপনি সেই পরিস্থিতির প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, সেটাই আপনার প্রকৃত পরিচয়।
 
অবসরের পরও ক্রিকেটের সঙ্গে অটুট সম্পর্ক
 
১৯৭৫ সালে পতৌদি ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু ক্রিকেট কখনও তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যায়নি। অবসরের পর তিনি সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছিলেন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে তিনি ম্যাচ রেফারির ভূমিকাও পালন করেন এবং দুটি টেস্ট ও ১০টি একদিনের ম্যাচে এই দায়িত্ব সুচারুভাবে সামলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আইপিএলের গভর্নিং কাউন্সিলেরও অংশ ছিলেন। ২০০৭ সাল থেকে ভারত ও ইংল্যান্ডের মধ্যে খেলা টেস্ট সিরিজের ট্রফিটির নাম ‘পতৌদি ট্রফি’ রাখা হয়, যা তাঁর পরিবারের ক্রিকেটে অবদানকে সম্মান জানায়। ২০১৩ সালে BCCI তাঁর সম্মানে ‘মনসুর আলি খান পতৌদি মেমোরিয়াল লেকচার’ শুরু করে, যার প্রথম বক্তৃতা দিয়েছিলেন সুনীল গাভাসকর। অর্থাৎ, পতৌদি চলে যাওয়ার পরও ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর নাম একটি অনুষ্ঠান, একটি ট্রফি এবং একটি বার্ষিক স্মৃতিভাষণের রূপে বেঁচে রইল।
 
 
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মনসুর আলি খান পতৌদি এবং তাঁর অমর গাথা
 
২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ৭০ বছর বয়সে মনসুর আলি খান পতৌদি ইহলোক ত্যাগ করেন। তিনি দিল্লির একটি হাসপাতালে ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিন্তু কিছু মানুষ এমন হন, যারা পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পরও নিজেদের কর্মের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে চিরদিনের জন্য অমর হয়ে থাকেন। পতৌদিও ছিলেন ঠিক তেমনই একজন মানুষ। আজ যখন ভারতীয় ক্রিকেটকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রিকেট শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়, তখন সেই বিশেষ সময়টিকে মনে করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যখন ভারত বিদেশের মাটিতে জয়লাভ করতে পারবে, এমনটা কেউ বিশ্বাসই করত না।
 
পতৌদি সেই পুরনো পরাজয়মুখী চিন্তাধারা বদলানোর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। তিনি ভারতীয় দলের শিরায় আগ্রাসী মনোভাবের বীজ বপন করেছিলেন। ফিল্ডিংকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তরুণ খেলোয়াড়দের উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, কখনও হার না মানার অদম্য সাহস দিয়েছিলেন। BCCI তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটের এমন একজন অধিনায়ক হিসেবে অভিহিত করে, যিনি দলে আগ্রাসী মনোভাব তৈরি করেছিলেন এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার পথ দেখিয়েছিলেন।
 
মনসুর আলি খান পতৌদির জীবনকাহিনি শুধু একজন রাজকুমারের জীবনগাথা নয়। এটি এমন একজন খেলোয়াড়ের কাহিনি, যিনি নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাকেই নিজের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। দুর্ঘটনায় একটি চোখের দৃষ্টি হারিয়েছিলেন সত্যি, কিন্তু ইতিহাস গড়ার লক্ষ্য থেকে তাঁর দৃষ্টি কখনও সরে যায়নি। মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর কাঁধে অধিনায়কত্বের বিশাল দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোনও চাপই তাঁকে ভেঙে দিতে পারেনি।
 
তাঁর নেতৃত্বেই ভারত বিদেশের মাটিতে গৌরব অর্জন করেছিল এবং ভারতীয় ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছিল। ১৯৬৪ সালে তিনি অর্জুন পুরস্কার লাভ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি আদর্শ স্থাপন করেছিলেন। তাই হয়তো ক্রিকেট বিশ্ব তাঁকে শুধু ‘মনসুর আলি খান পতৌদি’ হিসেবে না ভেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘টাইগার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আর একজন প্রকৃত ‘টাইগার’-এর পরিচয় এটাই, সে পরিস্থিতিকে ভয় পায় না, বরং বুকে সাহস নিয়ে তার মুখোমুখি হয়।