আর্সালা খান / নয়াদিল্লি
জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA) অজিত ডোভালকে মর্যাদাপূর্ণ লোকমান্য তিলক পুরস্কার-এর জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। সোমবার তিলক স্মারক ট্রাস্ট এই ঘোষণা করেছে। ট্রাস্টের সভাপতি ড. রোহিত তিলক এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, আগামী ১ আগস্ট পুনেতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অজিত ডোভালের হাতে এই সম্মান তুলে দেবেন। তিনি আরও জানান, অনুষ্ঠানে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীস, উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে এবং সুনেত্রা পাওয়ারের উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
কোথায় প্রদান করা হবে এই পুরস্কার?
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি পুনের গুলটেকড়ি এলাকার মহারাষ্ট্রীয় মণ্ডল ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে ৮১ বছর বয়সী অজিত ডোভাল মিজোরাম, সিকিম, পাঞ্জাব এবং জম্মু ও কাশ্মীরের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি ইসলামাবাদ ও লন্ডনে অবস্থিত ভারতীয় মিশনে কূটনৈতিক দায়িত্বও পালন করেছেন।
কেন এই সম্মান পাচ্ছেন অজিত ডোভাল?
জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য ২০২৬ সালের লোকমান্য তিলক পুরস্কার পাচ্ছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। তিনি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। মিজোরাম, পাঞ্জাব, সিকিম এবং জম্মু ও কাশ্মীরের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি ভারত-চীন সীমান্ত সংক্রান্ত আলোচনায় ভারতের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে ডোকলাম সংকট মোকাবিলায় তাঁর কূটনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
ভারতের গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিলক স্মারক ট্রাস্ট তাঁকে চলতি বছরের এই সম্মানের জন্য নির্বাচিত করেছে।
লোকমান্য তিলক কে ছিলেন?
লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক ছিলেন ভারতের অন্যতম মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ এবং জাতীয়তাবাদী নেতা। তাঁর জন্ম ১৮৫৬ সালের ২৩ জুলাই মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরিতে। তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে নতুন দিশা দেখিয়েছিলেন এবং মানুষের মধ্যে স্বরাজের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন।
তাঁর বিখ্যাত স্লোগান, "স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার, এবং আমি তা অর্জন করবই", আজও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক আহ্বান হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি সাংবাদিকতার মাধ্যমেও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং তাঁর প্রকাশিত 'কেশরী' (মারাঠি) ও 'মারাঠা' (ইংরেজি) সংবাদপত্রের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের বার্তা ছড়িয়ে দেন।
লোকমান্য তিলক পুরস্কারের সূচনা কবে?
লোকমান্য তিলক পুরস্কার ১৯৮৩ সালে পুনের তিলক স্মারক ট্রাস্ট-এর উদ্যোগে চালু হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল লোকমান্য তিলকের আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং যাঁরা নিজেদের কর্মের মাধ্যমে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তাঁদের সম্মানিত করা। প্রতি বছর ১ আগস্ট, লোকমান্য তিলকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারের মধ্যে থাকে সম্মানপত্র, স্মারক এবং নগদ অর্থ।
কোন ভিত্তিতে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়?
লোকমান্য তিলক পুরস্কার কোনও একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যাঁরা তাঁদের কর্মের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র, সামাজিক অগ্রগতি, জাতীয় ঐক্য, বিজ্ঞান, শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, প্রশাসন বা জাতীয় নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন, তাঁদের এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। পুরস্কার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদি অবদান, জনজীবনে তাঁর ভূমিকা এবং জাতীয় স্বার্থে তাঁর কাজকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কারা কারা এই পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন?
গত চার দশকে দেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে লোকমান্য তিলক পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। রাজনীতি, বিজ্ঞান, শিল্প, সমাজসেবা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি এই সম্মান পেয়েছেন।
কয়েকজন উল্লেখযোগ্য পুরস্কারপ্রাপক হলেন:
* এস. এম. যোশী-- প্রথম পুরস্কারপ্রাপক (১৯৮৩)
* অটল বিহারি বাজপেয়ী-- প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী
* ড. মনমোহন সিং-- প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও অর্থনীতিবিদ
* নরেন্দ্র মোদি-- প্রধানমন্ত্রী
* সোনিয়া গান্ধী-- কংগ্রেসের প্রবীণ নেত্রী
* প্রণব মুখোপাধ্যায়-- প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি
* শরদ পাওয়ার-- প্রবীণ রাজনীতিবিদ
* ড. রঘুনাথ মাশেলকর-- বিশিষ্ট বিজ্ঞানী
* ড. বিজয় ভাটকর-- সুপার কম্পিউটার 'পরম'-এর জনক
* এন. আর. নারায়ণ মূর্তি-- ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা
* সাইরাস পুনাওয়ালা-- শিল্পপতি
* ড. ই. শ্রীধরন-- 'মেট্রো ম্যান' নামে পরিচিত প্রকৌশলী
* অজিত ডোভাল-- জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (২০২৬)
এছাড়াও বহু শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, শিল্পপতি, সমাজসেবী এবং জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
এই পুরস্কারের গুরুত্ব কী?
লোকমান্য তিলক পুরস্কার শুধু একটি সম্মান নয়, বরং দেশ গঠনে অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রতি সমাজের কৃতজ্ঞতার প্রতীক। এই পুরস্কার লোকমান্য তিলকের সেই আদর্শগুলোকেও স্মরণ করিয়ে দেয়, যার জন্য তিনি সারাজীবন নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, স্বরাজ, জাতীয়তাবাদ, শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং জনঅংশগ্রহণ। প্রতি বছর এই পুরস্কারের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিদের সম্মানিত করা হয়, যাঁরা নিজেদের কর্মক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে দেশের মর্যাদা ও উন্নয়নকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।
লোকমান্য তিলক পুরস্কার ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক সম্মান হিসেবে বিবেচিত হয়। লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে এবং জাতীয় স্বার্থে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মান জানাতেই এই পুরস্কারের সূচনা করা হয়েছিল।
২০২৬ সালে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের এই সম্মান প্রাপ্তি প্রমাণ করে যে, জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত নেতৃত্বও বিজ্ঞান, রাজনীতি, শিক্ষা কিংবা সমাজসেবার মতোই দেশ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। গত চার দশকে এই পুরস্কারে সম্মানিত বহু ব্যক্তিত্ব তাঁদের কাজের মাধ্যমে ভারতের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা সুদৃঢ় করেছেন।