রোগকে হার মানিয়ে শিক্ষার সেবায় নিবেদিত এক অসাধারণ শিক্ষিকা ড. জাহিদা সিদ্দিকী

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 12 h ago
ড. জাহিদা সিদ্দিকী
ড. জাহিদা সিদ্দিকী
 
শাহ তাজ খান

মানুষের প্রকৃত শক্তি তার সুস্থ শরীরে নয়, প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের কর্তব্য পালন করার অদম্য ইচ্ছায় লুকিয়ে থাকে। গত ছয় বছর ধরে সপ্তাহে দু'দিন নিয়মিত ডায়ালিসিসের ওপর নির্ভর করেও একদিনের জন্যও শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে থাকেননি মুম্বইয়ের ড. জাহিদা সিদ্দিকী। শিক্ষাজগতে সবার কাছে তিনি স্নেহভরে পরিচিত 'জাহিদা আপা' নামে। দীর্ঘ ও গুরুতর অসুস্থতা তাঁর শিক্ষা, উর্দু ভাষা ও সাহিত্য এবং সমাজসেবার প্রতি অঙ্গীকারকে একটুও নড়বড়ে করতে পারেনি। বরং প্রতিটি প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি সাহস, অধ্যবসায় ও অদম্য মানসিক শক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যখন অনেকেই কঠিন সময়ে অন্যের সহানুভূতি খোঁজেন, তখন জাহিদা আপা নিজেই অসংখ্য মানুষের অনুপ্রেরণা, শক্তি ও ভরসার উৎস হয়ে উঠেছেন।

ড. জাহিদা সিদ্দিকী বান্দ্রার আঞ্জুমান-ই-ইসলাম ড. মোহাম্মদ ইশাক জামখানাওয়ালা গার্লস হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি 'কুইজ টাইম মুম্বই'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক। এই সংগঠনের উদ্যোগে গত ২৭ বছর ধরে উর্দু মাধ্যমের স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা ও জ্ঞানচর্চা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আধুনিক পদ্ধতিতে সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ৩০০টি কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
 
বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ড. জাহিদা সিদ্দিকীর একটি ছবি
 
উর্দু মাধ্যমের স্কুলগুলির অন্যতম বৃহত্তম শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান 'ধামাল – জেনারেল নলেজ কুইজ কম্পিটিশন'-এর ২৬তম বার্ষিক সংস্করণের ঘোষণাও সম্প্রতি করা হয়েছে। এছাড়াও 'উর্দু কি মোহব্বত মে'-এর নবম বার্ষিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেরও ঘোষণা করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে উর্দু ভাষার প্রসারে নীরবে ও নিঃস্বার্থভাবে অবদান রাখা ব্যক্তিদের 'আইতিরাফিয়া অ্যাওয়ার্ড' এবং 'মোহিব-ই-উর্দু অ্যাওয়ার্ড' প্রদান করে সম্মানিত করা হয়।
 
শুধু তাই নয়, স্কুল ও কলেজে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত কবিদের জন্য 'টিচার্স মুশায়রা'-রও আয়োজন করেন ড. জাহিদা সিদ্দিকী। জাহিদা আপা জানান, 'সার্চ ফর নিউ রাইটার্স' নামে একটি নতুন অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পও কুইজ টাইম মুম্বইয়ের বিভিন্ন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল স্কুল থেকে স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত সেই সব শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা, দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং পরামর্শ প্রদান করা, যাদের সৃজনশীল লেখালেখির প্রতি আগ্রহ ও প্রতিভা রয়েছে।
 
নিজের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, অভিভাবকদের সচেতন করতে তিনি নিয়মিত পরামর্শমূলক সভার আয়োজন করেন। অভিভাবকদের নিজেদের কাছে ডেকে পাঠানোর পরিবর্তে তাঁদের আবাসনের পার্কিং এলাকা বা সোসাইটির কমিউনিটি হলে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়, যাতে তাঁরা সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে যথাযথ দিকনির্দেশনা পেতে পারেন।
 
হাসপাতালে ডায়ালিসিস করার একটি মুহূর্তে ড. জাহিদা সিদ্দিকী 
 
ডায়ালিসিস চললেও তাঁর বাড়িতে সাহিত্যিকদের আড্ডা ও আন্তরিক আপ্যায়নের ধারাবাহিকতায় কোনও ভাটা পড়েনি। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও কবিরা নিয়মিত এই আসরে অংশ নেন। সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকেই জাহিদা আপার বাড়িতে অনুষ্ঠিত দ্বিমাসিক সাহিত্যসভাগুলির উচ্চমান ও নিখুঁত আয়োজনের প্রশংসা করেন।
 
জাহিদা সিদ্দিকী মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পড়ান। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এমন এক পর্যায়ে থাকে, যখন তারা ধীরে ধীরে শৈশব থেকে কৈশোরে প্রবেশ করে। এই সংবেদনশীল সময়ে তাদের শারীরিক, মানসিক ও আবেগগত পরিবর্তন বুঝে, শৃঙ্খলা বজায় রেখে একই সঙ্গে বন্ধু ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করা সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়।
 
আলাপচারিতায় জাহিদা আপা বলেন, "আমার ছাত্রছাত্রীদের যখনই সাহায্য বা পরামর্শের প্রয়োজন হয়, তখনই আমার বাড়ির দরজা তাদের জন্য সবসময় খোলা থাকে। আমি নিয়মিত তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি, যাতে শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিস্থিতি ও সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারি এবং বাস্তবসম্মত সহায়তা করতে পারি। সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিভাবকদের কাছে অভিযোগ করার পরিবর্তে আমি তাঁদের সঙ্গে একযোগে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করি, যাতে শিশুটির ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর হয়।"
 
নিজের উদ্যোগে জাহিদা আপা আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের স্কুলের ফি, ইউনিফর্ম, খাতা-কলমসহ অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা করে দেন। একই সঙ্গে তিনি আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষদেরও শিশুদের শিক্ষার জন্য উদারভাবে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করেন।
 
বিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে ড. জাহিদা সিদ্দিকী
 
গত ছয় বছর ধরে জাহিদা আপা নিয়মিত ডায়ালিসিস করাচ্ছেন। প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার তাঁকে এই চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবুও তিনি কখনও স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন না এবং সময়মতো শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করে চলেন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি তিনি স্কুলের সায়েন্স ক্লাব এবং নেচার ক্লাব-এর কার্যক্রমেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও তিনি একই উৎসাহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
 
এমনও বহু সময় এসেছে, যখন তাঁর গলায় স্থায়ীভাবে ক্যাথেটার বসানো ছিল। তবুও তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্লাস নিয়েছেন, শিক্ষা ও সাহিত্যভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন এবং যাঁরা তাঁর পরামর্শ বা সহযোগিতা চাইতে এসেছেন, তাঁদের সময় দিয়েছেন। অসুস্থতা বা চিকিৎসার কোনও পর্যায়ই তাঁর কাজ বা মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে থামাতে পারেনি।
 
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জেনারেল নলেজ কুইজ কম্পিটিশন-এর মাত্র কয়েক দিন আগে তাঁর অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি হয়েছিল এবং পরের দিনই তাঁর আরেকটি অস্ত্রোপচারের তারিখ নির্ধারিত ছিল। অস্ত্রোপচারের পর বিশ্রাম নেওয়ার পরিবর্তে তিনি নিজের দায়িত্ব পালনকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যম, দৃঢ়তা ও কর্তব্যবোধ দেখে কেউই বুঝতে পারেননি যে কয়েক দিন আগেই তিনি অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। কিছুদিন আগে ডায়ালিসিসের জন্য চার মাস ধরে তাঁর গলায় বসানো অস্থায়ী ক্যাথেটার অপসারণ করা হয়। এরপর আবার আগের মতো ফিস্টুলা-র মাধ্যমে তাঁর ডায়ালিসিস শুরু হয়।
 
মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় ড. জাহিদা সিদ্দিকীকে "আল্লামা সিমাব আকবরাবাদীর পাণ্ডিত্য ও সাহিত্যিক অবদানের গবেষণা ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন" শীর্ষক গবেষণার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করেছে। তাঁর বই "মুঝে সিমাব কহতে হ্যায়" (They Call Me Seemab) বর্তমানে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে এবং শীঘ্রই প্রকাশিত হবে। তাঁর লেখনী এখনও সমানভাবে সক্রিয়, এবং সাহিত্য ও পরিবেশ বিষয়ক তাঁর প্রবন্ধ নিয়মিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
 
একটি পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তে ড. জাহিদা সিদ্দিকী
 
শিক্ষা, সমাজসেবা এবং উর্দু সাহিত্য ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ড. জাহিদা সিদ্দিকী বহু পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে মহারাষ্ট্র স্টেট উর্দু সাহিত্য অ্যাকাডেমি-র 'বেস্ট টিচার অ্যাওয়ার্ড' ও 'স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড', 'মজরুহ সুলতানপুরি অ্যাওয়ার্ড', 'কর্মবীর ভাউরাও পাটিল আদর্শ শিক্ষক পুরস্কার', এবং আরও বহু সম্মাননা।
 
ড. জাহিদা সিদ্দিকীর জীবন প্রমাণ করে, প্রকৃত শক্তি শরীরে নয়, মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় সংকল্পে নিহিত। শারীরিক দুর্বলতা কখনও তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্যপূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তাঁর অনুপ্রেরণাদায়ক জীবনযাত্রা স্পষ্ট করে দেয়, যদি মানুষের সত্যিকারের ইচ্ছাশক্তি থাকে, তবে অসুস্থতা শরীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে; তা কখনও সাহস, সংকল্প বা জীবনের উদ্দেশ্যকে থামিয়ে দিতে পারে না। তাঁর এই অসাধারণ মনোবল, অটল সংকল্প এবং অনুপ্রেরণামূলক কর্মযজ্ঞ আরও বহু বছর ধরে অব্যাহত থাকুক, এই প্রার্থনা ও শুভকামনাই রইল।


শেহতীয়া খবৰ