শান্তি প্রিয় রায়চৌধুরী
অন্যান্য বিশ্বকাপের তুলনায় ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ যেন একটু অন্যরকম। এই বিশ্বকাপের সৌন্দর্য আরও উজ্জ্বল হয়েছে একটু অন্য কারনে। কারন ধর্ম, ভাষা কিংবা সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে এবারের বিশ্বকাপ বিশ্বকে এক ছাদের তলায় নিয়ে এসেছে। কারন এবারের আসরে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে চলেছে মুসলিম বিশ্ব। রেকর্ড ১৪টি মুসলিম দেশ অংশ নিচ্ছে এই গ্রেটেস্ট সো অন আর্থে।
এশিয়া ও আফ্রিকা এই দুই মহাদেশ থেকে সমানভাবে ছয়টি করে দেশ এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। তবে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কোনো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবারের বিশ্বকাপে নেই। এই অংশগ্রহণ শুধু সংখ্যার হিসেবেই নয়, মুসলিম ফুটবলের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও প্রভাবেরও প্রতিফলন।
অংশগ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য দলগুলোর মধ্যে রয়েছে- সৌদি আরব, ইরান, কাতার, জর্ডান, তুরস্ক, মরক্কো, আলজেরিয়া, ইরাক, ইজিপ্ট, সেনেগাল, তিউনিসিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, উজবেকিস্তান সহ অন্যান্যরা। এদের মধ্যে থেকে কয়েকটি দল দীর্ঘদিন পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরছে, আবার কেউ প্রথম বারের মতো অংশ নিচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অংশগ্রহণ আগের যেকোনো বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক বেশি। মোট ১৪টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে, যা প্রথমবারের মতো একটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১১টি দেশ সরাসরি বিশ্বকাপ কোয়ালিফাই করে মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে, আর বাকি ৩টি দেশ প্লে-অফের মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্বে উঠেছে। প্লে-অফ খেলা এই তিনটি দেশের মধ্যে রয়েছে তুর্কিয়ে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং একটি দল যেটি প্রস্তুতি পর্ব ও বাছাইপর্ব পেরিয়ে এসেছে।
এই আসরে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে ইরাক ও তুর্কিয়ে। ইরাক দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে খেলছে, আর তুর্কিয়ে খেলছে প্রায় ২৪ বছর পর। তাদের সঙ্গে সৌদি আরব, ইরান, কাতার, জর্ডান, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া, সেনেগাল ও মিশরের মতো দলগুলো সরাসরি কোয়ালিফাই করে মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপে মোট দল ৩২ থেকে ৪৮-এ উন্নীত হওয়ার কারনেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সংখ্যা ছিল ৬টি, যা শতকরা হিসেবে প্রায় ১৮.৭৫ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে এই সংখ্যা বেড়ে ১৪টি দেশে পৌঁছেছে, যা শতকরা হিসেবে প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে দেখা যাচ্ছে, অংশগ্রহণের হার প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এবার শুধু দল নয়, মুসলিম তারকা খেলোয়াড়ের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে
২০২৬ বিশ্বকাপে শুধু দল নয়, মুসলিম তারকা ফুটবলারদের উপস্থিতিও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর বাইরে ইউরোপের শীর্ষ দলগুলোতেও অনেক মুসলিম খেলোয়াড় খেলছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন লামিন ইয়ামাল, মোহাম্মদ সালাহ, কিলিয়ান এমবাপে, ওসমান দেম্বেলে, ইব্রাহিমা কোনাতে, জামাল মুসিয়ালা, অ্যান্টোনিও রুডিগার, আরদা গুলের, এডিন জেকো এবং সাদিও মানে। এসব খেলোয়াড় ছাড়াও ইরাক, ইরান ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের আরও অনেক নামি ফুটবলার এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন।
তাছাড়া কোচিং স্টাফেও এসেছে অনেক মুসলিম প্রতিনিধি
এবারের বিশ্বকাপে চারটি দেশের দায়িত্বে চারজন মুসলিম কোচ রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ ওয়াহিদ, যিনি মরক্কোর কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, সাবরি লামেসি যিনি তিউনিশিয়ার দায়িত্বে আছেন, জামাল সালামি যিনি জর্ডানের কোচ হিসেবে কাজ করছেন, এবং ইরানের ক্ষেত্রে কোচিং স্টাফে পরিবর্তনের মাধ্যমে একজন মুসলিম কোচ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
সব মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো বিশ্বকাপে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অংশগ্রহণ যেমন ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তেমনি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে মুসলিম খেলোয়াড় ও কোচদের উপস্থিতিও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। ফুটবল যে ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষকে এক করে, এই আসর তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।