মাঠের প্রাচীর থেকে ডাকটিকিটে অমিত ভদ্র, ফুটবলজীবনের অনন্য সম্মান

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
প্রাক্তন জাতীয় ফুটবলার অমিত ভদ্র।
প্রাক্তন জাতীয় ফুটবলার অমিত ভদ্র।
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী

একসময় সবুজ গালিচায় তাঁর উপস্থিতিই ছিল প্রতিপক্ষের আক্রমণের সামনে এক অদৃশ্য প্রাচীর। ভারতীয় ফুটবল দলের রক্ষণভাগে টানা ১২ বছর, এক যুগ, দক্ষতা, নিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। তাঁকে পরাস্ত করা ছিল বহু প্রতিপক্ষের কাছেই কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই তারকা ফুটবলার, প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলার অমিত ভদ্র এবার পেলেন এক বিরল সম্মান। তাঁর নামে প্রকাশিত হলো ডাকটিকিট।
 
শিক্ষক দিবসের মতো বিশেষ দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় অমিত ভদ্রের নামে এই পোস্টাল স্ট্যাম্প। ভারতীয় ডাক বিভাগের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে তাঁর দীর্ঘ ফুটবলজীবনের প্রতি এক অনন্য স্বীকৃতি। বাংলা ত্রিপুরা মৈত্রী মঞ্চ এবং ভিশন অফ বেঙ্গলের উদ্যোগে এই সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। একই অনুষ্ঠানে প্রাক্তন এই তারকা ফুটবলারের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘জীবন কৃতি সম্মান’।
 

বিপ্লবী লীলা রায় প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যখন অমিত ভদ্রের হাতে একে একে এই দুই সম্মান তুলে দেওয়া হয়, তখন আবেগঘন হয়ে ওঠে পরিবেশ। মাঠে যিনি একসময় দেশের জার্সি গায়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখেছেন, সেই ফুটবলারের কৃতিত্বকে এবার স্মরণ করা হলো অন্য এক মঞ্চে, অন্য এক মর্যাদায়।
 
অমিত ভদ্রের ফুটবলযাত্রার সূচনা গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। প্রতিভা, পরিশ্রম এবং ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসার জোরে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি উঠে আসেন আলোচনার কেন্দ্রে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় ফুটবলের পরিচিত মুখ। জাতীয় দলের রক্ষণভাগে তাঁর দৃঢ়তা, নিখুঁত ট্যাকল, প্রতিপক্ষের গতিবিধি বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা এবং মাঠে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
 
দীর্ঘ ১২ বছর জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করা কোনও ফুটবলারের কাছেই নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। অমিত ভদ্রের ক্ষেত্রেও সেই অধ্যায় ছিল সাফল্য, সংগ্রাম ও স্মরণীয় মুহূর্তে ভরা। ভারতীয় ফুটবলের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছেন। তাঁর ফুটবলজীবনের সেই অধ্যায় আজও সমর্থকদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
 
তবে শুধু মাঠের সাফল্যই নয়, ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও অমিত ভদ্র ছিলেন ব্যতিক্রমী। সুদর্শন, সুশিক্ষিত এবং মার্জিত ব্যবহারের জন্যও তিনি পরিচিত ছিলেন। ফুটবল মাঠের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে ব্যক্তিজীবনে তাঁর সেই সৌম্য ব্যক্তিত্ব তাঁকে সমসাময়িক ফুটবলারদের মধ্যেও বিশেষ জায়গা করে দিয়েছিল।
 
সময়ের সঙ্গে ফুটবল মাঠ থেকে দূরে সরে গিয়েছেন তিনি। কিন্তু মাঠের স্মৃতি, দেশের হয়ে তাঁর অবদান এবং ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আজও অমলিন। তাই তাঁর নামে ডাকটিকিট প্রকাশ শুধু একজন প্রাক্তন ফুটবলারকে সম্মান জানানো নয়, বরং ভারতীয় ফুটবলের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কেও স্মরণ করা।
 
শিক্ষক দিবসে এই বিশেষ সম্মান পাওয়ার ঘটনাটি যেন আরও একটি প্রতীকী অর্থ বহন করে। শিক্ষক যেমন প্রজন্মকে পথ দেখান, তেমনই অমিত ভদ্রের মতো ক্রীড়াবিদরা তাঁদের সাফল্য, শৃঙ্খলা ও সংগ্রামের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হয়ে ওঠেন অনুপ্রেরণা।
 
বাংলা ত্রিপুরা মৈত্রী মঞ্চ এবং ভিশন অফ বেঙ্গলের এই উদ্যোগ তাই কেবল একটি সম্মাননা অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে এক ফুটবলারের দীর্ঘ যাত্রাকে ফিরে দেখার উপলক্ষ। মাঠের রক্ষণভাগে যিনি একসময় ছিলেন প্রতিপক্ষের জন্য অপ্রতিরোধ্য প্রাচীর, সময়ের স্রোত পেরিয়ে সেই অমিত ভদ্র এবার জায়গা করে নিলেন ডাকটিকিটের পাতায়।
 
এ যেন মাঠের গৌরব থেকে ইতিহাসের পাতায় উঠে আসার এক অনন্য যাত্রা, একজন তারকা ফুটবলারের জীবনের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।