শ্রীকৃষ্ণের প্রেমের আলোয় মুছে যায় ধর্মের সব সীমারেখা

Story by  Nikunja Nath | Posted by  Aparna Das • 21 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
নিকুঞ্জ নাথ / গুয়াহাটি

ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের সেই গভীর অন্ধকার রাত। চারদিকে প্রবল ঝড় আর মুষলধারে বৃষ্টি, অথচ সেই দুর্যোগের মধ্যেও যেন সমগ্র পৃথিবী অপেক্ষা করছিল এক পরম আলোর আগমনের জন্য। ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু একজন অবতারী পুরুষ নন; তিনি পরমানন্দ, নির্মল প্রেম ও বিশ্বজনীন সমন্বয়ের চিরন্তন প্রতীক। তাঁর জন্ম শুধু কোনো ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক কাহিনি নয়, বরং মানবজীবনের উত্তরণের এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত। যুগের পর যুগ তাঁর জীবন ও আদর্শ মানবজাতিকে ধর্ম, প্রেম ও কর্মের পথে পথ দেখিয়ে এসেছে।
 
প্রতীকী ছবি
 
শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই অবতারের রহস্য উন্মোচন করে বলেছেন:
 
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানম অধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।“ - গীতা ৪.৭
 
অর্থাৎ, যখনই ধর্মের অবনতি ঘটে এবং অধর্মের প্রাদুর্ভাব হয়, তখনই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজ ইচ্ছায় অবতার ধারণ করেন। তিনি আরও বলেছেন:
 
“পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।“, গীতা ৪.৮
 
পরমেশ্বর ভগবান সর্বদা তাঁর দিব্য ধামে বিরাজ করেন, কিন্তু যখন তিনি এই জড় জগতে অবতরণ করেন, তখন তাঁকে ‘অবতার’ বলা হয়। এর কারণ হল, ভক্তদের উদ্ধার করতে এবং দুষ্টদের বিনাশ করতে তিনি মর্ত্যে অবতরণ করেন। হিন্দু দর্শনে পুরুষ অবতার, গুণাবতার, লীলাবতার, শক্ত্যাবেশ অবতার, মন্বন্তর অবতার এবং যুগাবতার ইত্যাদি বহু ধরনের অবতারের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন স্বয়ং পরমেশ্বর এবং সকল অবতারের মূল উৎস। তিনি যেকোনো উপায়ে দুষ্টদের বিনাশ করতে পারেন।
 
প্রতীকী ছবি
 
প্রকৃতপক্ষে, তাঁর বিশেষভাবে অবতার গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। বৃন্দাবনে তাঁর প্রকৃত লীলা দেখার জন্য আগ্রহী নিষ্কাম, শুদ্ধ ভক্তদের দুঃখ-কষ্ট দূর করে তাঁদের আনন্দ প্রদান করার বিশেষ উদ্দেশ্যেই ভগবান কৃষ্ণ অবতার গ্রহণ করেন। পরমেশ্বর ভগবান কেবল ভারতভূমিতেই অবতীর্ণ হন, এমনটা ভাবা ভুল; তিনি যেকোনো সময়ে, যেকোনো স্থানে আবির্ভূত হতে পারেন। কখনও তিনি নিজে আবির্ভূত হন, কখনও নিজের প্রামাণিক প্রতিনিধি পাঠান, অথবা নিজেই ছদ্মবেশে দেখা দেন। কিন্তু তাঁর মূল উদ্দেশ্য একই থাকে: মানুষের মনে ধর্মীয় অনুভূতি জাগিয়ে তোলা। ব্রহ্মার এক দিনের সপ্তম মনুর আঠাশতম চতুর্যুগের দ্বাপর যুগের শেষের দিকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
 
শ্রীকৃষ্ণের জন্মকাহিনি আমরা সকলেই জানি, কিন্তু এই সাধারণ বলে মনে হওয়া কাহিনিটির আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে মানবজীবনের এক গভীর আধ্যাত্মিক রহস্য। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মাতা দেবকী হলেন আমাদের এই নশ্বর শরীরের প্রতীক, অন্যদিকে পিতা বসুদেব হলেন প্রাণ বা জীবনশক্তির প্রতীক। যখন এই শরীরের মধ্য দিয়ে প্রাণশক্তি প্রবাহিত হয়, তখন আনন্দের জন্ম হয় (যার পরমানন্দের প্রতীক হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ)। কিন্তু সেই একই সময়ে অহংকার সেই পরমানন্দকে ধ্বংস করতে চায়। এই অহংকারের প্রতীক হলেন কৃষ্ণের মামা, নিষ্ঠুর রাজা কংস। মানবশরীরের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই এই অহংকারেরও জন্ম হয়, তাই শরীররূপী দেবকী হলেন অহংকাররূপী কংসের বোন।
 
যেখানে আনন্দ থাকে, সেখানে কখনও অহংকার থাকতে পারে না। শ্রীকৃষ্ণ হলেন সুখ, আনন্দ ও স্বাভাবিকতার প্রতীক। তাই অহংকার ও প্রেমের মধ্যে নিরন্তর যুদ্ধ চলতে থাকে। মানুষের অন্তরে যখন প্রেমের উদয় হয়, তখন অহংকার গলে বিলীন হয়ে যায়।
 
প্রতীকী ছবি
 
যখন জীবনে সুখ ও আনন্দ (শ্রীকৃষ্ণ) থাকে না, তখন নিজের শরীরকেই একটি কারাগার বলে মনে হয়। আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়, চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক, হল এই শরীররূপী কারাগারের প্রহরী। তারা আনন্দের সন্ধানে সর্বদা বাইরের জগতের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং প্রকৃতপক্ষে তারা কংসের (অহংকারের) রক্ষী। কিন্তু যখন কারাগারে (শরীরে) পরমানন্দের (শ্রীকৃষ্ণের) জন্ম হল, তখন সমস্ত ইন্দ্রিয় ঘুমিয়ে পড়ল। এর অর্থ হল, যখন কোনো ব্যক্তি অন্তর্মুখী হয়ে নিজের অন্তরে জন্ম নেওয়া পরমানন্দের দিকে এগিয়ে যায়, তখন বাহ্যিক ইন্দ্রিয়গুলি শান্ত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে অহংকারের (কংসের) হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে পরমানন্দকে (কৃষ্ণকে) বৃন্দাবনে (নন্দ ও যশোদার গৃহে) স্থানান্তর করা হয়। বাইরে সুখ খোঁজার পরিবর্তে নিজের অন্তরাত্মায় লুকিয়ে থাকা শ্রীকৃষ্ণরূপী পরমানন্দকে জাগিয়ে তোলাই এই কাহিনির মূল বার্তা।
 
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, কৃষ্ণের আগমন বিপদের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশের মথুরার একটি কারাগারে কংস তাঁর বোন দেবকী ও ভগ্নীপতি বসুদেবকে বন্দি করে রেখেছিলেন। কারণ এক আকাশবাণী কংসকে সতর্ক করে দিয়েছিল যে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান তাঁকে বধ করবে। ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে কংস দেবকীর প্রথম ছয় সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন। তবে ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপে সপ্তম সন্তান বলরামকে নিরাপদে বসুদেবের অন্য স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।
 
অবশেষে সেই অষ্টম রাত এসে গেল। বাইরে এক ভয়ংকর ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হল। এক ঐশ্বরিক সত্তার আগমনের প্রতীকস্বরূপ চারপাশে অলৌকিক ঘটনা ঘটতে শুরু করল। বসুদেবকে বেঁধে রাখা কারাগারের শিকল আপনা-আপনি ছিঁড়ে গেল, প্রহরীরা গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল এবং কারাগারের দরজা খুলে গেল। এমনকি জলে উপচে পড়া যমুনা নদীও দুভাগ হয়ে বসুদেবকে নবজাতক পুত্রকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য পথ ছেড়ে দিল। এই রাতটিই ছিল দুষ্টদের দমন করে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য আগত কৃষ্ণের অসাধারণ জীবনের সূচনা।
 
প্রতীকী ছবি
 
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই আবদ্ধ নন; তাঁর প্রেম ও দর্শন ধর্মীয় সীমারেখা অতিক্রম করে সকলকে একতার বন্ধনে আবদ্ধ করে এসেছে। জন্মাষ্টমী উৎসব ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির এক সুন্দর নিদর্শন তুলে ধরে। ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে, রসখান নামের একজন বিখ্যাত মুসলমান কবি ভগবান কৃষ্ণের প্রতি মুগ্ধ হয়ে নিজের সমগ্র জীবন কৃষ্ণভক্তি ও কৃষ্ণের বন্দনায় অতিবাহিত করেছিলেন। তাঁর রচনাগুলি আজও কৃষ্ণভক্তদের কাছে অমূল্য সম্পদ।
 
শুধু তাই নয়, আজও উত্তরপ্রদেশের মথুরা ও বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণের মূর্তির জন্য সুন্দর পোশাক, মুকুট ও অলংকার তৈরি করা শিল্পীদের অধিকাংশই মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁরা অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে ভগবানের পোশাক প্রস্তুত করেন। অন্যদিকে, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা ও মেলাগুলিতে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে অংশগ্রহণ করে ভ্রাতৃত্ববোধের এক অপূর্ব নিদর্শন তুলে ধরেন। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরে যেমন বৃন্দাবনের সমস্ত জীবজন্তু মুগ্ধ হয়েছিল, ঠিক তেমনই তাঁর প্রেম আজও সমাজের সমস্ত বিভেদ ভুলিয়ে দিয়ে একতার বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে চলেছে।
 
হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুসারে শ্রাবণ বা ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টম দিনে (অষ্টমী তিথি) সমগ্র ভারতজুড়ে অত্যন্ত ভক্তি ও উৎসাহের সঙ্গে জন্মাষ্টমী উৎসব পালন করা হয়। মধ্যরাতে শ্রীকৃষ্ণের প্রতীকী জন্মের পর ভক্তরা শিশু কৃষ্ণের মূর্তিগুলিকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক পরান এবং দোলনা বা আসনে বসান। এরপর ভক্তরা মিষ্টি ও সুস্বাদু খাবার গ্রহণ করে উপবাস ভঙ্গ করেন। মহিলারা বাড়ির বাইরে থেকে পূজাস্থল পর্যন্ত ছোট ছোট পদচিহ্ন আঁকেন, যা কৃষ্ণের তাঁদের হৃদয়ে আসার যাত্রাকে প্রতীকায়িত করে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের রাধা ও কৃষ্ণের রূপে সাজিয়ে তোলার দৃশ্য সকলের মন আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
 
প্রতীকী ছবি
 
জন্মাষ্টমীর পরের দিন পালিত রোমাঞ্চকর ‘দহি হাণ্ডি’র মাধ্যমে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। দুধ, দই, মাখন, মধু ও ফলমূলের এক সুস্বাদু মিশ্রণে পরিপূর্ণ একটি বড় মাটির কলস ২০ থেকে ৪০ ফুট উচ্চতায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। শক্তিশালী যুবক ও ছেলেরা মিলে একটি দুঃসাহসিক মানব পিরামিড তৈরি করে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে যায়। সবার উপরে থাকা ব্যক্তি কলসটি স্পর্শ করে ভেঙে ফেলেন এবং গোটা দলের ওপর মাখনের বৃষ্টি নেমে আসে। এর পাশাপাশি দড়িতে টাকার নোট বেঁধে রাখা হয়, যা পরবর্তী সময়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
 
এই দহি হাণ্ডির অনুপ্রেরণা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালের দুষ্টুমি ভরা লীলা থেকেই এসেছে। প্রবাদ রয়েছে, মাখনের প্রতি দুর্বলতার কারণেই কৃষ্ণ প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে মাখন চুরি করতেন। মহিলারা যাতে তিনি নাগাল না পান, সেজন্য কলসগুলি উঁচুতে ঝুলিয়ে রাখতেন। কিন্তু বুদ্ধিমান কৃষ্ণ তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে মানব পিরামিড তৈরি করে সেগুলির নাগাল পেয়ে যেতেন। শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী তাই শুধু একটি উৎসব নয়; এটি মানবমনের অহংকার দূর করে, সমাজে সম্প্রীতি ও প্রেম প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন ঐশ্বরিক আহ্বান।