যখন মোহাম্মদ শহীদ হকি মাঠে জাদু দেখাতেন

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 21 h ago
মোহাম্মদ শহীদ: হকির সেই জাদুকর, যার স্টিক শুধু বল নিয়ন্ত্রণ করত না, বরং মনে হতো যেন একটি গল্প বুনে চলেছে
মোহাম্মদ শহীদ: হকির সেই জাদুকর, যার স্টিক শুধু বল নিয়ন্ত্রণ করত না, বরং মনে হতো যেন একটি গল্প বুনে চলেছে
 
অনিকা মাহেশ্বরী/ নয়াদিল্লি  

বলা হয়ে থাকে, কিছু খেলোয়াড় শুধু খেলে, আর অন্যরা খেলাকে শিল্পে পরিণত করে। মোহাম্মদ শহীদ ছিলেন এমনই একজন খেলোয়াড়। বলটি তাঁর স্টিকে লাগার মুহূর্তেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের পক্ষে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ত। তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং বল নিয়ন্ত্রণ তাঁকে ১৯৮০-এর দশকে ভারতীয় হকির সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুখ করে তুলেছিল। "শহীদের মতো খেলোয়াড় জীবনে একবারই জন্মায়।"

তাঁর সতীর্থ এবং ভারতীয় হকি কিংবদন্তি জাফর ইকবাল তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে বলেন যে, শহীদ এবং তাঁর হকি স্টিকের মধ্যে একটি অনন্য সম্পর্ক ছিল। বারাণসীর এই ছেলেটি ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিকে ভারতের স্বর্ণপদক বিজয়ী দলের অংশ হয়েছিলেন, তিনটি অলিম্পিকে খেলেছেন, ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেছেন, অর্জুন পুরস্কার ও পদ্মশ্রী পেয়েছেন এবং তাঁর অসাধারণ ড্রিবলিংয়ের জন্য হকিপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য খোদাই হয়ে আছেন।
 

খেলোয়াড়ের পরিচিতি

মোহাম্মদ শহীদ ১৯৬০ সালের ১৪ই এপ্রিল উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মূলত ভারতীয় হকি দলের হয়ে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলতেন। তিনি তার অসাধারণ গতি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং ড্রিবলিংয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন। ১৯৭৯ সালে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় এবং প্রায় এক দশক ধরে তিনি ভারতীয় হকির একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। প্রাপ্ত রেকর্ড অনুযায়ী, তিনি ভারতের হয়ে ১৬৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং ৬৬টি গোল করেছেন। তিনি ১৯৮০, ১৯৮৪ এবং ১৯৮৮ সালের অলিম্পিকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। শহীদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার গতি এবং ড্রিবলিং। তিনি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার দক্ষতার জন্য প্রখ্যাত ছিলেন। এই দক্ষতা তাকে ভারতীয় হকির 'জাদুকর' হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছিল।

শৈশবের জীবন ও সংগ্রাম

বারাণসীর রাস্তায় শুরু হওয়া শহীদের যাত্রা সহজ ছিল না। খুব অল্প বয়সেই তার প্রতিভা স্বীকৃতি পায় এবং তিনি লখনউয়ের স্পোর্টস কলেজে যোগ দেন, যেখানে তিনি তার হকি দক্ষতা শাণিত করার সুযোগ পান। ১৯ বছর বয়সে তিনি ১৯৭৯ সালের জুনিয়র বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে খেলার সুযোগ পান। সেই টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স আন্তর্জাতিক হকি বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত চার-জাতি টুর্নামেন্টে তিনি দুর্দান্ত পারফর্ম করেন। ভারতীয় অধিনায়ক বাসুদেবন ভাস্করনও তার প্রতিভায় মুগ্ধ হন। এই পারফরম্যান্স তাকে ১৯৮০ সালের ভারতীয় অলিম্পিক দলে নিয়ে যায়। সুতরাং, যে বয়সে বেশিরভাগ খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক হকির স্বপ্ন দেখে, সেই বয়সেই শহীদ সেই মঞ্চে নিজের ছাপ রাখছিলেন।
 

ক্রীড়া জীবন: যখন হকি শিল্পে পরিণত হলো

শহীদের খেলাকে শুধু 'ভালো' বলাটা অনুচিত হবে। তিনি মাঠে একজন ওস্তাদ ছিলেন। তাঁর ড্রিবলিং এতটাই চিত্তাকর্ষক ছিল যে তিনি প্রায়শই একাই একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে যেতেন। তাঁর গতি এবং হঠাৎ করে শরীর ঘোরানোর ক্ষমতা প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করত। করাচিতে অনুষ্ঠিত ১৯৮০ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে তিনি সেরা ফরোয়ার্ড নির্বাচিত হন। এই সময়ে তিনি ভারতীয় হকির অন্যতম বিপজ্জনক ফরোয়ার্ডে পরিণত হন। তাঁর বিশেষ কৌশলগুলোর মধ্যে ছিল 'হাফ-পুশ-হাফ-হিট', যেখানে তিনি ড্রিবলিং করার সময় সামান্য পিঠ বাঁকিয়ে দ্রুত সতীর্থের কাছে বল পাঠিয়ে দিতেন। এটি একটি নিখুঁত ও নির্ভুল পাস নিশ্চিত করত। জাফর ইকবালের সাথে তাঁর জুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। তাঁদের বোঝাপড়া ভারতীয় আক্রমণে উল্লেখযোগ্য শক্তি যোগ করত। বাম দিকে জাফর এবং ডান দিকে শহীদ প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেদ করার জন্য পরিচিত ছিলেন।

দেশের জন্য অর্জন

মোহাম্মদ শহীদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় ছিল ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক। মস্কোতে ভারত দুর্দান্ত খেলে স্বর্ণপদক জয় করে। এই ঐতিহাসিক দলের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন শহীদ। অনেক প্রাক্তন খেলোয়াড় সেই জয়ে তাঁর অবদানকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন। এরপর শহীদ ১৯৮২ সালের এশিয়ান গেমসে ভারতের হয়ে রৌপ্যপদক জেতেন। যদিও ভারত ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হেরে যায়, পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে শহীদের পারফরম্যান্স ছিল অন্যতম আকর্ষণ। ১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়ান গেমসে ভারত ব্রোঞ্জ পদক জেতে এবং শহীদ সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন। তাঁর পারফরম্যান্সের সুবাদে তিনি এশিয়ান অল-স্টার দলে জায়গা করে নেন। তিনি ১৯৮০, ১৯৮৪ এবং ১৯৮৮ সালের অলিম্পিকে ভারতের হয়ে খেলেছেন। তিনি ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস এবং ১৯৮৮ সালের সিউল অলিম্পিকেও ভারতীয় দলের অংশ ছিলেন। তিনি ১৯৮৫-৮৬ সালেও ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেন।

অর্জুনের যাত্রা পুরস্কার


ভারতীয় হকিতে নিজের ছাপ ফেলার সময় শহীদের বয়স খুব কম ছিল না। কিন্তু অল্প বয়সেই তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে দেশের শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়দের কাতারে স্থান করে দিয়েছিল। ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিকে স্বর্ণপদক, ১৯৮০ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেরা ফরোয়ার্ডের পুরস্কার এবং আন্তর্জাতিক হকিতে ধারাবাহিকভাবে চিত্তাকর্ষক পারফরম্যান্স তাঁর মর্যাদা আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। এই অসামান্য পারফরম্যান্সের জন্য ১৯৮০-৮১ সালে তাঁকে অর্জুন পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। হকি ইন্ডিয়ার অফিসিয়াল তালিকাতেও মোহাম্মদ শহীদকে ১৯৮০ সালের পুরুষদের অর্জুন পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে, ১৯৮৬ সালে তাঁকে দেশের মর্যাদাপূর্ণ পদ্মশ্রী পুরস্কারেও ভূষিত করা হয়। সুতরাং, অর্জুন পুরস্কারটি তাঁর জন্য কেবল একটি পুরস্কারই ছিল না, বরং ভারতীয় হকিতে তাঁর প্রারম্ভিক কিন্তু অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ক্যারিয়ারের একটি জাতীয় স্বীকৃতি ছিল।

অনুপ্রেরণামূলক কাহিনী: চারজন ডিফেন্ডারের মাঝেও তার স্টিকটি অপ্রতিরোধ্য ছিল

একটি পুরোনো ঘটনা থেকে মোহাম্মদ শহীদের প্রতিভা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে চারজন ডাচ খেলোয়াড় শহীদকে ঘিরে ধরেছিল। মাঠে জায়গা ছিল অত্যন্ত সীমিত, কিন্তু শহীদ ড্রিবল করে তাদের সবাইকে পাশ কাটিয়ে বল নিয়ে বেরিয়ে আসেন। তার সতীর্থ এম. এম. সোমায়া পরে ঘটনাটি স্মরণ করে বলেছিলেন যে, এমন পরিস্থিতি থেকে একমাত্র শহীদই বেরিয়ে আসতে পারতেন। এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি: তিনি চাপের মুখে কখনো ঘাবড়ে যেতেন না। যত বেশি ডিফেন্ডারের মুখোমুখি হতেন, তার ড্রিবলিং তত বেশি রোমাঞ্চকর হয়ে উঠত। তার খেলার সৌন্দর্য ছিল এই যে, তিনি শুধু গোল করার চেষ্টা করতেন না। তিনি দর্শকদের অনুভব করাতেন যে হকিও একটি শিল্প হতে পারে।

ক্রিকেটের যুগে হকি সুপারস্টার

১৯৮০-এর দশকে ভারতীয় ক্রীড়াজগতে ক্রিকেটের প্রভাব দ্রুত বাড়ছিল। ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপের পর ক্রিকেট তারকাদের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই যুগে মোহাম্মদ শহিদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় ছিল। মানুষ তাঁর হকি ম্যাচ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীও তাঁকে তাঁর প্রিয় খেলোয়াড় বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন যে শহিদের খেলা দেখার জন্য তিনি গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকতেন। এটি প্রমাণ করে যে শহিদ শুধু হকি ভক্তদেরই প্রিয় ছিলেন না। তাঁর প্রতিভা অন্যান্য খেলার ভক্তদেরও আকৃষ্ট করেছিল।

খেলাধুলার পরের জীবন

আন্তর্জাতিক হকি থেকে অবসর নেওয়ার পর শহীদ ভারতীয় রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি রেলওয়ে হকি দলের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সালে দিল্লিতে রেলওয়ে জাতীয় শিরোপা জেতে। প্রায় ১৯৮৯ সালের দিকে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয় এবং জীবনের শেষ বছরগুলোতেও তিনি ক্রীড়া জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে, মাঠ ছাড়ার পরেও তাঁর জনপ্রিয়তা অপরিবর্তিত ছিল। তাঁর ড্রিবলিং এবং খেলার ধরন আজও ভারতীয় হকিতে উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করা হয়।

তারা আজ কী করছে?

মোহাম্মদ শহীদ আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি ২০১৬ সালের ২০শে জুলাই, ৫৬ বছর বয়সে গুরুগ্রামে পরলোকগমন করেন। তিনি একটি গুরুতর অসুস্থতার সাথে লড়াই করছিলেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর, আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশন (FIH) তাঁকে ভারতীয় হকির একজন কিংবদন্তি এবং একজন সত্যিকারের সুপারস্টার হিসেবে বর্ণনা করে। তাঁর কীর্তি আজও বেঁচে আছে। ২০২৫ সালে যখন একটি রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পের জন্য বারাণসীতে তাঁর পৈতৃক বাড়িটি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা সামনে আসে, তখন তাঁর পরিবার মোহাম্মদ শহীদের নামে একটি স্মৃতিসৌধ বা চত্বর স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানায়। পরিবারের মতে, এই বাড়িটি কেবল তাঁর জন্মস্থানই ছিল না, বরং তরুণ হকি খেলোয়াড়দের জন্য অনুপ্রেরণার উৎসও ছিল। ২০২৬ সালে, বারাণসীতে 'সর্বভারতীয় পদ্মশ্রী মোহাম্মদ শহীদ আমন্ত্রণ পুরস্কার অর্থ পুরুষ হকি প্রতিযোগিতা' অনুষ্ঠিত হয়, যা তাঁর নাম এবং কীর্তিকে নতুন প্রজন্মের সাথে সংযুক্ত করার একটি উদাহরণ।

মোহাম্মদ শহীদ: একজন খেলোয়াড় নন, বরং হকি খেলার শিল্প

যদি মোহাম্মদ শহীদের ক্যারিয়ারকে কয়েকটি শব্দে সারসংক্ষেপ করতে হয়, তবে সেই শব্দগুলো হবে গতি, দক্ষতা, ড্রিবলিং এবং আবেগ। তিনি ভারতের ১৯৮০ সালের অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয়ে অবদান রেখেছিলেন, এশিয়ান গেমসে পদক জিতেছিলেন, তিনটি অলিম্পিকে খেলেছেন, ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেছেন এবং অর্জুন পুরস্কার ও পদ্মশ্রী পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর পরিসংখ্যানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর খেলার ধরণ। তিনি শুধু বলকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতেন না; তিনি বল দিয়ে একটি গল্প রচনা করতেন। এ কারণেই ভারতীয় হকির ইতিহাসে মোহাম্মদ শহীদের নাম শুধু একজন অর্জুন পুরস্কার বিজয়ী বা অলিম্পিক স্বর্ণপদক বিজয়ী হিসেবে স্মরণীয় নয়। তিনি সেই খেলোয়াড় হিসেবে স্মরণীয়, যিনি হকি ভক্তদের উপলব্ধি করিয়েছিলেন যে মাঠের খেলাও কবিতার মতোই সুন্দর হতে পারে।


শেহতীয়া খবৰ