শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের খ্যাতি বহুদিন ধরেই বাংলার সীমানা পেরিয়ে দেশ-বিদেশে পরিচিত। শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় মাটি যেন প্রাণ পায়। সেই ঐতিহ্যেরই নতুন এক অধ্যায় তৈরি করতে চলেছেন কৃষ্ণনগরের তরুণ মৃৎশিল্পী অগ্নিভ পাল। তাঁর হাতে তৈরি চার ফুট দুই ইঞ্চি উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা এবার পাড়ি দেবে সুদূর জাপানে। মাত্র বছর কুড়ির এক তরুণ শিল্পীর তৈরি প্রতিমার বিদেশযাত্রায় স্বাভাবিকভাবেই খুশি কৃষ্ণনগরের শিল্পীমহল।
কৃষ্ণনগরের ষষ্ঠীতলার বাসিন্দা অগ্নিভের তৈরি এই দুর্গাপ্রতিমাটি ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ হয়েছে। প্রায় তিন মাস ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি প্রতিমাটি তৈরি করেছেন। আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও প্রতিমাটির নির্মাণশৈলী, সূক্ষ্ম কাজ, সাজসজ্জা এবং শিল্পীর নিজস্ব দক্ষতার ছাপ রয়েছে সর্বত্র। এই কাজের মাধ্যমে অগ্নিভ শুধু নিজের শিল্পীসত্তাকেই প্রকাশ করেননি, বরং কৃষ্ণনগরের দীর্ঘদিনের মৃৎশিল্পের ঐতিহ্যকেও নতুনভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন।
জানা গিয়েছে, বুদ্ধ পূর্ণিমার সময় সুদূর জাপান থেকে এই দুর্গাপ্রতিমা তৈরির বরাত আসে। এক আত্মীয়ের মাধ্যমে অগ্নিভের কাছে পৌঁছয় সেই অর্ডার। বিদেশ থেকে আসা এই বিশেষ বরাত পাওয়ার পরই কাজে হাত দেন তরুণ শিল্পী। এরপর প্রায় তিন মাস ধরে চলে প্রতিমা তৈরির কাজ। প্রতিটি ধাপে নিজের দক্ষতা ও যত্নের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। বিদেশে পাঠানোর কথা মাথায় রেখেই প্রতিমাটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে ফাইবার গ্লাস। তবে এই প্রতিমার নির্মাণের শুরুটা হয়েছিল একেবারে চিরাচরিত পদ্ধতিতে, মাটি দিয়েই।
প্রথমে মাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমার সম্পূর্ণ অবয়ব তৈরি করেন অগ্নিভ। মাটির সেই প্রতিমার নকশা ও কাঠামোর ভিত্তিতে তৈরি করা হয় ডাইস। এরপর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সেই অবয়ব ফাইবার গ্লাসে রূপান্তরিত করা হয়। শেষপর্যায়ে প্রতিমায় রং, সাজসজ্জা এবং অন্যান্য খুঁটিনাটি কাজ সম্পন্ন করেন শিল্পী। ফলে আধুনিক উপাদান ব্যবহার করা হলেও প্রতিমাটির নেপথ্যে থেকে গিয়েছে বাংলার চিরাচরিত মৃৎশিল্পের নির্মাণপদ্ধতি ও শিল্পীর হাতের কাজ।
ফাইবার গ্লাসের প্রতিমা তৈরির অন্যতম কারণ তার মজবুত ও টেকসই হওয়া। মাটির প্রতিমার তুলনায় ফাইবার গ্লাস সহজে ভেঙে যায় না। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদেশে পাঠানোর সময় ধাক্কা বা চাপের কারণে প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তুলনামূলকভাবে কম। সেই কারণেই জাপানে পাঠানোর জন্য এই উপাদানকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তবে অগ্নিভের নিজের কথায়, মাটির প্রতিমার সৌন্দর্য একেবারেই আলাদা। মাটির মাধ্যমে শিল্পীর হাতের সূক্ষ্মতা, অভিব্যক্তি এবং নিখুঁত কারুকাজ আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
অগ্নিভ বলেন, অর্ডার পাওয়ার পর প্রায় তিন মাস ধরে তিনি প্রতিমাটির কাজ করেছেন। নিজের হাতে তৈরি প্রতিমা বিদেশে যাবে, এই ভাবনাই তাঁকে আনন্দ দিচ্ছে। তবে ব্যক্তিগত আনন্দের থেকেও বড় বিষয় হল, তাঁর তৈরি প্রতিমার মাধ্যমে কৃষ্ণনগরের শিল্পকর্ম দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের দরবারে পৌঁছনোর সুযোগ পাচ্ছে।
কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এখানকার শিল্পীরা মাটি দিয়ে দেবদেবীর প্রতিমা থেকে শুরু করে মানুষের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। সূক্ষ্ম কারুকাজ, জীবন্ত অভিব্যক্তি এবং নিখুঁত নির্মাণশৈলীর কারণে কৃষ্ণনগরের শিল্পের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। সেই ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে অগ্নিভের মতো তরুণ শিল্পীদের নতুনভাবে এগিয়ে আসা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
বর্তমান সময়ে ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও শিল্পীর জীবন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা এবং নতুন প্রজন্মের অন্য পেশার প্রতি আগ্রহের কারণে বহু পুরনো শিল্পকলা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। সেই পরিস্থিতিতে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে অগ্নিভের এই কাজ নতুন প্রজন্মের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। ঐতিহ্যকে আঁকড়ে থেকেও যে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, তাঁর কাজ যেন তারই উদাহরণ।
একটি দুর্গাপ্রতিমার বিদেশযাত্রা তাই শুধু একটি শিল্পকর্মের স্থানান্তর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্য, বাংলার সংস্কৃতি এবং এক তরুণ শিল্পীর স্বপ্ন। কৃষ্ণনগরের ষষ্ঠীতলার কর্মশালায় তৈরি চার ফুট দুই ইঞ্চির দুর্গা যখন জাপানের মাটিতে পৌঁছবে, তখন তার সঙ্গে পৌঁছবে বাংলার শিল্পভাবনা ও শিল্পীদের সৃষ্টিশীলতার পরিচয়ও।
অগ্নিভের তৈরি এই প্রতিমা তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি কৃষ্ণনগরের শিল্পীমহলের কাছেও গর্বের বিষয়। মাটির সঙ্গে মিশে থাকা বাংলার শিল্প এবার ফাইবার গ্লাসের দুর্গাপ্রতিমার হাত ধরে পৌঁছতে চলেছে উদীয়মান সূর্যের দেশে। কৃষ্ণনগর থেকে জাপান—এই যাত্রা তাই আসলে এক প্রতিমার যাত্রা নয়, বাংলার শিল্প-ঐতিহ্যেরই নতুন এক আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা।