ভক্তি চালক
মাঝরাতে মুম্বরার ডাবহোলকর নাকায় আচমকাই নেমে আসে উৎকণ্ঠা। প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার বিশাল গণেশমূর্তি নিয়ে যাওয়া একটি ট্রলি আচমকা একদিকে হেলে পড়ায় মূর্তিটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিপদের সেই মুহূর্তে অবশ্য ত্রাতার ভূমিকায় এগিয়ে আসেন একদল মুসলিম যুবক। তাঁদের দ্রুত পদক্ষেপে নিরাপদে রক্ষা পায় বাপ্পার বিশাল মূর্তি। এই ঘটনাই ফের সামনে আনল মহারাষ্ট্রের সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক উজ্জ্বল ছবি।
মুম্বরার শঙ্কর মন্দির এলাকার মার্কণ্ডেয় সেবা সংস্থা গণেশোৎসব মণ্ডলের উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছিল প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার দৃষ্টিনন্দন গণেশমূর্তিটি। ভিওয়ান্ডির পদ্মনগর এলাকায় গণেশোৎসবের প্যান্ডেলের উদ্দেশ্যে এই বিশাল গণেশমূর্তি নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল।
রবিবার মাঝরাতে ট্রলিটি মুম্বরার ডাবহোলকর নাকার কাছে পৌঁছায়। আচমকাই ট্রলিটির একটি চাকা ভেঙে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ট্রলিটি একদিকে হেলে পড়ায় প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার গণেশমূর্তিটি মাটিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
সেখানে উপস্থিত আরিফ সৈয়দ, বাসিত শেখ এবং শাহু নামে কয়েকজন যুবকের নজরে পড়ে বিষয়টি। এক মুহূর্তও না ভেবে তাঁরা সাহায্যের জন্য সরাসরি ট্রলিটির দিকে ছুটে যান। সময় নষ্ট না করে ওই যুবকেরা আশপাশে থাকা তাঁদের অন্যান্য মুসলিম বন্ধুদেরও ডাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে বহু যুবক জড়ো হয়ে যান।
২০ ফুটের একটি মূর্তিকে ভারসাম্যে রাখা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। নিজেদের হাত ও শরীরের সাহায্যে ট্রলিটিকে স্থির রাখেন ওই যুবকেরা। রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত টানা চার ঘণ্টা ধরে ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে তাঁরা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকেন, যাতে গণেশমূর্তিটি নিরাপদে থাকে।
এরপর একটি ক্রেন আনা হয়। ক্রেনের সাহায্যে ভেঙে যাওয়া ট্রলি থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিশাল গণেশমূর্তিটি নামানো হয়। একইসঙ্গে আরেকটি নতুন ট্রলির ব্যবস্থা করা হয়। ফের ক্রেনের সাহায্যে মূর্তিটিকে নতুন ট্রলির ওপর অত্যন্ত নিরাপদে বসানো হয়। পুরো ঘটনায় ওই যুবকদের তৎপরতা ও শৃঙ্খলা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
ভোর ৪টার মধ্যে নতুন ট্রলিতে নিরাপদে বসানো হয় গণেশমূর্তিটি। তবে এরপর ঘটে আরও আবেগঘন একটি মুহূর্ত। গণেশমূর্তিটি নিরাপদে ভিওয়ান্ডির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে, সারারাত পরিশ্রম করা সেই মুসলিম যুবকেরাই স্থানীয় এক মৌলানার সঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে ভগবান গণেশের পায়ে নারকেল (শ্রীফল) অর্পণ করেন।
‘বিঘ্নহর্তা’ অর্থাৎ বাধা দূরকারী ভগবান গণেশের পথের বাধা দূর করে তাঁকে ভিওয়ান্ডির উদ্দেশ্যে বিদায় জানানোর পর ওই যুবকদের মুখে ফুটে ওঠে গভীর তৃপ্তির ছাপ। এই ঘটনার একটি ভিডিও বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে এবং সর্বস্তর থেকে প্রশংসা কুড়োচ্ছেন ওই যুবকেরা। মার্কণ্ডেয় সেবা সংস্থা গণেশোৎসব মণ্ডল ধর্ম বা সম্প্রদায়ের কথা না ভেবে সংকটের সময় ভগবান ও মানুষের সাহায্যে ছুটে আসা এই মুসলিম যুবক এবং তাঁদের পুরো দলকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছে।
এই নজিরবিহীন ঘটনা প্রসঙ্গে ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (শরদচন্দ্র পাওয়ার)-এর নেতা এবং মুম্বরা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ড. জিতেন্দ্র আওহাদ নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “গাড়ির চাকা ভেঙে গিয়েছিল, কিন্তু আমাদের বাপ্পার মূর্তি কি পড়ে যেতে পারত? একেবারেই নয়। সেখানে উপস্থিত সমস্ত যুবক, বিশেষ করে মুসলিম যুবকেরা, টানা চার ঘণ্টা ধরে ওই বিশাল গণেশমূর্তিকে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন।”
“সবাই একসঙ্গে এগিয়ে এসেছিল, ক্রেন ডেকেছিল, রাস্তা পরিষ্কার করেছিল এবং সমস্ত ব্যবস্থা করেছিল। এরপর হিন্দু ও মুসলিম ভাইয়েরা একসঙ্গে মূর্তিটি তুলে নতুন গাড়িতে নিরাপদে বসিয়েছিলেন এবং বাপ্পাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বিদায় জানাতে তাঁর পায়ে নারকেল অর্পণ করেছিলেন।” তিনি আরও বলেন, “এটাই আমাদের মুম্বরার প্রকৃত পরিচয়।”
“যাঁরা মুম্বরা দেবীর নামে রাজনীতি করেন, তাঁদের আমি বলতে চাই, এই ঘটনাটি দেবীর মন্দিরের একেবারে সামনে ঘটেছিল। আর যিনি বাপ্পার পায়ে নারকেল অর্পণ করে তাঁকে বিদায় জানিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন আমাদেরই এক মৌলানা সাহেব।” বিধায়ক আওহাদ আরও বলেন, “মুম্বরায় আমরা কখনও এই ধরনের বৈষম্যকে কোনও জায়গা দিই না।”
“গত ৪০-৫০ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, হিন্দু-মুসলিমের নামে এখানে কখনও কোনও দাঙ্গা বা কোনও ধরনের অশান্তি হয়নি। এটাই মুম্বরা ও ভিওয়ান্ডির প্রকৃত চেহারা এবং এখানে কেবল ঐক্যই বিরাজ করে।”
গত কয়েক বছরে সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজনৈতিক মঞ্চে ধর্মীয় পরিবেশকে বিষিয়ে তোলার বহু চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু মুম্বরার মুসলিম যুবকেরা তাঁদের কাজের মাধ্যমে এই সমস্ত প্রচেষ্টার গালে জোরালো চড় মেরেছেন। মুসলিম-অধ্যুষিত মুম্বরা, যা ঐক্যের প্রকৃত অর্থ শেখায়, আরও একবার সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।