মাঠ থেকে অনুপ্রেরণায়: ফুটবলের মাধ্যমে সমাজ গড়তে চান বঙাইগাঁওয়ের মেগো নার্জারি

Story by  Ariful Islam | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
 মেগো নার্জারি
মেগো নার্জারি
 
আরিফুল ইসলাম / গুয়াহাটি

মেগো নার্জারির কাছে ফুটবল শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময়ের খেলায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি তাঁর শ্বাস, তাঁর স্বপ্ন এবং জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কোকরাঝাড়ের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন (এনটিপিসি) বঙাইগাঁওয়ের কাছাকাছি কাঠালগুড়ি গ্রামের খোলা মাঠে শুরু হওয়া তাঁর এই যাত্রা আজ জেলা-স্তরের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের বিশাল মঞ্চে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু মেগোর এই যাত্রাপথ শুধুমাত্র আত্মপ্রতিষ্ঠার যাত্রা নয়, এটি এক নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদনের কাহিনি, যেখানে তিনি নিজে দেখা স্বপ্নগুলো নতুন প্রজন্মের চোখে সাজিয়ে তোলার সংকল্প নিয়েছেন। 
 
একজন দক্ষ মিডফিল্ডার হিসেবে মেগো মাঠে কীভাবে সুযোগ তৈরি করতে হয়, তা ভালোভাবেই বোঝেন। তবে তাঁর নিজের যাত্রাপথ গড়ে উঠেছে দৃঢ় সংকল্প, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামনে আসা সুযোগের মধ্য দিয়েই।
 
শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মুহূর্তে মেগো নার্জারি
 
তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় ৩০ বছর বয়সি মেগোকে পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে। তাঁর বাবা এনটিপিসি সালাকাটিতে একজন চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন। তবুও দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যেও মেগো ফুটবলের প্রতি তাঁর আকর্ষণকে কখনও ম্লান হতে দেননি। তিনি নিয়মিত অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে আসছেন এবং তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকা এই খেলাটির জন্য সময় বের করে নিয়েছেন।
 
গত কয়েক বছরে মেগো বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলেছেন এবং জেলা-স্তরের ম্যাচগুলিতে দলকে প্রতিনিধিত্ব করে গ্রামের মাঠের বাইরেও অমূল্য প্রতিযোগিতামূলক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে এবং অভিজ্ঞ ফুটবলারদের সঙ্গে খেলে তিনি একজন মিডফিল্ডার হিসেবে নিজের দক্ষতাকে আরও শাণিত করেছেন এবং খেলাটির প্রতি তাঁর দখল আরও গভীর করেছেন।
 
বর্তমানে সেই অভিজ্ঞতা একটি নতুন উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছে। সপ্তাহের অন্তর দিনগুলিতে মেগো এনটিপিসি টাউনশিপের তরুণ ফুটবলপ্রেমীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সময় কাটান। তাঁর মতে, একজন তরুণ খেলোয়াড়কে কীভাবে বল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সঠিক পাস কীভাবে দিতে হয় অথবা খেলার শৃঙ্খলা কীভাবে বুঝতে হয়, তা শেখানো সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ারই একটি মাধ্যম। একদিন খেলার সুযোগ খুঁজে বেড়ানো এই ফুটবলার এখন নবাগত খেলোয়াড়দের নিজেদের সামর্থ্যের ওপর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করছেন।এনটিপিসি বঙাইগাঁওয়ের সিএসআর-সমর্থিত গ্রামীণ ক্রীড়া উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাঁর এই অনুরাগকে একটি বিশাল মঞ্চ প্রদান করেছে।
 
গত তিন বছর ধরে এনটিপিসি বঙাইগাঁও তাদের ক্রীড়া পরিষদের মাধ্যমে এবং কোকরাঝাড় জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় আশপাশের গ্রামের প্রতিভাবান ফুটবলারদের সহায়তা করে আসছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের ফুটবল কিট, প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সামগ্রী এবং প্রশিক্ষণের সুবিধা প্রদান করা হয়, যাতে গ্রামাঞ্চলের প্রতিভাবানরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন এবং সুসংগঠিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারেন।
 
দুই ভাই ও বাবা-মায়ের সঙ্গে মেগো নার্জারি
 
এই উদ্যোগ থেকেই জন্ম হয়েছিল ‘পাওয়ার ওয়ারিয়র্স’ নামের একটি গ্রামীণ ফুটবল দলের, যারা কেডিএসএ সুপার লিগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। দলটি আশপাশের সম্প্রদায়ের খেলোয়াড়দের সাধারণ গ্রামীণ খেলা থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুসংগঠিত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করার সুযোগ দিয়েছে।
 
মেগোর জন্য এই মঞ্চ তাঁর ফুটবল যাত্রাকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে, যা তাঁকে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ক্লাব এবং জেলা-স্তরের প্রতিযোগিতায় নিয়ে গেছে। এটি তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার, নিজেকে উন্নত করার এবং তাঁর চারপাশের ক্রীড়া সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার আরও একটি ক্ষেত্র প্রদান করেছে।
 
মিডফিল্ডে মেগোর কাজ হল সংযোগ স্থাপন করা, অর্থাৎ বল গ্রহণ করা, সুযোগ তৈরি করা এবং অন্যদের জন্য পথ খুলে দেওয়া। খেলার মাঠের বাইরেও তিনি প্রায় একই ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছেন, যেখানে তিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে তরুণ খেলোয়াড়দের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত করছেন।
 
মেগো বলেন, “ফুটবল আমার নেশা, এবং আমি চাই আমাদের গ্রামের নতুন প্রজন্ম যেন উন্নত সুযোগ ও সঠিক পথনির্দেশ পায়। এনটিপিসির সিএসআর (CSR) উদ্যোগের মাধ্যমে দেওয়া সহায়তা আমাদের আরও কঠোর অনুশীলন করতে এবং আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছে।”
 
উপযুক্ত সরঞ্জাম, সঠিক পথনির্দেশ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের সুবিধা পেলে কোকরাঝাড়ের গ্রামাঞ্চলে ক্রীড়ার কত গভীর সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে, তা এনটিপিসি বঙাইগাঁওয়ের সিএসআর উদ্যোগটি প্রতিফলিত করে।
 
ফুটবল খেলার মুহূর্তে মেগো নার্জারি
 
এনটিপিসি বঙাইগাঁওয়ের কাছে এই উদ্যোগ শুধুমাত্র একটি ফুটবল দলকে সহায়তা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি স্থানীয় যুবক-যুবতীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, দলগত মনোভাব, শারীরিক সুস্থতা এবং গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত হওয়ার প্রবণতাকে উৎসাহিত করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সীমিত সম্পদ এবং সুযোগের অভাবে সুসংগঠিত ক্রীড়া নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে যেতে পারেন এমন প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন খেলোয়াড়দের জন্য এটি একটি পথ খুলে দেয়।
 
মেগোর যাত্রা এই উদ্যোগকে একটি মানবিক রূপ দিয়েছে। কাঠালগুড়ির মাঠে খেলা থেকে জেলা-স্তরের ফুটবলে, কেডিএসএ সুপার লিগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে শুরু করে সপ্তাহান্তের দিনগুলিতে যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া পর্যন্ত, তাঁর কাহিনি দেখিয়েছে কীভাবে একটি সুযোগ একজন ব্যক্তির মধ্যেই আবদ্ধ না থেকে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
 
কখনও কখনও অর্থবহ পরিবর্তন কোনও বড় পদক্ষেপ থেকে শুরু হয় না। এটি শুরু হয় কারও সম্ভাবনাকে চিনে নেওয়া থেকে, কারও পায়ে একটি ফুটবল তুলে দেওয়া থেকে এবং তাকে স্বপ্ন দেখার জন্য একটি মাঠ দেওয়া থেকে। আর কখনও কখনও, সেই সুযোগ পাওয়া ব্যক্তিটিই অন্য কাউকে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করার জন্য সেই একই মাঠে ফিরে আসেন।