'জ্যান্ত পুতুলে' ভর করে বিশ্বজয় কৃষ্ণনগরের! 'জি আই' তকমা পাওয়ায় সার্থক শিল্পীদের লড়াই, এবার ঐতিহ্য রক্ষায় তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্ম
Story by Tarun Nandi | Posted by Aparna Das • 1 d ago
'জ্যান্ত পুতুলে' ভর করে বিশ্বজয় কৃষ্ণনগরের! 'জি আই' তকমা পাওয়ায় সার্থক শিল্পীদের লড়াই, এবার ঐতিহ্য রক্ষায় তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্ম
তরুণ নন্দী / কলকাতা
কাদামাটি যেন তাঁদের কথা শোনে। শিল্পীদের হাতের জাদুতে একতাল কাদামাটি নিমিষেই রূপ নেয় আস্ত একটা মানুষের। দেখলে মনে হবে যেন ‘জীবন্ত’। নদীয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরের অন্তর্গত সেই বিখ্যাত ঘূর্ণির মাটির পুতুল পেয়েছে বহু প্রতিক্ষিত জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা জিআই (GI) ট্যাগ।
আসলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এই সিলমোহর মিলল মৃৎশিল্পীদের বহু বছরের লড়াইয়ের পর। বলা ভালো, বিশ্বের দরবারে এমনিতেই পরিচিত ছিল কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের নাম। আর এবার গোটা দুনিয়ার মানচিত্রে আরও উজ্জ্বলভাবে খোদাই হয়ে গেল ঘূর্ণির মৃৎশিল্পের নাম।
বহু শিল্পরসিক বলেছেন, কৃষ্ণনগরের 'রিয়ালিস্টিক হিউম্যান ফিগার' বা নিখুঁত মানবমূর্তি গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা অনেকেই মনে করেন, দৈনন্দিন জীবনের নানা মুহূর্তকে মাটির গায়ে রূপ দেওয়া কৃষ্ণনগরের শিল্পীদের রক্তে মিশে আছে। এই শিল্প বংশপরম্পরায় আজ বেঁচে রয়েছে পুতুল পট্টির অলিতে-গলিতে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম একইভাবে টিকিয়ে রেখেছে এই শিল্পের মান।
দেশি বা বিদেশী পর্যটকেরা ঐতিহাসিক শহর কৃষ্ণনগরে ঘুরতে এলেই ছুটে যান ঘূর্ণিতে, আর এখানকার প্রতিটি শিল্পকে চোখের সামনে দেখে বিস্ময়ে চেয়ে থাকেন মাটির সেই জীবন্ত মনে হওয়া পুতুলগুলোর দিকে। কিন্তু এতদিন আসল-নকলের ভিড়ে ঘূর্ণির মাটির পুতুলের নিজস্ব পরিচয়টাই যেন মাঝেমধ্যেই ঢাকা পড়ে যেত। এবার এই জি আই তকমা পেয়ে যাওয়ায় সমস্ত ‘অস্পষ্টতা’ কেটে গেল এই শিল্পের।
কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত ঘূর্ণির মাটির পুতুল
জিআই স্বীকৃতি মেলার পর ঘূর্ণি পুতুল পট্টির রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত মৃৎশিল্পী সুবীর পাল আবেগে জানালেন, প্রাচীন এই শিল্পকে বাঁচাতে কোঅপারেটিভ সোসাইটি এবং শিল্পীরা বহুদিন ধরে নানা চেষ্টা করছিলাম। জিআই ট্যাগ পাওয়ায় কৃষ্ণনগরের নাম ভাঙিয়ে যে সাধারণ পুতুল নানা জায়গায় বিক্রি হতো, এখন আর তা সম্ভব নয়।
তবে একথা ঠিক এই স্বীকৃতি পেয়ে যেন আমাদের দায়িত্বও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। তবে যে কোনো পুতুলে আমরা জি আই লোগো লাগাতে পারব না, গুণগত মানের দিক থেকে এই শিল্পকে আরও নিখুঁত করতে হবে। সারা বিশ্বের দরবারে কৃষ্ণনগরের নাম উজ্জ্বল করতে শিল্পের মান উন্নত করাই এখন আমাদের আসল চ্যালেঞ্জ।
কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পী
অনেকেই মনে করছেন, নিজস্বতার এই স্বীকৃতি শুধু পুরনো শিল্পীদের মুখেই হাসি ফোটায়নি, ঘূর্ণির নতুন প্রজন্মের কাছেও খুলে দিয়েছে রোজগারের সম্ভাবনার এক নতুন পথ। মাটির শিল্পেও হাতযশে ভবিষ্যৎ তৈরি করা যায়, গুণগত মান ঠিক থাকলে আন্তর্জাতিক মর্যাদা পাওয়া যায়, জিআই পাওয়ার পর সেই বিশ্বাস যেন নতুন করে জেগে উঠেছে তরুণ মৃৎশিল্পীদের মনে। ঐতিহ্য আর আধুনিক কৌশলের মেলবন্ধনে কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির মৃৎশিল্পীরা গোটা বিশ্বমঞ্চে যে চমক দিতে প্রস্তুত হচ্ছে, তার স্পষ্ট বার্তা মিলল তাঁদের প্রতিক্রিয়ায়।