পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের কর্মমুখী শিক্ষা দেওয়া অসমের এক ব্যতিক্রমী শিক্ষক আজিজুর রহমান

Story by  Ariful Islam | Posted by  Aparna Das • 4 h ago
শিক্ষক আজিজুর রহমান
শিক্ষক আজিজুর রহমান
 
আরিফুল ইসলাম / গুয়াহাটি

আজ শিক্ষক দিবস। শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আজ অসম সরকার চলতি বছরের রাজ্য শিক্ষক পুরস্কার প্রদান করবে। ২০২৬ সালের রাজ্য শিক্ষক পুরস্কারের জন্য মনোনীত আজিজুর রহমান একজন ব্যতিক্রমী শিক্ষক। শিক্ষার প্রতি একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দীর্ঘ ২৩ বছর শিক্ষকতা করা আজিজুর রহমান ছাত্রছাত্রীদের শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ছাত্রছাত্রীদের মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।

আজিজুর রহমান বর্তমানে ধুবড়ি জেলার গৌরীপুর শিক্ষা খণ্ডের অন্তর্গত দক্ষিণ শালমারায় অবস্থিত পি.এম. শ্রী জামাদারহাট জনতা উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিজ্ঞান বিভাগের একজন বিষয় শিক্ষক (স্নাতকোত্তর শিক্ষক)। তিনি ২০০৪ সাল থেকে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত হন। শিক্ষক আজিজুর রহমান ছাত্রজীবন থেকেই সামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি তিনি ছাত্রছাত্রীদের দক্ষতা উন্নয়নের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
 
একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষক আজিজুর রহমান
 
‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে হওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিক্ষক আজিজুর রহমান বলেন, “শিক্ষকতা করার আগে আমি নেহরু যুবক কেন্দ্রীয় সংগঠনের ভারত সরকারের যুব কল্যাণ ও ক্রীড়া বিভাগে জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছিলাম। সেখানে আমি প্রায় ৪-৫ বছর একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছি। সেখানে আমি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম এবং আর্ত মানুষের জন্য কাজ করার আগ্রহ জন্মেছিল।”
 
শিক্ষক আজিজুর রহমান একজন শিক্ষক হলেও নতুন নতুন বিষয় শেখার আগ্রহ তাঁর অপরিসীম। পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন বিভাগের প্রশিক্ষণগুলিতেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। মীন পালন, কেরিয়ার কাউন্সেলিং, লাইফ স্কিল এডুকেশন, এইচ.আই.বি.এইচ. ইত্যাদির মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং ছাত্রছাত্রীদের সময়ে সময়ে এগুলি সম্পর্কে অবহিত করে গিয়েছেন।
 
“আমি এইচ.আই.বি.এইচ.-এর সচেতনতা তৈরির কাজের সঙ্গেও যুক্ত। ছাত্রছাত্রীদের ভালোভাবে বোঝার উদ্দেশ্যে আমি ২০১৪ সালে CWSN (Children with special needs) নামের একটি কোর্স সম্পূর্ণ করেছিলাম। তখন থেকেই আমি আমাদের গৌরীপুর শিক্ষা খণ্ডের অন্তর্গত বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের বিশেষভাবে সক্ষম ছাত্রছাত্রীদের জন্য কাজ করে আসছি। তাছাড়া সকল ছাত্রছাত্রীকে নিজেদের জীবনশৈলী ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে সামনে রেখে পড়াশোনা করার জন্য উৎসাহিত করি,” আজিজুর রহমান বলেন।
 
ছাত্র -ছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষক আজিজুর রহমান
 
২০২৬ সালের রাজ্য শিক্ষক পুরস্কার লাভ করার জন্য আজিজুর রহমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, শিক্ষামন্ত্রী এবং অসম সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাছাড়া তিনি ধুবড়ি জেলার বিদ্যালয়গুলির উপ-পৰিদৰ্শক, জামাদারহাট উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা তথা ছাত্রছাত্রীদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। “এই পুরস্কার লাভ করার জন্য আমি যথেষ্ট খুশি এবং এই পুরস্কার আমাকে আগামী দিনে নিজের শিক্ষকতার মাধ্যমে বিদ্যালয় তথা ছাত্রছাত্রীদের জন্য ভালো ভালো কাজ করার ক্ষেত্রে প্রেরণা জোগাবে,” আজিজুর রহমান বলেন।
 
উল্লেখযোগ্য যে, এর আগেও আজিজুর রহমান বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেছেন। ১৯৯৯ সালে নেহরু যুবক সংঘ তাঁকে ধুবড়ি জেলার শ্রেষ্ঠ যুবক সম্মানে সম্মানিত করেছিল। বিশেষভাবে সক্ষম ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে কাজ করার জন্য তাঁকে ২০১৯ সালে বিশিষ্ট রিসোর্স পার্সন হিসেবে পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল। ২০১৭ সালে তিনি নেপালের কাঠমান্ডুতে এশিয়ান এক্সেলেন্স পুরস্কার লাভ করেছিলেন। ২০২১ সালে ধুবড়ি জেলা শিক্ষক সমিতি তাঁকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবেও পুরস্কৃত করেছিল। তাছাড়া তিনি স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকটি কৃতী শিক্ষক পুরস্কার লাভ করেছেন।
 
ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে শিক্ষক আজিজুর রহমান বলেন, “সময়ের সঙ্গে সবকিছুতেই কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সবকিছুই ডিজিটাল হয়েছে। মোবাইলের ব্যবহার বেড়েছে। আগের এবং বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। আগের ছাত্রছাত্রীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে একান্ত মনে অধ্যয়ন করত। আজকাল মোবাইলের মাধ্যমেও অধ্যয়ন করে। কিন্তু বর্তমানে ছাত্রছাত্রীদের মোবাইলের কারণে বিচলিত হতে দেখা যায়। সবকিছুরই ভালো-মন্দ ব্যবহার রয়েছে। তাই ছাত্রছাত্রীরা প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করে এগিয়ে যাক।”
 
শিক্ষক আজিজুর রহমান
 
দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাগত ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রেও শিক্ষকগৃহীত উল্লেখযোগ্য অবদান প্রশংসনীয়। তাঁর নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা এবং আদর্শ শিক্ষকতার প্রতি সম্মান জানিয়ে দেওয়া এই স্বীকৃতি ধুবড়ি জেলার দক্ষিণ শালমারা অঞ্চলের পাশাপাশি সমগ্র এলাকার শিক্ষানুরাগী মানুষের মধ্যে আনন্দ বয়ে এনেছে।
 
উল্লেখযোগ্য যে, রাজ্য সরকার আজ প্রদান করতে চলা ২০২৬ সালের রাজ্য শিক্ষক পুরস্কারের জন্য রাজ্যের ১৪টি জেলার মোট ১৫ জন শিক্ষক স্থান পেয়েছেন। সরকার পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত শিক্ষকরা হলেন, যোরহাট জেলার মালৌআলি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শ্যামলিমা বড়ুয়া, কামরূপ মহানগর জেলার কামাখ্যা বিদ্যালয় হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক বিজয় বয় ভৌমিক, নলবাড়ির গর্ডন স্কুলের স্নাতকোত্তর শিক্ষক মানব ভরালী, ডিব্রুগড়ের রহমরিয়া উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষক বিজু কুমার চুতীয়া, ডিব্রুগড়ের ফটিকাচোয়া অভয়পুরীয়া এম.ভি. স্কুলের সহকারী শিক্ষক দিতিমণি দত্ত, শোণিতপুর জেলার তেজপুর উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষক নবীন কোচ, বরপেটার ভেল্লা উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ রণেন্দ্র কুমার দাস, ধুবড়ির জামাদারহাট জনতা উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষক আজিজুর রহমান, নগাঁওয়ের বারপূজীয়া উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মানিক চন্দ্র নাথ
 
কোকরাঝাড়ের হরিণাগুড়ি হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক বিবি প্রসাদ ব্রহ্ম, গোলাঘাটের চৌকিয়াল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পুলস্কা রাজখোয়া, হোজাই জেলার লামডিঙের হাতীখালি অসমীয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সারংগ নির্মালিয়া, দহঙের গোবিন্দধাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বেফুলা ডেকা শইকীয়া, কাছাড় জেলার টিকলপার চা-বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক স্বাস্ত্যয়ন দেব এবং কার্বি আংলং জেলার বকলিয়াঘাট সরকারি এম.ভি. স্কুলের প্রধান শিক্ষক কামছিং হাঞ্চে। শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আজ গুয়াহাটির পাঞ্জাবাড়িতে থাকা শ্রীমন্ত শংকরদেব কলাক্ষেত্রের দামোদরদেব আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাগৃহে হতে চলা অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কারগুলি প্রদান করা হবে।