দেবকিশোর চক্রবর্তী
বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কিছু ঘটনা সময়ের সীমানা পেরিয়ে প্রতীকে পরিণত হয়। ২০০৭ সালে বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিনের কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার ঘটনাও তেমনই একটি অধ্যায়। প্রায় দুই দশক পরে আবার তাঁর কলকাতায় আসার সম্ভাবনা ঘিরে নতুন করে আলোচনায় ফিরেছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সংস্কৃতির পরিসর। আগামী ১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনে মৌলবাদবিরোধী কবি-সাহিত্যিকদের এক অনুষ্ঠানে তাঁর যোগদানের খবর ইতিমধ্যেই সাহিত্য ও রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন তুলেছে।
একজন লেখকের প্রত্যাবর্তন কখনও কখনও শুধু ব্যক্তিগত সফর থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। তসলিমা নাসরিনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটাই তেমন। কারণ তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিতর্ক, নির্বাসন, প্রতিবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দীর্ঘ লড়াই।বাংলা ভাষার অন্যতম আলোচিত লেখকদের মধ্যে তসলিমা নাসরিন একটি স্বতন্ত্র নাম। নারী-অধিকার, ধর্মীয় মৌলবাদ, সামাজিক বৈষম্য এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে তাঁর নির্ভীক লেখনী তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। আবার এই স্পষ্টভাষিতাই তাঁকে একাধিক দেশে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ছাড়ার পর কলকাতাকে তিনি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু সেই আশ্রয়ও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।২০০৭ সালে তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ দ্বিখণ্ডিত ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার শেষ পর্যন্ত তাঁকে কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। সরকারের যুক্তি ছিল, সামাজিক শান্তি বজায় রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে ঘিরে শুরু হয় আরেক বিতর্ক—রাষ্ট্র কি একজন লেখকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, নাকি বিতর্ক এড়াতে তাঁকেই সরে যেতে বলবে?
তসলিমা তাঁর অনুরাগীদের সঙ্গে
আজও সেই প্রশ্নের সহজ উত্তর মেলেনি।সময়ের চাকা ঘুরেছে। বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলেছে। সেই বদলের আবহেই আবার কলকাতায় আসছেন তসলিমা—এমন খবর প্রকাশ্যে আসতেই বিষয়টি শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজনৈতিক দলগুলিও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে শুরু করেছে। কেউ একে অতীতের ভুল সংশোধন বলছেন, কেউ আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আইন-শৃঙ্খলার বাস্তব পরিস্থিতিকে অস্বীকার করা যায় না।
তবে রাজনীতির বাইরেও এই ঘটনার একটি বড় সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে। বাংলা ভাষা বরাবরই মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ এবং বিতর্কের ঐতিহ্য বহন করেছে। রাজা রামমোহন রায় থেকে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল—প্রতিটি যুগেই প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহসই বাংলার বৌদ্ধিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। সেই ইতিহাসের উত্তরসূরি হয়েও কি আমরা একজন বিতর্কিত লেখকের মতপ্রকাশের অধিকারকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পেরেছি? এই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—শুধু স্লোগান নয়, পরীক্ষার বিষয়
গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক মূল্যবোধ। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার মুখে পড়ে তখনই, যখন কোনও মত সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দের সঙ্গে মেলে না। তসলিমা নাসরিনের লেখার সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু তাঁর লেখার অধিকার এবং নিরাপদে থাকার অধিকার—এই দুই প্রশ্নকে আলাদা করে দেখা জরুরি।অনেক সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞের মতে, কোনও বইয়ের প্রতিবাদ বই লিখে, বিতর্ক করে বা আইনের পথে হওয়া উচিত। জনরোষের ভয়ে লেখককে সরিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য সুখকর নজির নয়।
প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও ভাষাবিদ পবিত্র সরকার
প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও ভাষাবিদ পবিত্র সরকারের বক্তব্য:"লেখকের সঙ্গে মতের অমিল থাকতেই পারে। কিন্তু মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করাই একটি সভ্য সমাজের পরিচয়।"
সাহিত্যসমালোচকদের একাংশের মত:"তসলিমার লেখায় অনেকেই আপত্তি তুলতে পারেন। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি বা লেখাকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে তার জবাব যুক্তি এবং সাহিত্যের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ:"এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন লেখকের সফর নয়; এটি বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বার্তা দেওয়ারও একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।"সাধারণ পাঠকের প্রতিক্রিয়া:সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই লিখছেন, "তসলিমার সব মতের সঙ্গে একমত নই, কিন্তু বাংলায় এসে কথা বলার অধিকার তাঁর অবশ্যই আছে।" আবার অন্য একটি অংশের বক্তব্য, "মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।"
ইতিহাস কি নতুন উত্তর খুঁজছে?
তসলিমা নাসরিন যদি সত্যিই ১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে দাঁড়ান, তবে সেটি নিঃসন্দেহে একটি প্রতীকী মুহূর্ত হবে। কারণ এই শহরই তাঁকে একদিন সাহিত্যিক হিসেবে গ্রহণ করেছিল, আবার এই শহর থেকেই তাঁকে বিতর্কের আবহে বিদায় নিতে হয়েছিল। প্রায় কুড়ি বছর পর সেই শহরে তাঁর প্রত্যাবর্তন যেন ইতিহাসের একটি অসমাপ্ত বাক্যের পরবর্তী লাইন।
এটি কোনও ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়। বরং এটি বাংলার গণতান্ত্রিক চেতনা, সাংস্কৃতিক উদারতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ইতিহাস কখনও পুরোপুরি মুছে যায় না, কিন্তু ইতিহাসের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। তসলিমা নাসরিনের সম্ভাব্য এই প্রত্যাবর্তন সেই শিক্ষারই নতুন উপলক্ষ—যেখানে প্রশ্ন একটাই, বাংলা কি আবারও মুক্ত চিন্তার ঠিকানা হতে পারবে?