৪৪ বছর ধরে রামলীলার নেপথ্যে মুসলিম শিল্পী! সইব আহমেদের হাতেই মঞ্চে প্রাণ পায় রামায়ণের চরিত্র

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 17 h ago
৪৪ বছর ধরে রামলীলার নেপথ্যে মুসলিম শিল্পী! সইব আহমেদের হাতেই মঞ্চে প্রাণ পায় রামায়ণের চরিত্র
৪৪ বছর ধরে রামলীলার নেপথ্যে মুসলিম শিল্পী! সইব আহমেদের হাতেই মঞ্চে প্রাণ পায় রামায়ণের চরিত্র
 
অনিকা মাহেশ্বরী / নয়াদিল্লি

ধর্মের বেড়া পেরিয়ে সংস্কৃতির টানে এক অনন্য নজির গড়েছেন উত্তরাখণ্ডের নৈনিতালের তল্লীতালের সইব আহমেদ। গত ৪৪ বছর ধরে ঐতিহাসিক রামলীলায় অংশ নেওয়া শিল্পীদের মেকআপ করে মঞ্চে ওঠার জন্য প্রস্তুত করছেন তিনি। ১৯৮২ সালে শুরু হওয়া তাঁর এই নিরলস যাত্রা আজও অব্যাহত। ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধনে তাঁর এই অবদান হয়ে উঠেছে পারস্পরিক সৌভ্রাতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
 
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রামলীলার সঙ্গে যুক্ত সইব আহমেদের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি কাজ নয়, বরং শিল্প, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাঁর ভূমিকা এই বার্তাও দেয় যে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কোনও একটি ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বিভিন্ন পটভূমির মানুষের অংশগ্রহণে তা আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
তল্লীতালে রামলীলার মঞ্চায়ন শুরু হলেই নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সইব আহমেদ। একাই তিনি রামলীলার সমস্ত চরিত্রের সাজসজ্জা করেন এবং তাঁদের অভিনয়ের জন্য প্রস্তুত করে তোলেন। রং ও মেকআপের মাধ্যমে শিল্পীদের মুখে তাঁদের চরিত্র ফুটিয়ে তুলে মঞ্চে সেই চরিত্রগুলিকে জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
 
ভরত ও সুমন্তের মতো চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীরাও দীর্ঘদিন ধরে তাঁর হাতেই মেকআপ করিয়ে আসছেন। ফলে সইব আহমেদের ভূমিকা শুধু শিল্পীদের সাজসজ্জার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এই আয়োজনের ঐতিহ্য এবং শিল্পীদের অভিজ্ঞতারও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন তিনি। সইব আহমেদ জানান, ছোটবেলা থেকেই মঞ্চ ও অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। রামলীলার আয়োজনের জন্য তিনি সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন। রামলীলার সময় এলেই সম্পূর্ণ নিষ্ঠা ও উৎসাহের সঙ্গে নিজের কাজে লেগে পড়েন তিনি।
 
শিল্পীদের চরিত্র অনুযায়ী সাজানো, তাঁদের প্রয়োজন বুঝে নেওয়া এবং মঞ্চে ওঠার আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা তাঁর দৈনন্দিন কাজেরই অংশ। তাঁর কাছে এই কাজ শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকারও একটি উপায়। ১৯৮৫ সালে কুর্মাঞ্চলি রামলীলায় তিনি দ্বিতীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন। এই স্বীকৃতি মঞ্চের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা ও শিল্পের প্রতি আগ্রহেরই পরিচয় দেয়। এরপরও রামলীলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট থেকেছে। শিল্পী ও দর্শকদের ভালোবাসা তাঁকে এই ঐতিহ্য এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
 
তল্লীতালের রামলীলায় অংশগ্রহণকারী শিল্পীরাও সইব আহমেদের অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। ভরতের চরিত্রে অভিনয় করা এক শিল্পী জানান, রামলীলা শুরু হওয়ার জন্য তিনি কয়েক মাস ধরে অপেক্ষা করেন। কবে মঞ্চায়ন শুরু হবে, কবে তাঁকে নিজের চরিত্রে দেখা যাবে এবং কবে সইব আহমেদ তাঁর মেকআপ করবেন, তা নিয়ে তাঁর মধ্যে বিশেষ আগ্রহ কাজ করে। তাঁর কাছে এই প্রস্তুতি রামলীলার অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সুবাদে শিল্পী ও মেকআপ শিল্পীর মধ্যে যে বিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা এই আয়োজনকে অনেকটা পারিবারিক বন্ধনের রূপ দিয়েছে।
 
সইব আহমেদ শিল্পীদের মেকআপ করে মঞ্চে ওঠার জন্য প্রস্তুত করছেন
 
একইভাবে, রামলীলায় সুমন্তের চরিত্রে অভিনয় করা ময়ঙ্ক সাহও সইব আহমেদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। ময়ঙ্ক জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে তিনি যখন প্রথম রামলীলায় অংশ নিতে শুরু করেন, তখন তাঁকে বানরের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
 
সেই সময়ও তাঁর মেকআপ করেছিলেন সইব আহমেদ। এত বছর পরেও তিনি নিয়মিত ময়ঙ্কের মেকআপের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ময়ঙ্কের মতে, রামলীলার বিভিন্ন চরিত্র এবং হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য সম্পর্কে সইব আহমেদের যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। সেই কারণেই শিল্পীরা তাঁর অভিজ্ঞতার উপর ভরসা করেন এবং মঞ্চে নিজেদের চরিত্রকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে তাঁর সাহায্য নেন।
 
সইব আহমেদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, কোনও সাংস্কৃতিক আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তুলতে শুধু মঞ্চে দৃশ্যমান শিল্পীদের অবদানই গুরুত্বপূর্ণ নয়, পর্দার আড়ালে কাজ করা মানুষদের ভূমিকাও সমান তাৎপর্যপূর্ণ।
মেকআপ, পোশাক, মঞ্চসজ্জা এবং আয়োজনের অন্যান্য প্রস্তুতি মিলিয়েই রামলীলা হয়ে ওঠে আকর্ষণীয় ও প্রভাবশালী। গত ৪৪ বছর ধরে এই গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সইব আহমেদ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীদের প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু রামলীলার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা অটুট রয়েছে। পুরনো শিল্পীদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণকারীদেরও প্রস্তুত করে তোলা তাঁর দীর্ঘ যাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
 
সইব আহমেদের কথায়, গত চার দশকে রামলীলার আয়োজন ও মঞ্চায়নের ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে ধর্মীয় রীতিনীতি এবং খাদ্যাভ্যাসের নিয়মকানুনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। সেই সময় রামলীলার দিনগুলিতে অনেকেই রসুন ও পেঁয়াজ পর্যন্ত খেতেন না।
 
সইব আহমেদ শিল্পীদের মেকআপ করে মঞ্চে ওঠার জন্য প্রস্তুত করছেন
 
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই রীতিনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে রামলীলা আরও নাটকীয় আঙ্গিকে পরিবেশিত হচ্ছে। মঞ্চায়নের ধরন, উপস্থাপনা এবং আয়োজনের ব্যবস্থাপনাতেও নানা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনগুলির মধ্যেও রামলীলার প্রতি সইব আহমেদের টান কমেনি। আজও একই উৎসাহে তিনি শিল্পীদের প্রস্তুত করেন এবং এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিজের ভূমিকা পালন করেন।
 
রামলীলার সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি নিজের বাড়িতে মানুষের জন্মকুণ্ডলী তৈরির কাজও করেন সইব আহমেদ। অন্যান্য দায়িত্ব সামলেও প্রতি বছর রামলীলার জন্য সময় বের করে নেন তিনি। এই উদ্যোগই আয়োজনটির প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতার প্রমাণ। দীর্ঘদিন ধরে পালন করে আসা এই দায়িত্ব তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। রামলীলার মহড়া বা তালিমের সময়ও তিনি শিল্পীদের উৎসাহ দিতে উপস্থিত হন। এর থেকেই স্পষ্ট, তাঁর অবদান শুধু মঞ্চায়নের দিনগুলিতেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রস্তুতির পর্বেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন তিনি।
 
সইব আহমেদের বিশ্বাস, প্রত্যেক ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষেরই নিজেদের স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখা উচিত। ভগবান শ্রীরামকে তিনি মর্যাদা পুরুষোত্তম হিসেবে মানেন। পাশাপাশি, রামলীলার মতো সাংস্কৃতিক আয়োজনে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণকেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তাঁর মতে, নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে বোঝাপড়া তৈরির সূচনা হয় পরিবার থেকেই। তরুণ প্রজন্ম যখন নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সম্পর্কে জানে এবং তাতে অংশগ্রহণ করে, তখন পুরনো ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথ আরও মজবুত হয়।
 
তল্লীতালের রামলীলায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণও দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন দায়িত্ব ও ভূমিকার মাধ্যমে এই আয়োজনে অবদান রেখে আসছেন তাঁরা। এমন পরিবেশে সইব আহমেদের চার দশকেরও বেশি সময়ের যাত্রা পারস্পরিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অংশীদারির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর কাজ তুলে ধরে, শিল্প ও সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। সইব আহমেদের হাতে প্রস্তুত হয়ে যে শিল্পীরা মঞ্চে ওঠেন, তাঁরা শুধু নিজেদের চরিত্রেই অভিনয় করেন না, বরং এমন এক যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ হয়ে ওঠেন, যা বহু প্রজন্মের মানুষ একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
 
তল্লীতালের রামলীলায় শিল্পীরা
 
নৈনিতালের তল্লীতালের রামলীলায় সইব আহমেদের কাহিনি দেখিয়ে দেয়, কোনও ঐতিহ্যের শক্তি গড়ে ওঠে তার প্রতি নিষ্ঠা এবং সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে। ১৯৮২ সাল থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করে আসা সইব আহমেদ তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে রামলীলার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
 
তাঁর কাছে এটি শিল্পচর্চা, সেবা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকার এক বিশেষ সুযোগ। তাঁর ৪৪ বছরের এই যাত্রা প্রমাণ করে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ ধর্মীয় আয়োজনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই সমাজে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।


শেহতীয়া খবৰ