‘নিজের হাতে মাংস রান্না করে খাওরাতেন’, স্মৃতির অ্যালবামে জুবিনকে ফিরে দেখা পরিচালক প্রীতমের
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
গায়ক হিসেবে জুবিন গার্গের জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু মঞ্চের আলো আর স্টুডিয়োর বাইরেও যে এক অসাধারণ মানবিক মানুষ ছিলেন তিনি, সেই অজানা অধ্যায়ই এবার সামনে আনছেন পরিচালক ও সঙ্গীত পরিচালক শ্রী প্রীতম বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রয়াত শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি নির্মাণ করছেন চলচ্চিত্র ‘লভ ইউ জুবিনদা’।
প্রীতমের সঙ্গে জুবিনের পরিচয় বহু বছরের। ‘ইডিয়ট’, ‘খোকা ৪২০’, ‘খিলাড়ি’-সহ একাধিক বাংলা ছবিতে তাঁর পরিচালনায় গান গেয়েছিলেন জুবিন। সেই সূত্রেই বারবার যাওয়া হয়েছে গুয়াহাটি। আর প্রতিবারই কাছ থেকে দেখেছেন এক অন্য জুবিনকে। প্রীতমের কথায়, রেকর্ডিং শেষ হলেই অতিথিদের নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন জুবিন। কখনও নিজের হাতে রান্না করা বাতাবি লেবুর পাতা দিয়ে মুরগির মাংস খাওয়াতেন, কখনও গভীর রাতে শহরের নানা জায়গা ঘুরিয়ে দেখাতেন। অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে স্টুডিয়োয় পৌঁছে দেওয়া, সব দায়িত্বই নিজে সামলাতেন।
‘লভ ইউ জুবিনদা’ ছবির পোস্টার
তবে জুবিনের যে দিকটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে প্রীতমকে, তা তাঁর নিঃস্বার্থ মানবসেবা। পরিচালক জানান, পারিশ্রমিক হাতে পাওয়ার পর রাতের শহরে বেরিয়ে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতেন জুবিন। অনেক সময় ফুটপাথে ঘুমিয়ে থাকা মানুষের চাদরের তলায় নিঃশব্দে টাকা গুঁজে দিয়ে চলে আসতেন। কেউ জানত না, কে সাহায্য করে গেল।
শুধু অর্থসাহায্যই নয়, শীতের রাতে অসহায় মানুষের গায়ে নিজের হাতে কম্বল বা চাদরও জড়িয়ে দিতেন তিনি। এক বৃদ্ধার ছোট্ট দোকানে পিঠে খেতে গিয়ে ১০০ টাকার খাবারের বদলে হাজার হাজার টাকা দিয়ে আসার ঘটনাও আজও স্পষ্ট মনে আছে প্রীতমের।
পরিচালকের কথায়, “জুবিনদা শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশাল হৃদয়ের মানুষ। তাঁর গাওয়া মানেই গান জনপ্রিয় হত, কিন্তু মানুষের জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিল তারও অনেক বড়।”
২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে প্রয়াত হন জুবিন গার্গ। মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও প্রীতমের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। ২৬ সেপ্টেম্বর দেখা হওয়ার কথা থাকলেও সেই সাক্ষাৎ আর হয়নি। সেই অপূর্ণতাই আজ ছবি তৈরির অনুপ্রেরণা।
‘লভ ইউ জুবিনদা’ নির্মাণের আগে জুবিনের স্ত্রী গরিমা শইকিয়ার অনুমতিও নিয়েছেন প্রীতম। তিনি জানান, আজও জুবিনের প্রসঙ্গ উঠলেই আবেগে ভেঙে পড়েন গরিমা। তাঁর মতে, শুধু স্ত্রী নন, জুবিনের দীর্ঘ পথচলার সহযোদ্ধাও ছিলেন তিনি।
জুবিনের প্রয়াণের পর অসমজুড়ে যে অভূতপূর্ব শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা এখনও ভোলেননি প্রীতম। তাঁর দাবি, বহু মানুষ স্বেচ্ছায় দীর্ঘদিন আমিষ খাবার ত্যাগ করেছিলেন। অনেক জায়গায় মাংসের দোকানও বন্ধ ছিল। সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসার কারণ হিসেবে তিনি দেখেন জুবিনের সমাজসেবামূলক কাজকে।
অসমের কারও পড়াশোনার খরচ, কারও চিকিৎসা, কারও মেয়ের বিয়ে, মানুষের বিপদের খবর নীরবে জোগাড় করে পাশে দাঁড়াতেন জুবিন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর পরিবার বা ঘনিষ্ঠরাও জানতেন না, কীভাবে তিনি সাহায্য করতেন।
সেই মানবিক, উদার এবং মানুষের শিল্পী জুবিন গার্গকেই এবার বড় পর্দায় তুলে ধরতে চান প্রীতম বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর আশা, এই ছবি শুধু একজন জনপ্রিয় গায়কের জীবন নয়, মানুষ জুবিনের অজানা গল্পও নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরবে।