ওনিকা মাহেশ্বরী / নয়াদিল্লি
মানুষের কল্যাণে কাজ করার অদম্য ইচ্ছাশক্তিই একজন প্রকৃত সমাজসেবীকে আলাদা পরিচিতি দেয়। সেই পরিচয়ের উজ্জ্বল উদাহরণ ৩৪ বছর বয়সি সমাজসেবী ও সামাজিক উদ্যোক্তা সানা খান। তিনি ২০১০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেন ‘রাহাত ফাউন্ডেশন’। গত ১৪ বছর ধরে সংস্থাটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামগ্রিক কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। বর্তমানে উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং মহারাষ্ট্রে এর সক্রিয় ইউনিট রয়েছে।
‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সানা খান জানান, তাঁর কাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো স্কুলছুট কিশোরীদের আবার শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। রাহাত ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তাঁদের জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওপেন স্কুলিং (এনআইওএস)-এর মতো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানো হয়। তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষা সাফল্যের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি প্রায় ২,০০০ জন স্কুলছুট শিক্ষার্থীকে পুনরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন।
সানা খান
সানা জানান, রাহাত ফাউন্ডেশন শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, প্রয়োজনমতো সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করে। শিক্ষা ছাড়াও সংস্থাটি দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মসংস্থানের দায়িত্বও গ্রহণ করে। এখানে ডিজিটাল মার্কেটিং, ফ্যাশন ডিজাইনিংসহ বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কোর্স পরিচালিত হয়। পাশাপাশি দিল্লির প্রায় ২৫৬ জন সুবিধাবঞ্চিত তরুণীকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতেও সংস্থাটি সহায়তা করেছে।
সানার কথায়, রাহাত ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রায় ১,০০০ জন তরুণ-তরুণী ইতিমধ্যেই কর্মসংস্থান পেয়েছেন। প্রায় ৬,০০০ জন শিক্ষার্থী ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন এবং ৪,০০০ জন তরুণী ফ্যাশন ডিজাইনিং কোর্সে ভর্তি হয়েছেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে তিনি নিজে ওখলা ফেজ-২-এর বিভিন্ন ফ্যাশন সংস্থা, আইটি সেক্টরের প্রতিষ্ঠান, কল সেন্টার এবং সুইগি, জোম্যাটো ও ওলা-র মতো সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের চাকরির সুযোগ করে দেন।
সানা খানের নিজের জীবনও সংগ্রামের এক অনন্য উদাহরণ। তিনি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন এবং তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর, তখনই বাবাকে হারান। সেই সময় তাঁর পরিবারে ছিলেন মা ও দুই বড় ভাই। পরিবারকে চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। সেই কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেই জানান তিনি। তখন একটি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থার সহায়তা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে ভবিষ্যতে একই রকম সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
একটি অনুষ্ঠানে সানা খান
বর্তমানে রাহাত ফাউন্ডেশন সুবিধাবঞ্চিতদের পরীক্ষার ফি, বইপত্র এবং অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা-সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করে। যদিও কখনও কখনও আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়, তবুও সমাজের বিভিন্ন মানুষের অনুদান ও তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হয়।
সানা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি জানান, কাউকে সহায়তা দেওয়ার আগে সংস্থা প্রতিটি ঘটনার সত্যতা যাচাই করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা করে। এরপর তাঁদের ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হয়। তিনি আরও জানান, রাহাত ফাউন্ডেশন শুধু মেয়েদের নয়, ছেলে ও মেয়ে, উভয়ের জন্যই কাজ করে।
বিগত কয়েক বছরে সানা একটি শক্তিশালী সহযোগী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড ও মহারাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ৭০ জন সদস্য নিয়ে তাঁর সংস্থা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়নে কাজ করে চলেছে।
শিশুদের সঙ্গে সানা খানের একটি ছবি
ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে সানা জানান, তিনি বেঙ্গালুরুতে একটি নতুন কেন্দ্র চালু করতে চান, যেখানে বিশেষভাবে স্কুলছুট কিশোরীদের শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে রাহাত ফাউন্ডেশন নিয়মিত সচেতনতামূলক শিবিরের আয়োজন করে। এখনও পর্যন্ত সংস্থাটি প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি এমন শিবির পরিচালনা করেছে।
নিজের কর্মজীবনের শুরু প্রসঙ্গে সানা বলেন, ২০১০ সালে সাউথ দিল্লি পলিটেকনিক থেকে মাস কমিউনিকেশন কোর্স সম্পন্ন করার পর তিনি সাহারায় কাজ শুরু করেন। তবে সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছাই ছিল তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য। সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রাহাত ফাউন্ডেশন।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় রাহাত ফাউন্ডেশনের কাজ আরও বিস্তৃত হয়। সেই সময় সংস্থাটি প্রয়োজনীয় মানুষের মধ্যে কম্বল, শুকনো রেশন কিট, ওষুধ, স্কুল ব্যাগ এবং শিক্ষা-সংক্রান্ত সামগ্রী বিতরণ করে। সানা খানের এই অবদানের স্বীকৃতি শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও মিলেছে। সম্প্রতি তিনি দুবাইয়ে একটি সম্মাননা লাভ করেছেন। এছাড়া দিল্লি ও বেঙ্গালুরুসহ বিভিন্ন শহরে নানা মঞ্চে তাঁকে সম্মানিত করা হয়েছে।
সানা খানের সামাজিক কর্মের কিছু দৃশ্য
সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে অংশ নিতে আগ্রহী সকলের প্রতি সানা খান রাহাত ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবক, সহযোগী এবং দাতাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। পাশাপাশি সংস্থার ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দিল্লির জাসোলা ভিলেজে অবস্থিত তাঁর কার্যালয় থেকে সানা খান আজও রাহাত ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম ও পরিধি বাড়িয়ে চলেছেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, শিক্ষাই মানুষের ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি এবং দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি।