রোজা সম্পর্কে ভুল ধারণা ও তার বাস্তবতা

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 16 h ago
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
 
ডা. ফিরদৌস খান

রমজান মাসে রোজা নিয়ে বহু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে—কোন কাজ করলে রোজা ভঙ্গ হয় আর কোন কাজ করলে হয় না, তা নিয়ে নানা আলোচনা হয়। অনেকেরই এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। যারা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে, তাদের ধর্মীয় বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান থাকে। কিন্তু যারা কখনও মাদ্রাসায় পড়েনি, ধর্মীয় পরিবেশ থেকে দূরে রয়েছে বা ধর্মীয় বিষয়ে আগ্রহ কম, তারাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে।

আজ আমরা এসব ভুল ধারণা নিয়ে আলোচনা করি। কোন কোন বিষয়ে রোজা ভঙ্গ হয়, সে সম্পর্কে শরিয়তে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। বিভিন্ন হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: সেহরির সময় ঘুম থেকে উঠতে না পারলে এবং সেহরি খাওয়া না হলে কি রোজা হবে?

উত্তর: রোজার জন্য সেহরি খাওয়া অপরিহার্য (লাজিম) নয়। তবে সেহরি খাওয়া সুন্নত। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—“তোমরা সেহরি খাও, কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে।”
(সহিহ বুখারি: ১৯২৩, সহিহ মুসলিম: ১০৯৫)

যদি কারও রোজা রাখার নিয়ত থাকে, কিন্তু কোনো কারণে সেহরির সময় ঘুম থেকে উঠতে না পারে এবং পরে জেগে ওঠার পরও তার নিয়ত রোজা রাখারই থাকে, তবে তার রোজা হয়ে যাবে। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, তাকে দুপুরের আগেই রোজার নিয়ত করতে হবে এবং ঘুম থেকে ওঠার পর কিছু খাওয়া-দাওয়া করা যাবে না।

প্রশ্ন: রোজা অবস্থায় ভুলবশত কিছু খেলে কি রোজা ভেঙে যাবে?

উত্তর: যদি কোনো ব্যক্তি জেনে-শুনে রোজার সময় কিছু খায়, তবে তার রোজা ভেঙে যাবে। কিন্তু যদি ভুলবশত খাওয়া হয়, তবে এতে রোজা ভাঙে না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—
“যদি কেউ ভুলবশত কিছু খায়, তবে সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে, কারণ সে যা খেয়েছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে।”(সহিহ বুখারি: ১৯৩৩)

এর থেকে বোঝা যায়, ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়া-দাওয়া করলে রোজা ভেঙে যায়, কিন্তু ভুল করে খেলে রোজা ভাঙে না।

প্রশ্ন: বমি হলে কি রোজা ভেঙে যায়?

উত্তর: বমি হওয়া মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তাই বমি হলে রোজা ভাঙে না। তবে যদি কেউ রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে আঙুল দিয়ে বমি করায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—
“যার আপনা-আপনি বমি হয়, তার রোজা কাজা করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যে ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করে, তাকে কাজা করতে হবে।”(সুনান তিরমিজি: ৭২০)

অর্থাৎ, যার অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হয়, সে রোজা চালিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু যে ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করেছে, তাকে রমজানের পরে শাওয়াল মাসে এর পরিবর্তে রোজা রাখতে হবে।

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি 

 প্রশ্ন: স্বপ্নদোষ হলে কি রোজা ভেঙে যায়?

উত্তর: এটিও মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তাই এতে রোজা ভাঙে না। তবে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু করে যার ফলে স্বপ্নদোষ ঘটে, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে।

প্রশ্ন: যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে কি রোজা ভেঙে যায়?

উত্তর: রোজা অবস্থায় যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে শুধু রোজাই ভাঙে না, বরং এর জন্য কঠিন কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) আদায় করতে হয়।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন আমরা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে বসে ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি।”

আল্লাহর রাসূল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হয়েছে?” সে বলল, “আমি রোজা রেখে আমার স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করেছি।”

রাসূল (সা.) বললেন, “তুমি কি একজন দাস মুক্ত করতে পারবে?” সে বলল, “না।”

রাসূল (সা.) বললেন, “তুমি কি একটানা দুই মাস রোজা রাখতে পারবে?” সে বলল, “না।”

রাসূল (সা.) বললেন, “তুমি কি ষাটজন দরিদ্রকে খাবার খাওয়াতে পারবে?” সে বলল, “না।”

এরপর রাসূল (সা.) কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। এমন সময় তাঁর কাছে খেজুরভর্তি একটি বড় ঝুড়ি আনা হলো।

রাসূল (সা.) বললেন, “প্রশ্নকারী কোথায়?” সে বলল, “আমি এখানে।”

রাসূল (সা.) বললেন, “এই খেজুরগুলো নিয়ে সদকা করো।”
 
লোকটি বলল, “আমি কি এগুলো আমার চেয়ে বেশি দরিদ্র কাউকে দেব? আল্লাহর কসম! মদিনার দুই পাহাড়ের মাঝখানে আমার পরিবারের চেয়ে বেশি দরিদ্র কেউ নেই।”

তখন রাসূল (সা.) হাসলেন, এমনকি তাঁর পবিত্র দাঁত দেখা গেল। এরপর বললেন, “তাহলে এগুলো দিয়ে তোমার পরিবারের পেট ভরাও।”(সহিহ বুখারি: ১৯৩৬)
 
প্রশ্ন: তেল, সুগন্ধি (আতর), সুরমা ও কাজল লাগালে অথবা নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করলে কি রোজা ভেঙে যায়?

উত্তর: তেল, সুগন্ধি, সুরমা ও কাজল ব্যবহার করলে বা নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করলে রোজা ভাঙে না। বরং এগুলোর মাধ্যমে ব্যক্তিত্বে পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাট্য আসে। রোজা অবস্থায় তেল, সুগন্ধি ও সুরমা ব্যবহার করা আল্লাহর রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নত। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত—“আল্লাহর রাসূল (সা.) রমজানে রোজা অবস্থায় চোখে সুরমা ব্যবহার করতেন।”(ইবনে মাজাহ: ১৬৭৮)

প্রশ্ন: মিসওয়াক বা টুথপেস্ট ব্যবহার করলে কি রোজা ভেঙে যায়?

উত্তর: মিসওয়াক বা টুথপেস্ট ব্যবহার করলে রোজা ভাঙে না। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন মিসওয়াকের আঁশ বা পেস্ট গলার ভিতরে চলে না যায়।

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি

প্রশ্ন: আঘাতের কারণে রক্ত বের হলে বা রক্ত পরীক্ষার জন্য রক্ত দিলে কি রোজা ভেঙে যায়?

উত্তর: না, শরীর থেকে রক্ত বের হলে রোজা ভাঙে না।

প্রশ্ন: ইনজেকশন নিলে কি রোজা ভেঙে যায়?

উত্তর: এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু আলেমের মতে ইনজেকশন নিলে রোজা ভেঙে যায়, আবার অনেকের মতে রোজা ভাঙে না। যদি কারও শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হয় এবং বাধ্য হয়ে ইনজেকশন নিতে হয়, তাহলে তার রোজা ভাঙবে না। তবে যদি এমন কোনো ওষুধ নেওয়া হয় যা সরাসরি পেট বা মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় অথবা শরীরে শক্তি জোগানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়, তাহলে তাতে রোজা ভেঙে যাবে। 

প্রশ্ন: কফ বা থুতু গিলে কি রোজা ভাঙে?

উত্তর: কফ বা থুতু গিলে রোজা ভাঙে না, কারণ এটি শরীরের বাইরে থেকে মুখে প্রবেশ করা হয়নি।

(লেখিকা একজন আলিমা এবং তিনি ‘ফাহম আল-কোরআন’ লিখেছেন।)