সংস্কৃতিকে পাঠ্যক্রমে রূপান্তর: ভারতীয় শিক্ষায় এক সভ্যতাগত বিপ্লব

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 10 h ago
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
মীর আলতাফ

ভারত কেবল একটি জাতি-রাষ্ট্র নয়, যাকে রাজনৈতিক ইতিহাস গড়ে তুলেছে; এটি এক অবিচ্ছিন্ন সভ্যতার ধারাবাহিকতা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম, দার্শনিক চিন্তা এবং শিল্প-ঐতিহ্যের সংলাপের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। বৈদিক যুগ থেকে বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনের বিপ্লব, ভক্তি আন্দোলনের সার্বজনীনতা থেকে সুফি ঐতিহ্যের আধ্যাত্মিক অন্তর্ভুক্তি, আদিবাসী জ্ঞান থেকে আধুনিক গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা— ভারতের পরিচয় কখনও একরৈখিক সমতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি; বরং বহুস্তরীয় সহাবস্থানের ভিতের ওপর নির্মিত হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে শিক্ষায় সংস্কৃতির অন্তর্ভেশ কেবল একটি একাডেমিক সংস্কার নয়, বরং একটি সভ্যতাগত প্রয়োজন।

আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা মূলত ঔপনিবেশিক ও শিল্পযুগের কাঠামোর দ্বারা প্রভাবিত, প্রায়ই সংস্কৃতিকে একটি সহায়ক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে, বোঝাপড়ার মূল কাঠামো হিসেবে নয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করলেও, তারা নিজেদের সমাজকে গঠনকারী ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে যায়। শিক্ষায় সংস্কৃতিকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিক্ষার্থীরা তাদের অতীতের গভীর বর্ণনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং নিজেদের এই অবিচ্ছিন্ন সভ্যতাগত যাত্রার অংশ হিসেবে অনুভব করতে শেখে।
 

সভ্যতাগত শিক্ষার ভিত্তি


 ভারতের প্রাথমিক শিক্ষাগত ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও নৈতিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। গুরুকুল পদ্ধতিতে বৌদ্ধিক প্রশ্নোত্তর, নৈতিক শৃঙ্খলা, শিল্প-অভিব্যক্তি এবং পরিবেশ-সচেতনতা একত্রিত করে সামগ্রিক বিকাশের ওপর জোর দেওয়া হতো। নালন্দা ও তক্ষশিলা’র মতো বৌদ্ধ মহাবিদ্যালয়গুলো এশিয়া জুড়ে বিদ্বানদের আকৃষ্ট করত, যেখানে দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র, ভাষাবিজ্ঞান ও শিল্প এক যৌথ শিক্ষাব্যবস্থার পরিবেশে সহাবস্থান করত। জৈন ঐতিহ্য অহিংসা ও যুক্তিনির্ভর বিতর্কের ভিত্তিতে কঠোর নৈতিক কাঠামো প্রদান করেছিল।

মধ্যযুগে ভক্তি ও সুফি আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত পরিসর আরও সমৃদ্ধ হয়। কবীর, মীরাবাই, গুরু নানক এবং কাশ্মীরি সাধিকা লাল্লেশ্বরীর মতো সাধকরা তাঁদের আধ্যাত্মিক দর্শন স্থানীয় ভাষায় উপস্থাপন করেছিলেন, ফলে নৈতিক চিন্তাধারা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়। বুল্লে শাহ, খাজা মইনুদ্দিন চিশতি, হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া এবং আমির খুসরোর মতো সুফি সাধকেরা প্রেম, করুণা ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের এমন ঐতিহ্য গড়ে তুলেছিলেন, যা বিভিন্ন সম্প্রদায়কে সংযুক্ত করেছিল এবং শিল্প-অভিব্যক্তিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল।

হিন্দু ও ইসলামী ঐতিহ্যের মধ্যকার সংলাপ এক বিস্ময়কর সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের জন্ম দেয়, যা আজও ভারতীয় সমাজকে সংজ্ঞায়িত করে। ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য, হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, উর্দু ও হিন্দির মতো যৌথ ভাষিক ঐতিহ্য, এবং ভক্তি ও সুফি ভাবধারায় অনুপ্রাণিত আবেগঘন আচার-অনুশীলন প্রমাণ করে যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান কোনো পার্শ্ববর্তী বিষয় ছিল না, বরং সভ্যতার বিকাশের এক কেন্দ্রীয় উপাদান ছিল।

সুফি মাজারগুলো প্রায়ই আধ্যাত্মিক ভাবনার যৌথ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। যেমন মেওয়াত অঞ্চলে, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে লল্লদাস ও শাহ চোখার মতো সাধকদের দরগাহ যৌথভাবে পরিদর্শন করতেন। ভক্তি কবিতাও ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে সার্বজনীন বিষয় উপস্থাপন করেছে। এই ধরনের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে ভারতের সাংস্কৃতিক শক্তি সবসময় সংলাপ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, বিচ্ছিন্নতা থেকে নয়।

শিখ ঐতিহ্য আধ্যাত্মিক ভক্তির সঙ্গে সমতা, সেবা ও সামাজিক ন্যায়ের নীতিকে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। খ্রিস্টান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক বিদ্যালয় শিক্ষা, সাক্ষরতা এবং সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। অন্যদিকে আদিবাসী ও স্থানীয় সম্প্রদায়গুলো পরিবেশগত জ্ঞান ও মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণ করেছে, যা টেকসই জীবনের জন্য আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই সমস্ত ঐতিহ্যের মধ্যে সংস্কৃতি নৈতিক চেতনা, শিল্পসৃজনশীলতা এবং সামষ্টিক পরিচয় গঠনের এক জীবন্ত পাঠ হিসেবে কাজ করেছে।
 

 

শ্রেণিকক্ষে সংস্কৃতিকে জীবন্ত করে তোলা


বিশ্বায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তর দিগন্ত প্রসারিত করেছে, তবে এর সঙ্গে সঙ্গে তরুণ শিক্ষার্থীদের স্থানীয় পরিচয় ও যৌথ ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। শিক্ষায় সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তি বিচ্ছিন্নতা ছাড়াই একটি দৃঢ় ভিত্তি প্রদান করে, যাতে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত হতে পারে এবং একই সঙ্গে নিজেদের সভ্যতাগত চেতনায় প্রোথিত রাখতে পারে।

ভারতে বহু অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ দেখায় যে শিক্ষায় সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তি কীভাবে শিক্ষার্থীদের রূপান্তরিত করছে। কাশ্মীরের বাডগাম জেলার গুন্ডি-খলিল গ্রামে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিজেকে এক সাংস্কৃতিক বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তর করেছে।

এখানে শিক্ষার্থীরা এখনও ঐতিহ্যবাহী তাকতি (লেখার ফলক)-তে লেখার অনুশীলন করে। শিক্ষকদের মতে, স্মার্টফোন-নির্ভর আধুনিক যুগেও এটি শিশুদের মোটর দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়ক। বিদ্যালয়টিতে একটি “সাংস্কৃতিক কোণ”ও তৈরি করা হয়েছে, যেখানে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কাঠের জুতো, পাথরের চাকি, কাংরি এবং হাতে বোনা কাশ্মীরি কার্পেট সংরক্ষিত রয়েছে।

একইভাবে, পাম্পোরের “নেচার স্কুল”, যা পরিবেশবিদ নাদিম কাদরির প্রতিষ্ঠিত, প্রাচীন জ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষার এক অনন্য সমন্বয় উপস্থাপন করে। এখানে শিশুরা টেকসই জীবনধারা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখে— পরিযায়ী পাখি পর্যবেক্ষণ করে, গাছের স্কেচ আঁকে এবং তিনটি আর (Reduce, Reuse, Recycle— কমানো, পুনঃব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন) অনুশীলন করে।

মহারাষ্ট্রের নন্দুরবার জেলায় কানাইয়ালাল রাওজিভাই পাবলিক স্কুলের ৩০০-রও বেশি শিক্ষার্থী সম্প্রতি পরিবেশবান্ধব গণপতি মূর্তি নির্মাণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছে। ঐতিহ্যবাহী মাটি ও শিল্পকলার মাধ্যমে তারা ভারতীয় কৃষি ও হস্তশিল্প ঐতিহ্যের প্রতি গভীর উপলব্ধি অর্জন করেছে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয়ে জীবন্ত শিকড়ের সেতু (জিংকিয়েং জরি) আদিবাসী খাসি ও জৈন্তিয়া সম্প্রদায়ের নির্মিত প্রাচীন জৈব-প্রকৌশলের এক বিস্ময়কর উদাহরণ।

যখন শিশুরা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সংস্কৃতি শেখে, তখন ঐতিহ্য আর জাদুঘরের নিদর্শন হয়ে থাকে না; বরং তা জীবন্ত জ্ঞানে পরিণত হয়। শিক্ষকদের সাংস্কৃতিক দূত হয়ে উঠতে হবে, যারা বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে সক্ষম। বিদ্যালয়গুলোকে শুধু পরীক্ষা-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান না রেখে সাংস্কৃতিক বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তরিত করা উচিত।

নীতি ও ভারতীয় জ্ঞান ব্যবস্থা


জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০ শিক্ষায় সংস্কৃতিকে অর্থবহভাবে অন্তর্ভুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। এই নীতিতে সমগ্রিক বিকাশ, বহুবিষয়ক শিক্ষা, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষণ এবং ভারতীয় জ্ঞান ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় জ্ঞান ব্যবস্থা দর্শন, শাস্ত্রীয় শিল্পকলার ঐতিহ্য, বৈজ্ঞানিক অবদান, ভাষাগত বৈচিত্র্য, পরিবেশগত জ্ঞান এবং নৈতিক কাঠামোকে অন্তর্ভুক্ত করে।

সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে সঙ্গীত নাটক আকাদেমির শিল্প ঐতিহ্য সিরিজ এবং সাংস্কৃতিক সম্পদ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (CCRT)-এর মাধ্যমে সারা দেশের বিদ্যালয়গুলোতে আয়োজিত কর্মশালা। সাংস্কৃতিক প্রতিভা অনুসন্ধান বৃত্তি প্রকল্পের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় নৃত্য, সংগীত, নাট্যকলা এবং ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করা হয়।

তবে কেবল নীতি প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাগত সংস্থা এবং রাজ্য ব্যবস্থার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষকদের স্থানীয় সাংস্কৃতিক জ্ঞানকে শিক্ষায় ব্যবহার করার দক্ষতা প্রদান করতে হবে।
 

সংস্কৃতি, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং জাতীয় সংহতি


শিক্ষায় সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তি ভারতকে একটি যৌথ সভ্যতাগত পরিসর হিসেবে আরও শক্তিশালী করে। যখন শিক্ষার্থীরা বোঝে যে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, ইসলামি, শিখ, খ্রিস্টান এবং আদিবাসী ঐতিহ্য পরস্পরের সঙ্গে সংলাপে যুক্ত ছিল, তখন তারা বৈচিত্র্যকে বিভাজন নয়, বরং সমৃদ্ধি হিসেবে দেখতে শেখে।

কাশ্মীরে সুফি সাধক শেখ-উল-আলম (নুন্দ রিশি)-এর প্রতি শ্রদ্ধা—প্রকৃতি সংরক্ষণ ও করুণার তাঁর বার্তা যেমন “অন্ন পোশ তেলি ইয়েলি ওয়ান পোশি”—আজও সম্প্রদায়গুলোকে অনুপ্রাণিত করে। মেওয়াতে লল্লদাস ও শাহ চোখার যৌথ দরগাহ ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বারা একসঙ্গে পরিদর্শিত হয়ে আসছে।

সাংস্কৃতিক সচেতনতার ভিত্তিতে নির্মিত শিক্ষা সহমর্মিতা বাড়ায়, পূর্বাগ্রহ কমায় এবং সমাজে সম্প্রীতি ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করে।

সংক্ষেপে, শিক্ষায় সংস্কৃতির সমন্বয় কেবল অতীতের স্মরণ নয়, বরং ভবিষ্যতের দিকে একটি সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি। এটি শ্রেণিকক্ষকে কেবল তথ্য আদান-প্রদানের স্থান থেকে এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক সংলাপের সেতুবন্ধনে রূপান্তরিত করে—যা হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই সভ্যতাকে সংজ্ঞায়িত করেছে এবং ভবিষ্যতেও পথপ্রদর্শক হবে।

(লেখক: মীর আলতাফ, কাশ্মীর-ভিত্তিক শিক্ষাবিদ, লেখক ও কবি।)