মহারাষ্ট্রের মুসলিম শিল্পীদের তুলিতে গণপতি: শিল্পের ক্যানভাসে সম্প্রীতির রং

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 17 h ago
মহারাষ্ট্রের মুসলিম শিল্পীদের তুলিতে গণপতি: শিল্পের ক্যানভাসে সম্প্রীতির রং
মহারাষ্ট্রের মুসলিম শিল্পীদের তুলিতে গণপতি: শিল্পের ক্যানভাসে সম্প্রীতির রং
 
মৃদগন্ধা দীক্ষিত

মহারাষ্ট্রে হিন্দুদের অন্যতম প্রিয় দেবতা গণেশ বা গণপতি বাপ্পা ১৪ বিদ্যা (বিজ্ঞান) ও ৬৪ কলার অধিপতি হিসেবে পূজিত। বুদ্ধি ও শিল্পকলার দেবতা হিসেবে তাঁর প্রতি শিল্পীদের আকর্ষণ বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হিন্দু শিল্পীদের পাশাপাশি বহু মুসলিম চিত্রশিল্পী ও ভাস্করও গণেশের মোহময় ও জীবন্ত অবয়বকে তাঁদের শিল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন, কখনও ক্যানভাসে, কখনও মাটিতে, আবার কখনও পাথরের ভাস্কর্যে। এখানে এমন কয়েকজন সুপরিচিত মুসলিম শিল্পীর কথা তুলে ধরা হল, যাঁরা নিজেদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে গণেশকে অন্বেষণ করেছেন।

মাস্টার আবালাল রহমান
 
মহারাষ্ট্রের চিত্রকলার ইতিহাসে মাস্টার আবালাল রহমানের নাম উল্লেখ না করলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কোলহাপুরের সন্তান এবং রাজর্ষি শাহু মহারাজের রাজদরবারের চিত্রশিল্পী আবালাল রহমান, যাঁর আসল নাম ছিল আবদুল আজিজ রহমান, ছিলেন একজন অসাধারণ শিল্পী, যিনি শিল্পকে ধর্মের সীমানার বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন।
 
একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া আবালাল তাঁর বাবার কাছ থেকেই শিল্পকলার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর বাবা কোরআনের পাণ্ডুলিপি অলংকরণ করতেন। জে. জে. স্কুল অব আর্ট থেকে শিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর আবালাল কোলহাপুরে ফিরে আসেন এবং শাহু মহারাজের রাজদরবারে যোগ দেন।
 
 
তাঁর একটি চিত্রে গণেশকে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখা যায়। সম্ভবত তাঁর রাজপৃষ্ঠপোষকের জন্যই আঁকা এই ছবিতে বাপ্পাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন তিনি রাজদরবারে সিংহাসনে বসে প্রজাদের কথা শুনছেন।
 
এই চিত্রটি শুধু আবালালের শিল্পীসত্তার প্রতিভারই প্রমাণ নয়, শাহু মহারাজের শাসনকালে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক পরিবেশেরও প্রতিফলন। একজন মুসলিম শিল্পীর একজন হিন্দু শাসকের জন্য হিন্দু দেবতার ছবি আঁকা সেই সময়ের অভিন্ন শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই প্রতিচ্ছবি। ছবিটি কোলহাপুরের সমন্বয়বাদী সংস্কৃতির একটি দৃশ্যমান দলিল হিসেবেও দাঁড়িয়ে রয়েছে।
 
এম. এফ. হুসাইনের গণেশ
 
ভারতীয় সংস্কৃতি ও পুরাণকে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান শিল্পী মকবুল ফিদা হুসাইনের মতো এত গভীরভাবে খুব কম ভারতীয় চিত্রশিল্পীই অধ্যয়ন ও ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি হিন্দু পুরাণের অসংখ্য দেবদেবীকে তাঁর শিল্পে তুলে ধরেছেন এবং ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় চিত্ররীতির সঙ্গে কিউবিজম ও লোকশিল্পের বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
 
হুসাইনের শিল্পকর্মে বারবার ফিরে এসেছে গণেশ। মোটা ও দৃঢ় রেখা, খেলাচ্ছলে তৈরি অবয়ব এবং গাঢ় রঙের ব্যবহারে তিনি দেবতার আকর্ষণীয় উপস্থাপনা তৈরি করেছেন। গণেশের সঙ্গে প্রায়ই সূর্য, চাঁদ ও বীণার মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতীকও দেখা যায়।
 
 
তাঁর অসংখ্য গণেশের ছবিতে বাপ্পাকে বিভিন্ন রূপে দেখা যায়, কখনও নৃত্যরত, কখনও বসে থাকা অবস্থায়, কখনও বাদ্যযন্ত্র বাজাতে, আবার কখনও দেবী পার্বতীর কোলে বিশ্রামরত অবস্থায়। গণেশের কপালে একটি স্বতন্ত্র খিলানাকৃতি রেখা এবং উজ্জ্বল ও শক্তিশালী রঙের ব্যবহার তাঁর বহু শিল্পকর্মেই বারবার ফিরে এসেছে।
 
এস. এইচ. রাজার আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি
 
সৈয়দ হায়দার রাজা, যিনি এস. এইচ. রাজা নামেই বেশি পরিচিত, বিমূর্ততা, আধ্যাত্মিকতা এবং ‘বিন্দু’র প্রতীকী ভাবনার মাধ্যমে শিল্পকে দেখেছেন। তাঁর শিল্পকর্ম প্রচলিত ধর্মীয় অবয়বের উপস্থাপনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। তবে তাঁর চিত্রকলায় ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব ছিল।
 
রং ও জ্যামিতিক আকারের মাধ্যমে রাজা শিব, শক্তি ও গণেশের সঙ্গে সম্পর্কিত ধারণাগুলি অন্বেষণ করেছেন। তাঁর শিল্পরীতি এই ঐতিহ্যগুলির সঙ্গে যুক্ত আধ্যাত্মিক শক্তি ও নিরাকার সত্তাকে তুলে ধরেছে; প্রচলিত অবয়বের মাধ্যমে সেগুলিকে উপস্থাপন করেনি।
 
 
ফারুক নাদাফ: শিল্পের মাধ্যমে সংস্কৃতি সংরক্ষণ
 
মহারাষ্ট্রের শিল্পজগতে সমসাময়িক সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য নাম ফারুক নাদাফ। সাংলির কলাবিশ্ব মহাবিদ্যালয় থেকে শিল্পকলায় শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি জলরং, তেলরং এবং অ্যাক্রিলিক চিত্রকলায় দক্ষতা অর্জন করেন।
 
তাঁর নৃত্যরত গণেশের ছবি, ঐতিহাসিক দৃশ্য এবং গ্রামীণ মহারাষ্ট্রের প্রাণবন্ত চিত্র শিল্পপ্রেমীদের আকৃষ্ট করেছে। নাদাফ মারাঠি ভাষার পাঠ্যবই প্রকাশকারী বালভারতীর জন্য বিভিন্ন চিত্র এবং আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ তৈরি করার গুরুত্বপূর্ণ কাজও করেছেন।
 
বম্বে আর্ট সোসাইটি এবং ক্যামলিন আর্ট ফাউন্ডেশন থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত নাদাফের শিল্পকর্মে মহারাষ্ট্রের সমন্বিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর ছবিগুলি দেখায়, কীভাবে শিল্পের প্রকাশ ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করতে পারে।
 
 
তাঁর একটি গণেশের ছবির কথাই ধরা যাক। সেখানে বাপ্পার চোখ নত, শান্ত ও ক্ষমাশীল। পাশে থাকা ইঁদুরটির মুখেও রয়েছে আকর্ষণীয়, প্রায় হাসিমুখের অভিব্যক্তি। ছবিতে জাঁকজমক বা অহংকারের কোনও চিহ্ন নেই। বরং পুরো চিত্রটি শান্তি, ভক্তি এবং সম্পূর্ণ আত্মনিবেদনের অনুভূতি প্রকাশ করে।
 
মুঘল, দাক্ষিণাত্যের মিনিয়েচার এবং বাংলার পটুয়া ঐতিহ্য
 
মুসলিম শিল্পীদের হিন্দু দেবদেবীর চিত্রায়ণের ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক শিকড় মুঘল ও দাক্ষিণাত্যের রাজদরবার পর্যন্ত বিস্তৃত। সম্রাট আকবরের শাসনকালে মহাভারত ফারসি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল ‘রজমনামা’ নামে। এই অলংকৃত পাণ্ডুলিপিতে মহাকাব্যের বিভিন্ন দৃশ্যের মিনিয়েচার চিত্র রয়েছে, যার মধ্যে গণেশের উপস্থাপনাও দেখা যায়। মজার বিষয় হল, এই শিল্পকর্মগুলির কয়েকটিতে গণেশকে ফারসি ধাঁচের জামা পরিহিত অবস্থায় দেখানো হয়েছে। যে সাংস্কৃতিক পরিবেশে ছবিগুলি তৈরি হয়েছিল, তারই প্রতিফলন পাওয়া যায় এই উপস্থাপনায়।
 
বাংলার পটচিত্রেও একই ধরনের ঐতিহ্য দেখা যায়। পটচিত্র এই অঞ্চলের প্রাচীনতম লোকশিল্পের অন্যতম। এই চিত্রগুলি তৈরি করেন এবং এগুলির সঙ্গে যুক্ত গান পরিবেশন করেন এমন বহু শিল্পী মুসলিম পটুয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। রঞ্জিত চিত্রকরের মতো শিল্পীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন কাহিনি ও চরিত্র, গণেশ, দেবী দুর্গা এবং রামায়ণের বিভিন্ন পর্ব, তাঁদের শিল্পে তুলে ধরেছেন।
 
 
সমসাময়িক শিল্পীরা
 
এই ঐতিহ্য আজও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের সমসাময়িক মুসলিম শিল্পীদের মধ্যে অব্যাহত রয়েছে।ছত্তীসগড়ের রায়পুরে শাদাব নামে এক তরুণ শিল্পী প্রায় ১৫ বছর ধরে গণেশের মূর্তি তৈরি করছেন। শুধু চলতি বছরেই তিনি ২৫০টিরও বেশি বিভিন্ন ধরনের মূর্তি তৈরি করেছেন। তাঁর কথায়, “ধর্ম যা-ই হোক না কেন, অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
 
উদয়পুরে সূক্ষ্ম কাচ খোদাইয়ের জন্য পরিচিত ওয়াকার হুসাইন কাচের ওপর গণেশের বেশ কয়েকটি বিস্তারিত ও আকর্ষণীয় অবয়ব তৈরি করেছেন। এই বৈচিত্র্যময় শিল্পকর্মগুলির মধ্যে একটি বিষয় প্রায়ই বিশেষভাবে নজরে পড়ে, গণেশকে কখনও উগ্র বা ক্রুদ্ধ দেবতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং তাঁকে শান্ত, মঙ্গলময় ও কল্যাণময় এক অবয়ব, ‘মঙ্গলমূর্তি’ হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।