অনিকা মাহেশ্বরী / নয়া দিল্লি
২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ পুলওয়ামা হামলার স্মৃতি আজও দেশের মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। হামলার পর নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নথিতে উপত্যকার পাঁচটি গ্রাম, ললহার (কাকাপোরা), করিমাবাদ, গুলজারপোরা-অবন্তীপুরা এবং দরবগাম, ‘ব্ল্যাক ভিলেজ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। এই গ্রামগুলিতে রিয়াজ আহমেদ, সমীর টাইগার এবং আয়ুব ললহারির মতো দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের আধিপত্য ছিল।
সন্ত্রাসের এমন পরিস্থিতি ছিল যে, সাধারণ নাগরিকরা নিজেদের মুখে ‘ভারত’ নামটিও উচ্চারণ করতে পারতেন না। জঙ্গিরা প্রকাশ্য ফরমান জারি করে রেখেছিল: “যে গ্রামবাসীই পুলিশ বা প্রশাসনের কাছে যাবে, তাকে আমাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তার শাস্তি হবে একমাত্র মৃত্যু।”
মুদাস্সির আহমেদ দার
এই ফরমানের ভয়ে মানুষ নিজেদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ও সমস্যার জন্যও সরকারি দফতরের দরজায় যেতে ভয় পেতেন। শীতকালে তুষারপাতের কারণে যখন গোটা এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, তখন শিশুদের টিউশন বন্ধ হয়ে যেত এবং তারা পড়াশোনা ছেড়ে দিত। বুরহান ওয়ানি নিহত হওয়ার পর যে অশান্তি ছড়িয়ে পড়েছিল, তার সুযোগ নিয়ে জঙ্গি রিয়াজ আহমেদ যুবকদের উগ্রবাদের জালে ঠেলে দিচ্ছিল। কিন্তু সবচেয়ে ঘন অন্ধকারের মধ্যেই প্রায়শই আলোর প্রথম রশ্মি ফুটে ওঠে। এই গল্পে সেই আলোর রশ্মি হয়ে উঠেছিলেন ৩১ বছর বয়সী এমবিএ স্নাতক মুদাস্সির আহমেদ দার।
অপমান থেকেই পরিবর্তনের সংকল্প
মুদাস্সির নিজেও সন্ত্রাসবাদের প্রত্যক্ষ শিকার ছিলেন। পুলওয়ামা হামলার পর কোনও কাজে দিল্লিতে গেলে একটি হোটেল তাঁকে শুধুমাত্র এই কারণে ঘর দিতে অস্বীকার করেছিল যে, তাঁর পরিচয়পত্রে ‘পুলওয়ামা’ লেখা ছিল। সেই দিন যে অপমান তাঁকে সহ্য করতে হয়েছিল, তা তাঁর মনে কোনও ঘৃণার জন্ম দেয়নি; বরং নিজের মাতৃভূমিকে বদলে দেওয়ার এক অটুট সংকল্পের জন্ম দিয়েছিল।
কাশ্মীরে ফিরে মুদাস্সির ইতিবাচক চিন্তাভাবনার অধিকারী যুবকদের নিজের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং এই পাঁচটি ‘ব্ল্যাক ভিলেজ’-এ কাজ শুরু করেন। তিনি শিক্ষাকেই নিজের প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে বেছে নেন।
শীতের মাসগুলিতে যখন ছান্দাজি, কেতসন এবং রেশওয়ারির মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলি গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত, তখন মুদাস্সির ও তাঁর দল স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে তিনটি ‘উইন্টার কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার’ চালু করেন। পিজি এবং স্নাতক যুবকদের সাহায্যে ৩০০ থেকে ৪০০ শিশুকে বিনামূল্যে পড়ানো হয়। তাঁরা ‘সানডে ফর সোসাইটি’ অভিযানও শুরু করেন। এই উদ্যোগে বেসরকারি অ্যাকাডেমির শিক্ষকরা প্রতি রবিবার শিশুদের ব্যক্তিত্ব বিকাশ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং নেতৃত্বের দক্ষতা শেখাতে আসতেন। এর পাশাপাশি ৫৪০-এরও বেশি দরিদ্র ও জনজাতীয় শিশুর মধ্যে বিনামূল্যে লেখাপড়ার সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
মুদাস্সির আহমেদ দার একটি রেলিতে
হুমকি ও বন্দুকের ছায়ায় সংলাপ
পরিবর্তনের এই পথ সহজ ছিল না। শুরুতেই জঙ্গিরা মুদাস্সিরকে ‘ভারতের এজেন্ট’ এবং ‘মুখবির’ বলে অভিহিত করে তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। ২০২০ সালে তিনি যখন ললহারপুরায় একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করেন, তখন এক জঙ্গি তাঁর হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল।
কিন্তু মুদাস্সির দমে যাননি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এমন ১৭ জন বিপথগামী যুবকের কাউন্সেলিং করেছিলেন, যারা উগ্রবাদের পথে পা বাড়িয়ে দিয়েছিল। মুদাস্সির জানান, যে ছেলেটি একসময় তাঁকে ‘মুখবির’ বলে হুমকি দিত, ধারাবাহিক সংলাপ এবং কোরআনের এই পবিত্র বার্তা, “একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণ বাঁচানো গোটা মানবজাতিকে বাঁচানোর মতো”, শোনার পর তার হৃদয় থেকে ঘৃণা গলে যায়। সেই ছেলেটিই পরে তাঁকে ‘ভাইয়া’ বলে ডাকতে শুরু করে এবং হিংসার পথ ছেড়ে মূলধারায় ফিরে আসে।
যেখানে উঠত দেশবিরোধী স্লোগান, সেখানে উড়ল তেরঙ্গা
ললহারপুরার সেই মাঠ, যেখানে একসময় নিহত জঙ্গিদের জানাজায় পাথর ছোড়া মানুষের ভিড় জমত, পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানো হতো এবং ভারতবিরোধী স্লোগান ধ্বনিত হতো, আজ মুদাস্সিরের ভগীরথ প্রচেষ্টায় একটি প্রাণবন্ত ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পরিণত হয়েছে। আজ সেখানে গর্বের সঙ্গে উড়ছে ‘তেরঙ্গা’।
কাছেই অবস্থিত ‘শহিদদের কবরস্থান’-এ ১৯৯০-এর দশকের এক বড় জঙ্গির কবরের ওপর আজ মোমবাতি জ্বালানোর মতো কেউও অবশিষ্ট নেই। স্টেডিয়ামে ম্যাচের উদ্বোধন করতে যখন পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনের আধিকারিকরা এসেছিলেন, তখন যে হাতগুলিতে একসময় পাথর থাকত, সেই হাতেই আধিকারিকদের ওপর ফুলের বৃষ্টি হয়েছিল।
মানবাধিকার নিয়ে মিথ্যা রিপোর্টের জবাব
মুদাস্সিরের কাজের পরিধি শুধু মাঠ ও বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি কাশ্মীরের ৬টি জেলায় ২০৫টিরও বেশি দরিদ্র পরিবারকে ঈদের ফুড কিট পৌঁছে দিয়েছেন, দরিদ্র মেয়েদের বিয়ের খরচ বহন করেছেন, মেডিক্যাল ও নার্সিং পড়ুয়াদের ফি দিয়েছেন এবং গুরেজের মহিলা উদ্যোক্তাদের পণ্যকে ডিজিটাল পরিচিতি দিয়েছেন।
শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে বদনাম করার ষড়যন্ত্রেরও তিনি যুক্তিসঙ্গত জবাব দিয়েছেন। তথাকথিত মানবাধিকার কর্মী খুররম পারভেজ রাষ্ট্রসংঘে যে পক্ষপাতদুষ্ট রিপোর্ট পেশ করেছিলেন, যার ভিত্তিতে ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানানো হয়েছিল এবং দাবি করা হয়েছিল যে ‘অজ্ঞাত কবর’-গুলিতে সাধারণ কাশ্মীরি নাগরিকদের সমাহিত করা হয়েছে, মুদাস্সির তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। মুদাস্সিরের দল ৬ বছর ধরে গভীর গবেষণা করে একটি তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট প্রকাশ করে এবং দাবি করে যে, ওই কবরগুলিতে স্থানীয় নাগরিক নয়, বরং সীমান্ত পেরিয়ে আসা অনুপ্রবেশকারী জঙ্গিদের সমাহিত করা হয়েছিল।
পুলওয়ামার সেই ভয়াবহ হামলার পরবর্তীকালীন দৃশ্য
সামাজিক সম্প্রীতির ভিত শক্তিশালী করতে তিনি পুলওয়ামা স্টেডিয়ামে একটি ঐতিহাসিক আন্তঃধর্মীয় সংলাপ (Interfaith Dialogue) আয়োজন করেন। সেখানে চারটি ধর্মের প্রায় ১৪,০০০ মানুষ একটি মঞ্চে একত্রিত হয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের মাননীয় উপরাজ্যপাল (LG) শ্রী মনোজ সিনহাও।
এক নতুন পুলওয়ামা, এক নতুন সকাল
পাঁচ বছরের নিরলস পরিশ্রমের ফল আজ সবার সামনে। একসময়কার এই ‘ব্ল্যাক ভিলেজ’-গুলিতে আজ কোনও সক্রিয় জঙ্গি অবশিষ্ট নেই এবং এলাকাগুলিও আর জঙ্গি নিয়োগের ঘাঁটি নয়। যেখানে একসময় বারুদের গন্ধ পাওয়া যেত, সেখানে এখন একটি অত্যাধুনিক ‘মেডিসিটি’ গড়ে উঠছে এবং উন্নয়নমূলক কাজ চলছে বুলেট ট্রেনের গতিতে।
গ্রামের শিশু ও প্রবীণরা এখন তাঁকে ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে ‘মুদাস্সির ভাইয়া’ বলে ডাকেন। তাঁর এই রাষ্ট্রসেবার জন্য তাঁকে জাতীয় রাষ্ট্রপতি পুরস্কার (২০১২), ১৫তম ভারতরত্ন ড. বি. আর. আম্বেদকর পুরস্কার (২০২৫), আন্তর্জাতিক বুদ্ধ শান্তি পুরস্কার (২০২৫) এবং একাধিক ‘ইয়ুথ আইকন অ্যাওয়ার্ড’-এ সম্মানিত করা হয়েছে।
মুদাস্সির আহমেদ দারের এই জীবনগাথা এই কথার জীবন্ত প্রমাণ যে, সন্ত্রাসবাদ ও ঘৃণাকে গুলির শব্দে নয়, বরং মানবিকতা, শিক্ষা, অটুট সাহস এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রদীপ জ্বালিয়েই চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব।