এক রাতেই ভেঙে গেল মোহনবাগান! ১৯৬৮-এর সেই দলবদল, যা কাঁপিয়ে দিয়েছিল কলকাতা ময়দান

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
এক রাতেই ভেঙে গেল মোহনবাগান! ১৯৬৮-এর সেই দলবদল, যা কাঁপিয়ে দিয়েছিল কলকাতা ময়দান
এক রাতেই ভেঙে গেল মোহনবাগান! ১৯৬৮-এর সেই দলবদল, যা কাঁপিয়ে দিয়েছিল কলকাতা ময়দান
 
শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী

ষাট-সত্তরের দশকের কলকাতা ময়দানে দলবদল মানেই ছিল উত্তেজনা, রোমাঞ্চ আর শেষ মুহূর্তের নাটক। আজকের মতো কোটি কোটি টাকার চুক্তি তখন ছিল না। একজন ফুটবলারকে দলে টানার ক্ষেত্রে চাকরির নিশ্চয়তা, সম্মান এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তাই অনেক সময় হয়ে উঠত সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
 
এই ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ১৯৬৮ সালের শেষ রাত এবং তার পরের ১৯৬৯ মরশুম। ময়দানে ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে ‘দ্য গ্রেট এক্সোডাস অব ১৯৬৯’ নামে স্মরণ করা হয়।
 
খেলায়রত জার্নেল সিংও অশোক চ্যাটার্জি
 
১৯৬২–১৯৬৫: মোহনবাগানের স্বর্ণযুগ
 
গল্পের শুরুটা একটু পিছনে ফিরতে হয়।১৯৬২ সাল থেকে কলকাতা ময়দানে মোহনবাগানের দাপট ক্রমশ বেড়ে ওঠে। দলের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন অধিনায়ক চুনি গোস্বামী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জার্নেল সিং, অশোক চ্যাটার্জি, প্রণব গাঙ্গুলী ও সুকল্যাণ ঘোষ দস্তিদারের মতো তারকারা। 
 
১৯৬২ থেকে ১৯৬৫, এই সময়ের সাফল্য মোহনবাগানকে ময়দানের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত করে। লিগ, ডুরান্ড ও আইএফএ শিল্ডের মতো বড় প্রতিযোগিতায় সাফল্য আসে। সমর্থকদের কাছে তখন মনে হচ্ছিল, এই দলকে সহজে ভাঙা সম্ভব নয়। কিন্তু সাফল্যের মাঝেই তৈরি হচ্ছিল অন্য একটি সমস্যা।১৯৬৮: সাফল্যের আড়ালে অস্বস্তি।
 
১৯৬৮ সালে মোহনবাগান দলে তখনও একাধিক তারকা ফুটবলার। কিন্তু ক্লাব কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়দের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল বলে সেই সময়ের স্মৃতিচারণে উঠে আসে। আরও বড় সমস্যা ছিল ফুটবলারদের আর্থিক ও পেশাগত ভবিষ্যৎ।
 
তখন দল ধরে রাখার জন্য মোহনবাগানের হাতে সীমিত আর্থিক সামর্থ্য ছিল। সম্মান ও ক্লাবের ঐতিহ্য থাকলেও অনেক ফুটবলারের জন্য স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা ছিল না। এই জায়গাতেই এগিয়ে আসে ইস্টবেঙ্গল।চাকরির সুযোগ তৈরি করে তারকা ফুটবলারদের নিজেদের দলে আনার পরিকল্পনা শুরু হয়।
 
ফুটবলার প্রণব গাঙ্গুলী
 
২৪ ডিসেম্বর ১৯৬৮: সেই মধ্যরাত
 
এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক রাত।২৪ ডিসেম্বর ১৯৬৮।গভীর রাতে একটি সাদা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ইস্টবেঙ্গল কর্তা জ্যোতিষ গুহ ও নিশীথ ঘোষ। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মোহনবাগানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারকে সই করানো। প্রথমে তাঁরা পৌঁছন ভবানীপুরে জার্নেল সিংয়ের বাড়িতে।
 
জার্নেল ছিলেন মোহনবাগানের দীর্ঘদিনের তারকা এবং ভারতের অন্যতম পরিচিত ডিফেন্ডার। আলোচনার পর গভীর রাতেই তিনি ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে সই করেন। এরপর গাড়ি ছুটল হাওড়ার দিকে। রাত ৩টে: অশোক চ্যাটার্জির সই। পরবর্তী গন্তব্য অশোক চ্যাটার্জির বাড়ি। মোহনবাগানের অন্যতম প্রধান স্ট্রাইকার অশোকের জন্য রেলে চাকরির প্রস্তাব ছিল বলে স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে। পরিবারের সঙ্গে আলোচনার পর রাতেই ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে সই করেন তিনি।
 
কিন্তু অভিযান তখনও শেষ হয়নি।একই রাতে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত হন প্রণব গাঙ্গুলী ও সুকল্যাণ ঘোষ দস্তিদারও। পরিস্থিতি এতটাই পরিকল্পিত ছিল যে সুকল্যাণ সেই রাতে প্রণবের বাড়িতেই ছিলেন বলে জানা যায়।
 
২৫ ডিসেম্বর সকাল: মোহনবাগান তাবুতে বিস্ময়
 
পরদিন, ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৮।সকালে মোহনবাগান তাবুতে খবর পৌঁছল, এক রাতেই দলের চার গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার আর নেই! ময়দানে ছড়িয়ে পড়ল চাঞ্চল্য। সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হল। সংবাদপত্রেও ঘটনাটি বড় খবর হয়ে উঠল। অনেকের মনে তখন একটাই প্রশ্ন, তারকা ফুটবলারদের হারিয়ে মোহনবাগান কি এবার ভেঙে পড়বে?
 
১৯৬৯: নতুন করে শুরু মোহনবাগানের
 
১৯৬৯ মরশুমে সেই প্রশ্নই ছিল মোহনবাগানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।চার গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারকে হারানোর পর ক্লাবকে নতুন করে দল গড়তে হয়। আর সেই প্রয়োজন থেকেই সামনে আসতে শুরু করে একঝাঁক তরুণ ফুটবলার। মোহনবাগানের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে এই নতুন প্রজন্মই পরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
 
ফুটবলার সুকল্যাণ ঘোষ দোস্তিদার 
 
১৯৭০: ইস্টবেঙ্গলের ঐতিহাসিক সাফল্য
 
অন্যদিকে, অশোক চ্যাটার্জি ও প্রণব গাঙ্গুলীদের নিয়ে গড়া ইস্টবেঙ্গল দল পায় বড় সাফল্য। ১৯৭০ সালে ইরানের পাস ক্লাবকে হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জেতে ইস্টবেঙ্গল। ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে সেই জয় আজও স্মরণীয়। অর্থাৎ, ১৯৬৮-এর সেই রাতের দলবদলের মাত্র দু’বছরের মধ্যে তার প্রভাব ময়দানের প্রতিযোগিতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
 
এরপর: নতুন মোহনবাগানের উত্থান
 
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। যে মোহনবাগানকে অনেকে সেই সময় শেষ হয়ে গিয়েছে বলে মনে করেছিলেন, সেই ক্লাবই পরবর্তী সময়ে নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সুব্রত ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, বিদেশ বসুদের মতো ফুটবলাররা পরবর্তী সময়ে মোহনবাগানের নতুন ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
 
একটি রাত, বদলে যাওয়া দুই ক্লাবের গল্প
 
তাই ১৯৬৮ সালের ২৪ ডিসেম্বরের সেই রাত শুধু কয়েকজন ফুটবলারের দলবদলের ঘটনা ছিল না। তার আগে ছিল মোহনবাগানের দীর্ঘ সাফল্য।তারপর এল ক্লাবের অন্দরের অস্বস্তি। এরপর এক মধ্যরাতের অভিযান। ২৫ ডিসেম্বর সকালে প্রকাশ পেল বড়সড় ভাঙন। ১৯৬৯-এ শুরু হল নতুন করে দল গড়ার অধ্যায়। আর ১৯৭০-এ ইস্টবেঙ্গল পেল ঐতিহাসিক শিল্ড জয়।
 
আজকের কোটি টাকার ফুটবল-বাজারের যুগে দাঁড়িয়ে সেই সময়ের কথা ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে। তখন দলবদলের গল্প লিখতে কোটি টাকার প্রয়োজন ছিল না, প্রয়োজন ছিল একটি চাকরির প্রতিশ্রুতি, একটি সাদা অ্যাম্বাসাডর এবং গভীর রাতে কয়েকটি সই। আর সেই কয়েকটি সই-ই বদলে দিয়েছিল কলকাতা ময়দানের ফুটবল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।