মালদহ:
বন্যা মানুষের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু মানবিকতার বন্ধনকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। মালদহ জেলার ভূতনিতে ভয়াবহ বন্যার পরিস্থিতিতে যখন হাজার হাজার মানুষ জলবন্দি, তখন ধর্ম-বর্ণের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ছবিই হয়ে উঠছে বাংলার সামাজিক সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
ভূতনির বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে জামাআতে ইসলামী হিন্দের পক্ষ থেকে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করেছে। খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই প্রচেষ্টাকে শুধুমাত্র একটি ত্রাণ কর্মসূচি হিসেবে না দেখে দুর্যোগের সময়ে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধের প্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়।
বর্তমানে ভূতনির বিস্তীর্ণ এলাকা গঙ্গার জলে প্লাবিত। যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে, বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনও দুর্গতদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কাজে যুক্ত রয়েছে। নৌকায় করে স্বাস্থ্যকর্মীদের জলমগ্ন এলাকায় পৌঁছে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জামাআতে ইসলামী হিন্দ, পশ্চিমবঙ্গের সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের প্রসঙ্গও উল্লেখযোগ্য। সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ‘খিদমাতে খালক’ বা সৃষ্টির সেবা তাদের সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম ক্ষেত্র। বন্যা, খরা কিংবা অন্যান্য বিপর্যয়ের সময়ে দ্রুত ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাদের দুর্যোগ মোকাবিলা সংক্রান্ত উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কর্মসূচির কথা সংগঠনটি জানিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের সংগঠনটির ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে সামাজিক ন্যায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নের বিষয় রয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে জাতি ও ধর্ম নির্বিশেষে দাঁড়ানো তাদের সমাজ উন্নয়নমূলক কাজের অংশ।
এই ধরনের উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিপদের মুহূর্তে মানুষের পরিচয় প্রথমে ‘দুর্গত মানুষ’, তার পরে অন্য কোনও পরিচয়। একজনের হাতে যখন অন্যজনের জন্য খাবারের প্যাকেট পৌঁছে যায়, তখন ধর্মীয় বিভাজনের জায়গা অনেকটাই ছোট হয়ে আসে।
ভূতনির বন্যা তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের গল্প নয়; এটি বাংলার সামাজিক জীবনে সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির শক্তিরও একটি বাস্তব ছবি। প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ—সবাই যদি একই মানবিক চেতনায় একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তবে দুর্যোগের ক্ষত কিছুটা হলেও দ্রুত সারিয়ে তোলা সম্ভব।
বন্যার জল একদিন নেমে যাবে। কিন্তু সেই কঠিন সময়ে কে কার পাশে দাঁড়িয়েছিল—সেই স্মৃতিই হয়তো থেকে যাবে বাংলার মানুষের মনে, সম্প্রীতির এক নীরব দলিল হয়ে।