মণ্ডপের ভিতর আস্ত ধানখেত! যেন এক টুকরো গ্রামবাংলা, মাটির হাঁড়ি আর বেতের কুলোয় চমক দিচ্ছে মালদহের এই পুজো
Story by Tarun Nandi | Posted by Aparna Das • 19 h ago
মণ্ডপের ভিতর আস্ত ধানখেত! যেন এক টুকরো গ্রামবাংলা, মাটির হাঁড়ি আর বেতের কুলোয় চমক দিচ্ছে মালদহের এই পুজো
তরুণ নন্দী / কলকাতা
পুজো মণ্ডপের ভিতর ধানখেত! বাংলার সংস্কৃতি আর সবুজ ধানগাছের মেলবন্ধনে এবার দুর্গাপুজোর মণ্ডপ সেজে উঠছে মালদহের চাঁচলে। মণ্ডপের ভিতরে ঢুকলেই অবাক হয়ে যেতে হবে। ঢুকেই চোখে পড়বে সবুজ ধানের চারাগুলো। চারদিকে শিল্পের ছোঁয়ায় সাজানো কৃষিকাজের নানা উপকরণ। কোথাও ধানভর্তি বস্তা, কোথাও মাটির হাঁড়ি, বেতের কুলো আর টুপি। সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোয় এই পুজোমণ্ডপে দেখা যাবে বাংলার কোনও এক শস্যশ্যামলা গ্রামের ছবিটিকে।
মালদহের চাঁচল সদরের মৈত্রী সংসদের এবারের পুজোর থিম গ্রামবাংলার কৃষি আবাদ। বেশ কিছুদিন আগে রোপন করা ধানের চারাগাছগুলিতে সবুজ রং ধারণ করতেই পুজোমণ্ডপের সৌন্দর্য আরও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। চাঁচল-আশাপুর রাজ্য সড়কের পাশে সুইমিং পুল এলাকা থেকে মণ্ডপের দিকে তাকালে মনে হবে, যেন ধানভর্তি কোনও বিশাল গোলা দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথম দর্শনেই গ্রামবাংলাকে নিয়ে এই অভিনব ভাবনা দর্শনার্থীদের কৌতূহল কতটা বাড়িয়ে দেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বলা ভালো, ধানের চারা, মাটির ছোঁয়ায় পুজোমণ্ডপটা যেন আস্ত একখণ্ড গ্রামবাংলা হয়ে উঠেছে।
মণ্ডপে ঢোকার প্রবেশপথ নির্মাণ হয়েছে ধানভর্তি চটের বস্তা দিয়ে। এই প্রবেশপথ পেরিয়ে একটু ভিতরে ঢুকলেই চোখের সামনে শুধুই ধানখেত। ধানের চারাগাছ যেন তৈরি করে ফেলেছে এক গ্রামীণ আবহ। যা এই পুজোমন্ডপে প্রবেশ করলেই দর্শনার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেবে বাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে। শুধু ধানগাছেই থেমে নেই এই পুজোর থিম ভাবনা। মণ্ডপের সিলিং থেকে ঝুলছে অসংখ্য মাটির হাঁড়ি, বেতের কুলো এবং টুপি। মণ্ডপের দেওয়াল জুড়ে সাজানো হয়েছে কৃষিকাজে ব্যবহৃত নানা সরঞ্জামের পর্ব। প্রতিটি উপকরণই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে বাংলার কৃষিসংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার কথা।
এবার ৪৬ বছরে পা দিয়েছে মৈত্রী সংসদের পুজো। প্রতি বছর কোন না কোন নতুন ভাবনা দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। গত বছর সবুজায়নের বার্তা তুলে ধরে এলাকায় সাড়া ফেলেছিল এই পুজো কমিটি। আর এবার পরিবেশ ও মাটির কথাকে প্রকাশ করতে বেছে নেওয়া হয়েছে বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল ধানকে।
কেন এই থিম গুরুত্বপূর্ণ? উত্তরে পুজোকমিটি থেকে জানানো হল, ধান বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। কৃষকের ঘাম, পরিশ্রম আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে যখন পূর্ণতা পায় তখনই বাংলার শস্যসম্ভারের ছবিটা প্রকট হয়ে ওঠে। সেই কৃষিজীবনের বাস্তবতাকেই পুজোর মণ্ডপে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে মৈত্রী সংসদ।
আসলে পুজোর থিমে কৃষির গুরুত্বকে মানুষের সামনে তুলে ধরার এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় অনেক সময় গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়। অথচ এই কৃষিকাজ থেকেই গ্রামবাংলার সিংহভাগ মানুষের জীবিকা চলে। যা বাংলার মানুষের খাদ্যভাণ্ডারের অন্যতম ভিত্তি।
মণ্ডপ নির্মাণের কাজে কারিগর
মণ্ডপের ধানগাছ, চটের বস্তা, মাটির হাঁড়ি কিংবা বেতের কুলো, প্রতিটি উপকরণ গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, কৃষকের জীবন এবং মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের দিকগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে তুলে ধরেছে। থিমপুজোর ভিড়ে সবুজ ধানের চারাগাছের সঙ্গে গ্রামীণ উপকরণের মেলবন্ধনে চাঁচলের মৈত্রী সংসদ যে এক অন্যরকম পুজোর আবহ তৈরি করতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
পুজোয় বাংলার কৃষি ও কৃষকের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য, বিষয়টি তুলে ধরার মধ্যে দিয়ে মালদহের চাঁচলে মৈত্রী সংসদের এই অভিনব ভাবনা কুর্নিশ জানিয়েছেন চাঁচলবাসীরা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যে সেজে ওঠা এই মণ্ডপ দর্শনার্থীদের কতটা মুগ্ধ করে, এখন সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন।