স্বাধীনতার ৮০ বছরে মাতঙ্গিনী হাজরাকে শ্রদ্ধা: অবহেলিত বসতভিটে এবার হেরিটেজ পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার পথে

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
স্বাধীনতার ৮০ বছরে মাতঙ্গিনী হাজরাকে শ্রদ্ধা: অবহেলিত বসতভিটে এবার হেরিটেজ পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার পথে
স্বাধীনতার ৮০ বছরে মাতঙ্গিনী হাজরাকে শ্রদ্ধা: অবহেলিত বসতভিটে এবার হেরিটেজ পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার পথে
 
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী

স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে দেশজুড়ে যখন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করা হচ্ছে, তখন নতুন করে সামনে এসেছে বাংলার অগ্নিকন্যা মাতঙ্গিনী হাজরার স্মৃতি। তমলুকের আলিনান গ্রামের তাঁর ঐতিহাসিক বসতভিটে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ভারতের ৮০ তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তার জেলার স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী মাতঙ্গিনী হাজরার বাড়িকে নতুন ভাবে সাজিয়ে তুলতে পদক্ষেপ নিয়েছেন। সেই স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে সংরক্ষণ করে হেরিটেজ মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ।

মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সাহসী নারী। গান্ধিজির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি অসহযোগ, আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘গান্ধীবুড়ি’ নামে।
 
মাতঙ্গিনী হাজরা
 
১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তমলুকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল বিশাল মিছিল। লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং সরকারি দফতর দখলের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
 
সেই মিছিলের অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন মাতঙ্গিনী হাজরা। ব্রিটিশ পুলিশের গুলির মুখেও তিনি পিছিয়ে যাননি। হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন এবং ‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণ করতে করতে শহিদ হন। সরকারি ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’-এর নথিতেও তাঁর এই সাহসিকতার উল্লেখ রয়েছে।
 
তমলুকের এই আন্দোলনের পটভূমিতেই পরে গড়ে ওঠে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার, যা ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে একটি সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে কাজ করেছিল।
 
মাতঙ্গিনী হাজরার স্মৃতি বহনকারী আলিনানের বাড়িটি স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটির অবস্থা খারাপ হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।মাতঙ্গিনীর পরিবারের বর্তমান সদস্যদের একজন প্রীতম হাজরার অভিযোগ, বাড়ির অবস্থা এখন ভগ্নপ্রায়। দীর্ঘদিনই ভালোভাবে কোন সংস্কার নেই। ভেঙে পড়ছে মাতঙ্গিনী হাজরার বাড়ি। 
 
মাতঙ্গিনী হাজরার স্মৃতি বিজড়িত দালানবাড়ি
 
১৯২২ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে মাতঙ্গিনীর ব্যবহার্য জিনিসপত্র রাখার জন্য ছোট্ট একটি সংগ্রহশালা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে বটে ওই বাড়িতেই, কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে সেটিও হারিয়ে যেতে বসেছে। কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও তৃণমূল জামানা এই বিপ্লবীর বাড়ি নিয়ে কি করেছে: মাতঙ্গিনীর স্মৃতি বিজড়িত দালানবাড়ি অক্ষত রাখতে বিভিন্ন সময়ে তৎপর হয়েছিল কংগ্রেস,বামফ্রন্ট জামানা থেকে তৃণমূল জামানা। ১৯৭৩ সালে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের আমলে একবার মাতঙ্গিনী হাজরার বাড়ি সংরক্ষণ করার কথা জোরালো ভাবে উঠেছিল। 
 
সেই সময় এলাকার মানুষের বারবার প্রশ্ন উঠেছিল, কেন হল না ভারতের প্রথম মহিলা বিপ্লবীর স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা? যদিও, সেই সময় সমস্ত বিতর্ক এড়িয়ে গিয়েছে শাসক শিবির। এরপর বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বিপ্লবী মাতঙ্গিনী হাজরার আদি পৈতৃক ভিটে বা বসতবাড়ি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বড় কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে স্বাধীন ভারতে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কলকাতা ময়দানে (রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে) তাঁর পূর্ণাবয়ব ব্রোঞ্জ মূর্তি স্থাপন করেছে, যা ছিল স্বাধীন ভারতে কোনো নারীর প্রথম মূর্তি স্থাপন।
 
এরপর ২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূল সরকার আসার পর ২০২২ সালে শহীদ মাতঙ্গিনী হাজরার জন্মভিটে হোগলা গ্রামে প্রথম বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করেছে। এরপর স্থানীয় প্রশাসন ও জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রাচীন বসতবাড়িটি সংরক্ষণ করে একটি হেরিটেজ পর্যটন কেন্দ্র ও স্মৃতি প্রদর্শশালায় রূপান্তরের মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া হয়। মাস্টার প্ল্যানের কাজ ফাইল বন্দিই হয়েছিল। তবে ছোট্ট একটি সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছিল জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে। কিন্তু সেই সংগ্রহশালা ও এখন অবহেলিত ।
 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'তুমি কি কেবলই ছবি' গানটি মূলত প্রিয়জনের প্রতি স্মৃতিচারণা করে। তাই সেই গানই যেন সত্যি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য। কেবল ইতিহাসের পাতাতেই তাঁদের ঠাঁই! স্বাধীনতার ৮০তম বছরে এসেও অবহেলিত ভারতের প্রথম মহিলা শহিদ স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা তমলুকের আলীনান গ্রামের মাতঙ্গিনী হাজরা। অবহেলায় পড়ে রয়েছে তাঁর বাস্তুভিটে। হয়নি সংস্কার। এগিয়ে আসেনি কোনও সরকারের প্রতিনিধি।
 
মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি 
 
সবচেয়ে বড় কথা, ১৯৭৩ সালে ভারতবাসীর মনেপ্রাণে বিপ্লবী মাতঙ্গিনী হাজরা স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তমলুকের আলীনান গ্রামে এসে মাতঙ্গিনী হাজরার শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেছিলেন। সেই সময় তিনি মাতঙ্গিনী হাজরার বসতভিটে সংরক্ষণ করার কথা ঘোষণা করেছিলেন।
 
তারপর কেটে গিয়েছে বহু বছর। রাজ্যে তিনটি সরকারের পরিবর্তন ঘটেছে কিন্তু বদল আসেনি বিপ্লবীর দালানবাড়ির। এবার ভারতের ৮০ তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তার জেলার স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী মাতঙ্গিনী হাজরার বাড়িকে নতুন ভাবে সাজিয়ে তুলতে পদক্ষেপ নিয়েছেন।
 
তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী সংরক্ষণের জন্য সেখানে ছোট একটি সংগ্রহশালাও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে সেই স্মৃতিচিহ্নগুলিও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।অথচ স্বাধীনতার ইতিহাসে মাতঙ্গিনী হাজরার অবদান কোনওভাবেই ছোট নয়। তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে স্বাধীনতার পর কলকাতার ময়দানে ১৯৭৭ সালে তাঁর পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপন করা হয়, স্বাধীন ভারতে কোনও নারীর জন্য কলকাতায় স্থাপিত প্রথম মূর্তির নজির হিসেবেও এটি উল্লেখ করা হয়।
 
স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের উদ্যোগে মাতঙ্গিনী হাজরার ঐতিহাসিক বসতভিটে পরিদর্শন করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। প্রাচীন কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে বাড়িটিকে সংরক্ষণ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
 
জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে হেরিটেজ কমিটির কাছে বাড়িটিকে হেরিটেজ মর্যাদা দেওয়ার আবেদন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে জায়গাটিকে একটি ঐতিহাসিক ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সেখানে মাতঙ্গিনী হাজরার জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা, তমলুকের ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের ইতিহাস তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
 
মাতঙ্গিনী হাজরার পূর্ণাবয়ব মূর্তি
 
মাতঙ্গিনী হাজরার বাড়িকে পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করার অর্থ শুধু একটি পুরনো বাড়ি সংস্কার করা নয়। এটি হতে পারে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।তাঁর জীবনকাহিনি বিশেষ করে নারীশক্তি, সাহস এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ। দরিদ্র কৃষক পরিবারের এক সাধারণ নারী কীভাবে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, সেই গল্প আজও অনুপ্রেরণা জোগায়।
 
আজ স্বাধীনতার ৮০ বছরে তাই মাতঙ্গিনী হাজরাকে স্মরণ করা সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা হতে পারে, তাঁর স্মৃতি শুধু বইয়ের পাতায় নয়, তাঁর নিজের মাটিতেও জীবন্ত করে রাখা। যে হাতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জাতীয় পতাকা ছিল, সেই হাতের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিও এবার যেন স্বাধীনতার ইতিহাসের যথাযথ মর্যাদা পায়, এই প্রত্যাশাই স্বাধীনতা দিবসে।


শেহতীয়া খবৰ