আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষকে বিনামূল্যে পতাকা দিয়ে দেশপ্রেমের বার্তা ছড়াচ্ছেন বরপেটার পিয়ার আলী
Story by Munni Begum | Posted by Aparna Das • 2 d ago
আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষকে বিনামূল্যে পতাকা দিয়ে দেশপ্রেমের বার্তা ছড়াচ্ছেন বরপেটার পিয়ার আলী
মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি
‘তেরঙ্গা কিনতে হাতে টাকা নেই, কিন্তু স্বাধীনতা দিবসে নিজের বাড়িতেও একটি পতাকা ওড়াব’, এমন ইচ্ছা নিয়ে আসা মানুষকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না বরপেটার কলগাছিয়ার দর্জি পিয়ার আলী। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে পতাকা তৈরির ব্যস্ততার মধ্যেও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষদের বিনামূল্যে তেরঙ্গা দিয়ে আসছেন পিয়ার আলী। তাঁর কাছে তেরঙ্গা শুধুমাত্র বিক্রির সামগ্রী নয়, এটি দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক।
‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে এক আলাপচারিতায় পিয়ার আলী বলেন, “আমি প্রায় ৩১ বছর ধরে দর্জির কাজ করে আসছি। দোকান শুরু করার এক বছর পর থেকে অর্থাৎ প্রায় ৩০ বছর ধরে আমি জাতীয় পতাকা সেলাই করে আসছি। আমাদের জাতীয় পতাকাটি আমার খুব প্রিয়। এই পতাকাই আমাদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। কিছু মানুষ আমার কাছে আসেন, কিন্তু তাঁদের হাতে পতাকা কেনার মতো টাকা থাকে না বা কম থাকে। এমন ক্ষেত্রে আমি প্রায়ই তাঁদের বিনামূল্যেই পতাকা দিয়ে দিই। আর বলি, তুমি এগুলো নিয়ে যাও, নিজেদের বাড়িতে পতাকা ওড়াবে।”
দর্জি পিয়ার আলী পতাকা সেলাই করার একটি মুহূর্ত
স্বাধীনতা দিবস যত এগিয়ে আসছে, দর্জি পিয়ার আলীর উদ্যোগে এখন তেরঙ্গা তৈরির কাজ পূর্ণগতিতে চলছে। কয়েকজন মানুষ মিলে বিভিন্ন আকারের পতাকা তৈরি করছেন। দুই-তিন ফুটের ছোট পতাকা থেকে শুরু করে পাঁচ ফুটেরও বেশি বড় পতাকা পর্যন্ত গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন আকারের তেরঙ্গা তৈরি করা হচ্ছে।
পিয়ার আলী বলেন, “বিশেষ করে আমি ২৬ জানুয়ারি এবং ১৫ আগস্ট, এই বিশেষ দুটি দিনের জন্যই পতাকা সেলাই করি। বাকি সময়ে আমি অন্য সব দর্জির মতো কাপড় সেলাই করি। স্কুল-কলেজ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে আমি এই পতাকা বিক্রি করি। যেহেতু এই পতাকাটি আমাদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে, তাই আমি পতাকার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি টাকা নিই না, শুধু কাপড়ের দামটুকুই নিই। যাতে সবাই কম দামে ভালো একটি পতাকা কিনে উত্তোলন করতে পারেন, সেটাই আমার উদ্দেশ্য। এই বৃহত্তর কলগাছিয়ায় একমাত্র আমিই পতাকা সেলাই করি।”
পিয়ার আলীর মতে, তাঁর কাছে শুধু স্থানীয় গ্রাহকরাই আসেন না, দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ পতাকা সংগ্রহ করতে আসেন। স্বাধীনতা দিবসের পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় তেরঙ্গার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় আগেই প্রস্তুত করা সামগ্রী শেষ হয়ে যায়।
গনতন্ত্র ও স্বাধীনতা দিবসের প্রাক মুহূর্তে পিয়ার আলীর দোকানের দৃশ্য
পিয়ার আলী বলেন, “ছোট পরিসরে শুরু করা এই কাজের ব্যস্ততা এখন অনেকটাই বেড়ে গেছে। আমরা এখন শুধু বৃহত্তর কলগাছিয়াতেই নয়, এর আশপাশের বহু অঞ্চল যেমন বরপেটা, বরভিটা, মায়ানবাড়ি, জয়পুর, তারকান্দি, বাঘবর, গোয়ালপাড়া এবং বঙ্গাইগাঁওসহ বিভিন্ন জেলায় আমাদের পতাকা সরবরাহ করে আসছি। পরিচিত জায়গাগুলিতেও সরবরাহ করি। কখনও কখনও দুই-তিন মাস আগেই কিছু সামগ্রী শেষ হয়ে যায়। বহু দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আমাদের কাছে পতাকা নিতে আসেন।”
পিয়ার আলীর তৈরি পতাকার ক্ষেত্রে তাঁরা কাপড়ের মান এবং তার প্রাপ্যতার দিকেও গুরুত্ব দেন। খাদি কাপড়ের পাশাপাশি অন্যান্য কাপড় মিশিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী তেরঙ্গা তৈরি করা হয়। সাদা রঙের জন্য খাদি কাপড় ব্যবহার করা হয়, অন্যদিকে অন্যান্য রঙের জন্য উপলব্ধ কটন কাপড় ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, “পতাকার আকার অনুযায়ী দামও আলাদা হয়। দুই ফুট, তিন ফুট, পাঁচ ফুট বা তার চেয়েও বড় আকারের পতাকা গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা হয়। কিন্তু মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র লাভের বিষয়টিই গুরুত্ব পায় না। আমাদের কারখানায় একটি পতাকা তৈরির জন্য যে খরচ হয়, আমরা গ্রাহকের কাছ থেকে সেই খরচটুকুই নিই। আমি কখনও গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নিতে চাই না। সাধারণ মানুষও যাতে পতাকা কিনতে পারেন, আমরা সবসময় সেই বিষয়টি মাথায় রাখি।”
পিয়ার আলীর এই উদ্যোগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। কেউ তেরঙ্গা কেনার জন্য পর্যাপ্ত টাকা নিয়ে আসতে না পারলেও, যাতে দেশের জাতীয় পতাকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হন, সেই বিষয়টির প্রতি তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। কখনও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তিনি পতাকা দেন, পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী পরে টাকা পরিশোধ করার সুযোগও দেন।
একটি তেরঙ্গা দেখতে হয়তো কেবল তিনটি রঙের কাপড় দিয়ে তৈরি একটি পতাকা। কিন্তু এর পিছনে থাকে বহু মানুষের পরিশ্রম, সময় এবং অনুভূতি। পিয়ার আলীর ক্ষেত্রে সেই অনুভূতিই পেয়েছে এক মানবিক রূপ। অর্থের অভাব যাতে কোনও মানুষের দেশপ্রেম প্রকাশের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেই লক্ষ্যেই তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
স্বাধীনতা দিবসে যখন বরপেটার বিভিন্ন প্রান্তে তেরঙ্গা উড়বে, তখন সেই পতাকার প্রতিটি সেলাইয়ে শুধু কারও পরিশ্রমই নয়, পিয়ার আলীর মতো উদ্যোগীর মানবিকতা এবং দেশপ্রেমেরও একেকটি গল্প লুকিয়ে থাকবে।