দেশপ্রেমের কোনও ধর্ম নেই, নদিয়ার ঝন্টু আলি শেখের রক্তে লেখা স্বাধীনতার গল্প

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
দেশপ্রেমের কোনও ধর্ম নেই, নদিয়ার ঝন্টু আলি শেখের রক্তে লেখা স্বাধীনতার গল্প
দেশপ্রেমের কোনও ধর্ম নেই, নদিয়ার ঝন্টু আলি শেখের রক্তে লেখা স্বাধীনতার গল্প
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

১৫ আগস্টের স্বাধীনতা দিবসে নদিয়ার এক মুসলিম সেনা পরিবারের গল্প মনে করিয়ে দেয়, দেশের জন্য আত্মত্যাগের কোনও ধর্ম হয় না। স্বাধীনতার ৭৯তম বর্ষে যখন লালকেল্লা থেকে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সারা দেশ ‘জন গণ মন’-এ একসঙ্গে গলা মেলাবে, তখন পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার এক ছোট্ট গ্রামের নামও মনে পড়ে। সেই গ্রামের মাটিতে আজও বেঁচে আছে এমন এক পরিবারের স্মৃতি, যাদের কাছে দেশপ্রেম কোনও স্লোগান নয়, জীবনের অঙ্গীকার।
 
নদিয়ার কৃষ্ণনগরের কাছে পাথরঘাটা গ্রামের বাসিন্দা হাবিলদার ঝন্টু আলি শেখ ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের উধমপুরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে শহিদ হন। ভারতীয় সেনার অভিজাত ৬ প্যারা (স্পেশাল ফোর্সেস)-এর এই জওয়ান সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিতে গিয়েই প্রাণ হারান।

ঝন্টুর জীবনকাহিনিও ছিল সংগ্রামের। সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। ছোটবেলা থেকেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ২০০৮ সালে ভারতীয় সেনায় যোগ দেওয়ার পর প্যারাশুট রেজিমেন্টে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন এবং পরে স্পেশাল ফোর্সেসের কঠিন প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ করেন। কিন্তু এই পরিবারের দেশপ্রেমের গল্প শুধু ঝন্টুতেই থেমে নেই।
 
ঝন্টুর বড় ভাই সুবেদার রফিকুল আলি শেখও ভারতীয় সেনার সদস্য। ভাইয়ের মরদেহ যখন জাতীয় পতাকায় মোড়া হয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরল, তখন শোকের পাশাপাশি তাঁর কণ্ঠে ছিল গর্ব। একজন ভাই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, অন্য ভাই এখনও দেশের সেবায় নিয়োজিত।
 
ঝন্টুর শেষকৃত্যে গ্রামের মানুষ ধর্মের পরিচয় ভুলে একসঙ্গে জড়ো হয়েছিলেন। জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিনের সামনে উচ্চারিত হয়েছিল ‘হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ’। সেই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দিয়েছিল, একজন সেনার পরিচয় তাঁর ধর্মে নয়, তাঁর ইউনিফর্মে; তাঁর রক্তের রং আলাদা নয়, তাঁর শপথও আলাদা নয়।
 
 
২০২৫ সালের এপ্রিলের সেই ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছেও ঝন্টু আলি শেখ হয়ে ওঠেন এক বিশেষ প্রতীক। পহেলগামের জঙ্গি হামলার মাত্র কয়েকদিন পর উধমপুরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে তিনি শহিদ হন। পরে রাজ্য সরকার তাঁর স্ত্রী শাহনাজ পারভীনকে হোমগার্ডের চাকরি এবং ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়। তাঁর রেখে যাওয়া ছোট সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়।
 
নদিয়ার ঝন্টু আলির শেষ যাত্রার একটি দৃশ্য
 
এই গল্পের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই, ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস যেমন একক কোনও সম্প্রদায়ের ইতিহাস নয়, তেমনই দেশের সীমান্ত রক্ষার ইতিহাসও কোনও একটি ধর্মের মানুষের হাতে লেখা নয়।
 
বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসেও তার অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। কলকাতার লিয়াকত হুসেন স্বদেশি আন্দোলনের সময় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। সরকারি ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’-এর নথিতেও তাঁকে জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম এবং হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
আর বাংলার মাটিতে কাজী নজরুল ইসলামের কলম তো আরও স্পষ্ট করে দিয়েছিল সেই সত্য। খুদিরাম বসুর আত্মত্যাগকে সামনে রেখে নজরুল লিখেছিলেন মাতৃভূমির জন্য আত্মত্যাগের কথা। তাঁর দেশাত্মবোধক সাহিত্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সরকারি সাংস্কৃতিক নথিতেও নজরুলের এই ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে।
 
আজকের প্রজন্মের কাছে তাই স্বাধীনতা দিবস শুধু পতাকা উত্তোলন, মিষ্টি বিতরণ কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দিন নয়। ১৫ আগস্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই দেশ গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানুষের ত্যাগে। কেউ জেলে গিয়েছেন, কেউ ফাঁসির মঞ্চে উঠেছেন, কেউ সীমান্তে গুলি খেয়েছেন, আবার কেউ আজও ইউনিফর্ম পরে দেশের পাহারায় দাঁড়িয়ে আছেন।
 
নদিয়ার ঝন্টু আলির শেষ যাত্রার একটি দৃশ্য
 
নদিয়ার ঝন্টু আলি শেখের গল্প সেই বৃহত্তর ভারতেরই একটি ছোট অথচ শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি। একজন মুসলিম যুবক দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। তাঁর মুসলিম ভাই এখনও দেশের সেবায় রয়েছেন। তাঁদের গ্রামের মানুষ তাঁর শেষযাত্রায় জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়েছেন।
 
এই ছবির মধ্যেই যেন স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় বার্তা লুকিয়ে আছে, ভারতকে ভালোবাসার আগে কোনও ধর্মীয় পরিচয়পত্র লাগে না। দেশের জন্য রক্ত দিলে সেই রক্তের কোনও হিন্দু-মুসলিম পরিচয় থাকে না।
 
১৫ আগস্টের তেরঙ্গা তাই শুধু স্বাধীনতার প্রতীক নয়, এটি সেই অগণিত মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগের প্রতীক, যাঁরা প্রমাণ করে গিয়েছেন, দেশ সবার আগে। ঝন্টু আলি শেখের মতো শহিদদের স্মরণ করে স্বাধীনতা দিবসে সেই ভারতকেই আরও শক্তিশালী করার শপথ হোক, যেখানে ধর্ম আলাদা হতে পারে, কিন্তু দেশ এক।


শেহতীয়া খবৰ