যাঁর কণ্ঠে উঠেছিল ‘বন্দেমাতরম’, স্বাধীনতার ইতিহাসে বিস্মৃত লিয়াকত হুসেন, যাঁর লড়াইয়ের কেন্দ্রে ছিল স্বদেশ ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্য

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

স্বাধীনতা দিবস এলেই ইতিহাসের পাতায় ফিরে আসেন খুদিরাম বসু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, ভগৎ সিং কিংবা মাস্টারদা সূর্য সেন। তাঁদের আত্মত্যাগ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর অধ্যায়। কিন্তু সেই বিশাল ইতিহাসের আড়ালে এমন বহু নাম রয়ে গিয়েছে, যাঁদের অবদান আজকের প্রজন্মের কাছে প্রায় বিস্মৃত। কলকাতার লিয়াকত হুসেন তেমনই এক নাম।
 
স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরও তাঁর নাম খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। অথচ ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি কলকাতার রাজপথে দাঁড়িয়ে শুধু ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধেই আওয়াজ তোলেননি, মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তাও ছড়িয়েছিলেন।
 
লিয়াকত হুসেন
 
ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’-এর ডিজিটাল জেলা সংগ্রহশালায় লিয়াকত হুসেনকে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের একজন বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁর বিশেষ পরিচয় হিসেবে উঠে এসেছে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি এবং মুসলিম সমাজের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার ভূমিকা।
 
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে কলকাতার রাজপথে
 
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে উত্তাল করে তুলেছিল। শুরু হয় স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন। সেই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ পণ্য বর্জন এবং ভারতীয়দের মধ্যে আত্মনির্ভরতার চেতনা তৈরি করা।
 
এই সময়ই লিয়াকত হুসেন সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যুক্ত হন। তাঁর ভূমিকার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, তিনি কেবল বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তরুণদের নিয়ে মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সরকারি নথি অনুযায়ী, সেই মিছিলে তরুণদের সঙ্গে তিনি ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি তুলতেন এবং পুলিশের বাধার মুখেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন।
 
আজকের চোখে ঘটনাটি হয়তো সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সেই সময়ে প্রকাশ্যে ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। লিয়াকত হুসেন সেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
 
 
প্রতীকী ছবি
আইন অমান্য করেও পিছিয়ে যাননি
 
ব্রিটিশ সরকার যখন জনসভা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, তখনও লিয়াকত হুসেন পিছিয়ে যাননি। সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে, জেনারেল অ্যাসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়ার সরকারি আদেশ তিনি অমান্য করেন। এর পরিণতিতে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়।
 
তাঁর এই অবস্থান ছিল সেই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা, অন্যায় আইন মান্য করাই কর্তব্য নয়; দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনে অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও হয়।
 
ধর্মের দেওয়ালের ওপারে যে দেশপ্রেম
 
লিয়াকত হুসেনের কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। স্বাধীনতা সংগ্রামকে অনেক সময় শুধুই রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের ভিতরে আর একটি বড় লড়াই চলছিল, মানুষকে ধর্মের বিভাজনের ঊর্ধ্বে তুলে জাতীয় পরিচয়ে একত্রিত করা।
 
লিয়াকত হুসেন সেই প্রচেষ্টার অন্যতম মুখ ছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করতে হলে ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন। তাই তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। ভারত সরকারের সংরক্ষিত ইতিহাসেও তাঁর এই ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এখানেই ১৫ আগস্টে তাঁকে নতুন করে মনে করার প্রয়োজন।
 
প্রতীকী ছবি
 
ইতিহাস শুধু বিখ্যাতদের নয়
 
স্বাধীনতার ইতিহাসে ‘বিস্মৃত’ বা ‘উপেক্ষিত’ মানুষদের কথা বলা মানে বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদানকে ছোট করা নয়। বরং স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম যে কত হাজার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছিল, তা বোঝা।
 
পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ইতিহাসের বিভিন্ন নথিতেও এমন বহু তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর কথা সংরক্ষিত রয়েছে। যেমন নদিয়ার বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় অসহযোগ, আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং ব্রিটিশ কারাগারে একাধিকবার বন্দি হন।  আবার উত্তর ২৪ পরগনার জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, যিনি ‘গণেশ চন্দ্র চক্রবর্তী’ ছদ্মনামে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চালিয়েছিলেন, সরকারি নথিতে ‘অস্বীকৃত’ বা কম-স্বীকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে উল্লেখিত। কিন্তু লিয়াকত হুসেনের গল্পটির আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। কারণ তাঁর সংগ্রামের মধ্যে স্বাধীনতার পাশাপাশি ছিল সম্প্রীতির লড়াই।
 
আজকের ১৫ আগস্টে লিয়াকত হুসেন কেন প্রাসঙ্গিক?
 
আজ যখন স্বাধীনতা দিবসে স্কুলে, পাড়ায়, সরকারি দফতরে তেরঙ্গা ওঠে, তখন আমরা স্বাধীনতার অর্থকে শুধু ১৯৪৭ সালের একটি ঐতিহাসিক তারিখ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। স্বাধীনতা মানে এমন একটি দেশ, যেখানে নাগরিকের ধর্ম তাঁর দেশপ্রেমের মাপকাঠি নয়। লিয়াকত হুসেনের জীবন সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়।
 
একজন মুসলিম স্বাধীনতা সংগ্রামী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মিছিলে দাঁড়িয়ে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি তুলেছিলেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছিলেন। অন্যায় সরকারি নির্দেশ অমান্য করে কারাবরণ করেছিলেন। তাঁর কাছে ভারত ছিল কোনও একটি সম্প্রদায়ের দেশ নয়, সব মানুষের দেশ। আজ স্বাধীনতার ৭৯ বছর পর সেই বিস্মৃত কণ্ঠকে ফিরিয়ে আনা তাই শুধু ইতিহাসচর্চা নয়, বর্তমানের কাছেও একটি বার্তা।
 
 
প্রতীকী ছবি
 
স্বাধীনতার লড়াইয়ে কেউ রক্ত দিয়েছেন, কেউ জেল খেটেছেন, কেউ কলম ধরেছেন, কেউ রাজপথে মিছিল করেছেন। তাঁদের পথ আলাদা হলেও লক্ষ্য ছিল এক, পরাধীনতার অবসান এবং একটি স্বাধীন ভারত। 
 
১৫ আগস্টের তেরঙ্গার তিন রঙের মতোই সেই ইতিহাসও বহু মানুষের সম্মিলিত রঙে তৈরি। আর সেই ইতিহাসের একটি বিস্মৃত পৃষ্ঠা জুড়ে আজও লেখা রয়েছে একটি নাম,  লিয়াকত হুসেন। যাঁর কণ্ঠে একদিন উঠেছিল ‘বন্দেমাতরম’, আর যাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল একটি স্বপ্ন, স্বাধীন ভারত এবং মানুষের মধ্যে ঐক্য।


শেহতীয়া খবৰ