রাজস্থানের বনাঞ্চলে আবারও বাঘের গর্জন ফিরিয়ে আনা অধ্যাপিকা ফাতিমা সুলতানা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 17 h ago
অধ্যাপিকা ফাতিমা সুলতানা
অধ্যাপিকা ফাতিমা সুলতানা
 
নীলম গুপ্তা

একসময় রাজস্থানের হাডৌতি অঞ্চলের কোটা, বুন্দি এবং ঝালাওয়ার জেলাজুড়ে বিস্তৃত দরাহ ও রামগড়ের ঘন অরণ্য ছিল বাঘের নিরাপদ বিচরণভূমি। একই সঙ্গে, এই বনাঞ্চলগুলি তৎকালীন রাজপরিবারের শিকারক্ষেত্র হিসেবেও সুপরিচিত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এই দুই পরিচয়ই হারিয়ে যেতে শুরু করে। একদিকে সাওয়াই মাধোপুর জেলার রণথম্ভোর বনাঞ্চলকে রাজস্থান সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার টাইগার রিজার্ভ হিসেবে ঘোষণা করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। অন্যদিকে দরাহ ও রামগড়ের বনাঞ্চল দীর্ঘদিন অবহেলিত থেকে যায়। ফলে এই অঞ্চলগুলি থেকে বাঘ প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং মধ্যপ্রদেশের গান্ধীসাগর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সঙ্গে সংযোগকারী প্রাকৃতিক বন্যপ্রাণী করিডোরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
 
প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত রণথম্ভোর, রামগড়, দরাহ হয়ে গান্ধীসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই ঘন বনাঞ্চল একসময় ছিল একটি অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক আবাসস্থল, যেখানে বাঘ স্বাধীনভাবে বিচরণ করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিবেশগত সংযোগ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায়। গত দশ বছরেই কেবল এই প্রাকৃতিক সংযোগ আবার পুনরুজ্জীবিত হতে শুরু করেছে। বর্তমানে আগে প্রায় ২৫০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত দরাহ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সম্প্রসারিত হয়ে প্রায় ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে মুকুন্দরা হিলস টাইগার রিজার্ভে পরিণত হয়েছে। একইভাবে, রামগড় অভয়ারণ্যও এখন রামগড় বিষধারী টাইগার রিজার্ভ নামে পরিচিত।
 
অধ্যাপিকা ফাতিমা সুলতানা
 
এই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের পেছনে কী কারণ রয়েছে? এর বড় কৃতিত্ব যায় বিশিষ্ট প্রাণীবিজ্ঞানী এবং কোটার জে ডি বি গার্লস কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপিকা ফাতিমা সুলতানার সুদূরপ্রসারী গবেষণার কাছে। অধ্যাপিকা সুলতানা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “১৯৮৮ সালে আমি কোটার সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে প্রাণীবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করি এবং আমার বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করি। সেই সাফল্যের ভিত্তিতে আমাকে তখনই বারান সরকারি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপিকা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চাকরি জীবনে আমাকে চারবার বদলি করা হয়েছিল, যার মধ্যে একবার ঝালাওয়ারেও বদলি করা হয়।”
 
কোটা এবং ঝালাওয়ারের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াতের সময় দরাহর সবুজ, মনোরম বনাঞ্চল তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি বলেন, “সেই সময়ই আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, যদি কোনোদিন গবেষণা করি, তবে এই বনাঞ্চলকেই নিয়ে করব।” তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যোধপুরে অনুষ্ঠিত একটি রিফ্রেশার কোর্সে অংশগ্রহণ করার সময়। সেখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয় বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পি. পি. বারকরের সঙ্গে। তিনি অংশগ্রহণকারীদের রণথম্ভোরের পরিবেশ ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেছিলেন।
 
অধ্যাপিকা সুলতানা বলেন, “আমি তাঁকে বলেছিলাম যে আমি দরাহ অভয়ারণ্য নিয়ে গবেষণা করতে চাই। তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘এটি খুব কঠিন কাজ। আপনি পারবেন বলে মনে হয় না।’ আমি উত্তরে বলেছিলাম, আমি কঠোর পরিশ্রম করতে প্রস্তুত।” এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে অধ্যাপিকা সুলতানা ড. অনুরাধা সিং-এর তত্ত্বাবধানে কোটার জে ডি বি গার্লস কলেজে পিএইচডির জন্য ভর্তি হন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল, ‘রাজস্থানের হাডৌতি অঞ্চলের দরাহ অভয়ারণ্যের প্রাণীজগতের বৈচিত্র্য নিয়ে একটি গবেষণা’ (A Study of the Faunal Diversity of Darrah Sanctuary of the Hadoti Region in Rajasthan)। ২০০৭ সালে তিনি সফলভাবে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
 
গবেষণা সম্পন্ন করার পর তিনি তাঁর গবেষণাপত্রের একটি কপি কোটার বন ও বন্যপ্রাণী বিভাগ এবং জয়পুরে অবস্থিত বিভাগীয় প্রধান কার্যালয়ে পাঠান। অধ্যাপিকা সুলতানা বলেন, “আমার গবেষণার ভিত্তিতেই প্রথমবার বন বিভাগ দরাহ অভয়ারণ্যের পরিবেশগত গুরুত্ব নিয়ে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা শুরু করে।” এর কিছুদিন পর রাজস্থান বন বিভাগের পক্ষ থেকে তিনি একটি সরকারি চিঠি পান। সেখানে তাঁকে একজন পরিবেশবিদ (Ecologist) হিসেবে সম্বোধন করে জানতে চাওয়া হয়, ওই অঞ্চলে আবার বাঘ পুনর্বাসন (Tiger Reintroduction) সম্ভব কি না, আর সম্ভব হলে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত ও বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে।
 
অধ্যাপিকা সুলতানা বলেন, “আমি ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেই প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলাম। সেই প্রতিবেদনে দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতেই ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে রাজস্থান সরকার অঞ্চলটিকে মুকুন্দরা হিলস টাইগার রিজার্ভ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর রণথম্ভোর থেকে দুটি বাঘ স্থানান্তর করে এখানে ছেড়ে দেওয়া হয়।”
 
অধ্যাপিকা ফাতিমা সুলতানা
 
রণথম্ভোরে বাঘের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন আবাসস্থলের প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই রণথম্ভোর এবং মুকুন্দরা হিলসের মাঝখানে অবস্থিত রামগড় বিষধারী অভয়ারণ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। এই অভয়ারণ্য পুনর্গঠন করা গেলে বাঘ এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য একটি নিরাপদ বন্যপ্রাণী করিডোর (Wildlife Corridor) তৈরি হতো, যার মাধ্যমে তারা নিরাপদে নতুন অঞ্চলে গিয়ে নিজেদের আবাসস্থল সম্প্রসারণ করতে পারত।
 
তিনি বলেন, “এরপর বন বিভাগ আমাকে রামগড় বিষধারীর জন্যও একই ধরনের আবাসস্থল-উপযোগিতা (Habitat Feasibility) প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বলে। আমি ২০২২ সালে সেই প্রতিবেদন জমা দিই। আমার সুপারিশের ভিত্তিতেই এর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (Management Plan) প্রস্তুত করা হয়। এছাড়া তথ্য বিশ্লেষক (Data Analyst) এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞ (Technical Expert) হিসেবেও আমি অবদান রেখেছি।” বর্তমানে রামগড় বিষধারী আর শুধু একটি সাধারণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য নয়; এটি রাজস্থানের বাঘ সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
 
অধ্যাপিকা সুলতানা বলেন, “এখন রণথম্ভোর থেকে একটি বাঘ নিরাপদে রামগড় হয়ে মুকুন্দরা হিলসে যেতে পারে এবং আবার স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসতে পারে। এর ফলে শুধু বন্যপ্রাণীরাই উপকৃত হয়নি, প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকরাও লাভবান হয়েছেন। এখন তাঁরা এই তিনটি সংযুক্ত বনাঞ্চল ঘুরে দেখতে তিন থেকে চার দিন সময় ব্যয় করতে পারেন।” অধ্যাপিকা সুলতানা তাঁর এই সাফল্যের মূল উৎস হিসেবে বন্যপ্রাণীর প্রতি আজীবনের ভালোবাসাকেই কৃতিত্ব দেন। তিনি বলেন, “বন বিভাগ আমার প্রতিবেদনগুলো গ্রহণ করেছিল, কারণ তাদের কাছে অভয়ারণ্যগুলোর কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্য থাকলেও বাঘ পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা দিতে পারে এমন কোনো বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক নথি ছিল না।”
 
ডক্টরেট গবেষণার সময় তিনি যেসব অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেগুলোর কথাও তিনি স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “যখন আমি গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহ শুরু করি, তখন কোটা বা জয়পুরের গ্রন্থাগার এবং সরকারি দপ্তরগুলোতে প্রায় কোনো তথ্যই পাওয়া যেত না। এমনকি দেরাদুনের ভারতীয় বন্যপ্রাণী প্রতিষ্ঠান (Wildlife Institute of India)-এও দরাহ সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য সংরক্ষিত ছিল না। আমি যে একমাত্র তথ্যটি পেয়েছিলাম, তাতে শুধু দরাহ অভয়ারণ্যের ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক (Geographical Coordinates) উল্লেখ ছিল।”
 
আশ্চর্যের বিষয়, সেই ক্ষেত্রে কর্মরত বহু বিজ্ঞানীও অঞ্চলটি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতেন না। তিনি বলেন, “আমি নিরাশ হওয়ার পরিবর্তে উপলব্ধি করেছিলাম যে, এই গবেষণাটি ভবিষ্যতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।” অবশেষে কোটা বন বিভাগের সংরক্ষিত নথিপত্রের মধ্যে তিনি ১৯১৮ সালের একটি বিরল ঐতিহাসিক নথি খুঁজে পান। সেই নথি থেকে অতীতের কিছু মূল্যবান তথ্য মিললেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বনাঞ্চলের উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহের জন্য তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে গবেষণা চালাতে হয়।
 
তিনি স্মরণ করে বলেন, “মহাবিদ্যালয়ের দায়িত্ব থাকায় আমি শুধু ছুটির দিনগুলোতেই বনাঞ্চলে যেতে পারতাম। কখনও কখনও আমার স্বামী সঙ্গে যেতেন, তবে সব সময় নয়। তখন আমার মেয়ে খুব ছোট ছিল, তাই অনেক সময় তাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হতো। বন বিভাগের কার্যালয়ে তাকে রেখে আমি গভীর অরণ্যে গবেষণার কাজে চলে যেতাম। সন্ধ্যায় ফিরতে দেরি হলে মাঝেমধ্যে এসে দেখে যেতাম, সে নিরাপদে আছে কি না।”
 
অধ্যাপিকা ফাতিমা সুলতানা
 
অতীতের সেই দিনগুলোর কথা মনে করে অধ্যাপিকা ফাতিমা সুলতানা মৃদু হেসে বলেন, “কখনও কখনও আমি ভাবি, গবেষণার প্রতি আমার কত গভীর অনুরাগ ছিল! সেই একাগ্রতার কারণেই অজান্তে নিজের সন্তানকেও বিপদের মুখে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমার লক্ষ্য ছিল গবেষণাটি সম্পূর্ণ করা।”
 
বাঘের পরিবেশবিদ্যা (Tiger Ecology) নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি অধ্যাপিকা সুলতানা দরাহর বনাঞ্চলে বিপুল সংখ্যায় বসবাসকারী শ্লথ ভালুক (Sloth Bear)-এর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় একটি পৃথক গবেষণা সম্পন্ন করেন। তাঁর এই গবেষণা আন্তর্জাতিক স্তরেও বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করে। গ্রিস এবং জাপানে অনুষ্ঠিত একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাঁকে গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।
 
এই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের সামনে আমি শুধু আমার গবেষণাপত্র উপস্থাপনই করিনি, বেশ কয়েকটি কারিগরি অধিবেশনেও সভাপতিত্ব করেছি। সেই মুহূর্তগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়গুলোর অন্যতম। তখনই আমি অনুভব করেছিলাম যে, আমার সমস্ত পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।”
 
অধ্যাপিকা ফাতিমা সুলতানা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তা সরকারি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি প্রায় ২৮ বছর ধরে কোটার জনকী দেবী বাজাজ গার্লস কলেজে কর্মরত ছিলেন। এই সময়ে তিনি প্রথমে প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এবং পরে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
 
তাঁর কর্মজীবনের সময় প্রাণীবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে বন ব্যবস্থাপনা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ (Forestry and Wildlife Management) বিষয়ক একটি বিশেষ কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার লক্ষ্য ছিল, প্রাণীবিজ্ঞান পড়া শিক্ষার্থীরা শিক্ষক হওয়ার আগেই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করুক।”
 
তাঁর এই উদ্যোগ অত্যন্ত সফল হয়। তিনি বলেন, “আমাদের মহাবিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রী এই বিষয়টি বেছে নিয়েছিল। এখন সাওয়াই মাধোপুরসহ রাজস্থানের বহু মহাবিদ্যালয় নিজেদের পাঠ্যক্রমে এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে।” এরও আগে, ২০১০ সালেই তাঁর উদ্যোগে কোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বতন্ত্র বন্যপ্রাণী বিভাগ (Department of Wildlife) প্রতিষ্ঠিত হয়। অধ্যাপিকা সুলতানার অবদান শুধু নতুন পাঠ্যক্রম চালু করাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বহু সেমিনার, কর্মশালা এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করেন, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বন্যপ্রাণী, চম্বল নদী এবং এর উপনদীগুলোর পরিবেশ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার জন্য উৎসাহিত করা হয়।
 
তাঁর এই প্রচেষ্টা নতুন প্রজন্মের বহু গবেষককে হাডৌতি অঞ্চলের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণায় অনুপ্রাণিত করেছে। এখন পর্যন্ত তিনি ৫০ জনেরও বেশি এম.ফিল. ও পিএইচডি গবেষককে গবেষণার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া তাঁর ১০০টিরও বেশি গবেষণাপত্র দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
 
অধ্যাপিকা ফাতিমা সুলতানা
 
যদিও তিনি বন্যপ্রাণী গবেষণাকে নিজের ব্যক্তিগত অনুরাগ বলে মনে করেন, তবুও তাঁর কাজের প্রভাব শিক্ষাক্ষেত্রের সীমা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে। তাঁর গবেষণার ফলে হাডৌতি অঞ্চলের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। ইকো-ট্যুরিজম-এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং বছরের পর বছর অবহেলিত বনাঞ্চলগুলো আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। একসময় যে বনাঞ্চলগুলো রাজপরিবারের শিকারক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ সেগুলো বাঘ এবং অসংখ্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
 
উচ্চশিক্ষায় বন্যপ্রাণী অধ্যয়ন অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে তিনি মধ্যপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল বনাঞ্চল এবং নদীকেন্দ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর ভবিষ্যৎ গবেষণার একটি শক্তিশালী ভিত্তিও গড়ে তুলেছেন। তাঁর মতে, “ভবিষ্যতের গবেষকদের তথ্যের সন্ধানে আর দেরাদুন যেতে হবে না। এখন এই অঞ্চলের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সম্পর্কিত মূল্যবান তথ্য নিজেদের রাজ্যেই উপলব্ধ রয়েছে।”
 
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, পরিবেশ গবেষণা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইতিমধ্যেই ১৪টিরও বেশি সম্মান ও পুরস্কার লাভ করেছেন। সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রায়ই বলা একটি অনুপ্রেরণামূলক বার্তা আবারও শোনান, “আমি সবসময় আমার ছাত্রীদের বলি, কখনও এই কথা ভাববে না যে, ‘আমি তো শুধু একজন মেয়ে।’ আমিও একজন মেয়ে ছিলাম, কিন্তু আজ আমি কী অর্জন করতে পেরেছি, তা তোমরা দেখছ। মহাবিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি আমি আমার বন্যপ্রাণী গবেষণা, গবেষণাপত্র এবং বইয়ের কাজ সম্পূর্ণ করেছি। যেখানে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, সেখানেই নতুন কিছু সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছি। যদি আমি পারি, তবে তোমরাও অবশ্যই পারবে।”