সাবিহা ফাতিমা
দিল্লির এক সরু গলিতে সন্ধ্যার আবছা আলো ধীরে ধীরে নেমে আসে। চারপাশে ভেসে বেড়ায় কাওয়ালির সুর, যার সঙ্গে মিশে থাকে গোলাপের মিষ্টি সুবাস আর জ্বলতে থাকা উদের ধোঁয়ার গন্ধ। রঙিন চাদরে সাজানো দোকানগুলো ম্লান আলোয় যেন অন্যরকম এক আবহ তৈরি করে। কারও হাতে ফুলে ভরা ঝুড়ি, কেউ শক্ত করে ধরে রেখেছেন দোয়া লেখা ছোট্ট কাগজ, আর কয়েকজন মোটা রেজিস্টার সামনে রেখে মানুষের নাম নথিভুক্ত করার অপেক্ষায় বসে আছেন। এই পরিচিত পরিবেশের মাঝখানে এক তরুণ দর্শনার্থী নীরবে দাঁড়িয়ে, গভীর কৌতূহল নিয়ে চারপাশের প্রতিটি দৃশ্য নিজের চোখে ধারণ করছে।
এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে তাঁর হাতে একটি নকশিকাঁথার মতো সূচিশিল্পে সজ্জিত চাদর তুলে দিলেন। তিনি বললেন, “এটি মাজারে চড়িয়ে দিন, আপনার দোয়া আরও দ্রুত কবুল হবে।” কয়েক কদম এগোতেই আরেকজন ডেকে উঠলেন, “আপনার নাম নথিভুক্ত করুন। আপনার জন্য বিশেষ দোয়া করা হবে।” তরুণটি থমকে দাঁড়াল। ক্ষণিকের জন্য তার মনে একটি প্রশ্ন জেগে উঠল, যে প্রশ্ন যুগে যুগে অসংখ্য চিন্তাশীল মানুষের মনেও এসেছে।
খানকাহ কি সত্যিই এমনই হওয়ার কথা ছিল? এটি শুধু একটি দরগাহকে ঘিরে প্রশ্ন নয়; এটি আসলে একটি সম্পূর্ণ সভ্যতাকে ঘিরে প্রশ্ন। আজ ‘খানকাহ’ শব্দটি শুনলেই আমাদের অনেকের চোখে ভেসে ওঠে সবুজ চাদরে মোড়া কোনো পীরের মাজার, বার্ষিক উরস, হৃদয়স্পর্শী কাওয়ালি আর ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়। অথচ খানকাহর প্রকৃত পরিচয় এই দৃশ্যগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল।
খানকাহ কখনোই শুধু কোনো আউলিয়ার সমাধিস্থল ছিল না। এটি ছিল তাঁর জীবদ্দশায় প্রতিষ্ঠিত এমন এক প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানুষকে শুধু আশ্রয় নয়, গড়ে তোলা হতো। সেখানে অবশ্যই ইবাদত হতো, কিন্তু ইবাদতই কখনো তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। তার বৃহত্তর লক্ষ্য ছিল মানুষের চরিত্র গঠন, আত্মার পরিশুদ্ধি এবং একজন মানুষকে আরও উত্তম মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। সম্ভবত এ কারণেই ইসলামের প্রাথমিক যুগে আমরা বিশাল খানকাহ ভবনের অস্তিত্ব দেখি না, কিন্তু তার চেতনাকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাই।
মদিনায় মহানবী (সা.)-এর মসজিদের পাশে অবস্থিত আসহাবে সুফফা-র সেই সাধারণ মঞ্চটির দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। সেখানে অবস্থানকারী সাহাবিদের কারও বিপুল সম্পদ ছিল না, ছিল না জমিদারি কিংবা দুনিয়ার আরাম-আয়েশ। কিন্তু তাঁদের কাছে ছিল আরও মূল্যবান সম্পদ, জ্ঞান, নিষ্ঠা, নিঃস্বার্থতা এবং আল্লাহ ও রাসুল মহম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে অটুট সম্পর্ক। সেই সরল সূচনা থেকেই পরবর্তীকালে মুসলিম বিশ্বের মহান খানকাহগুলোর ঐতিহ্যের বিকাশ ঘটে।
ইসলামী আধ্যাত্মিকতার ভিত্তি কখনো বাহ্যিক জাঁকজমকের ওপর নির্মিত হয়নি। খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো তার এক অনন্য উদাহরণ। মৃত্যুশয্যায় তাঁর ছেলে নতুন সাদা কাফনের প্রস্তাব দিলে, বর্ণনা অনুযায়ী তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, মৃত মানুষের নতুন কাপড়ের প্রয়োজন জীবিত মানুষের চেয়ে বেশি নয়; তাঁর পুরোনো পোশাকই যথেষ্ট।
এটি কেবল ব্যক্তিগত সরলতার পরিচয় ছিল না। এটি এমন এক দর্শনের প্রতিফলন, যার ওপর পরবর্তীকালে খানকাহর ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল, যেখানে পোশাকের চেয়ে চরিত্র, বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে বিনয় এবং ভবনের চেয়ে তার অন্তর্নিহিত আত্মাকেই বেশি মূল্য দেওয়া হতো।
হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে খোরাসান, পারস্য ও মধ্য এশিয়াজুড়ে সাধক, আলেম ও দরবেশদের ছোট ছোট সম্প্রদায় গড়ে উঠতে শুরু করে। তাঁরা একই ছাদের নিচে বসবাস করতেন, একসঙ্গে নামাজ আদায় করতেন, কোরআন তিলাওয়াত করতেন, আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন, পথিকদের আশ্রয় দিতেন এবং নিজেদের অহংকার ও নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেন। ক্রমে এই সাধারণ কেন্দ্রগুলোই খানকাহ নামে পরিচিতি লাভ করে।
ফারসি ভাষায় ‘খানাহ’ অর্থ ‘বাড়ি’ এবং ‘গাহ’ অর্থ ‘স্থান’। কিন্তু ‘খানকাহ’ শুধু একটি বাড়িকে বোঝাত না; এটি ছিল এমন এক আশ্রয়, যেখানে মানুষের জীবন বদলে যেত। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন, আপনি আজ থেকে আটশো বছর আগে একটি খানকাহয় প্রবেশ করেছেন। ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে মাত্র। উঠোনজুড়ে নেমে এসেছে প্রশান্ত নীরবতা। কয়েকটি তেলের প্রদীপ এখনো ক্ষীণ আলোয় জ্বলছে। এক কোণে এক তরুণ কোরআন মুখস্থ করছে, অন্য কোণে এক বৃদ্ধ দরবেশ গভীর ধ্যানে নিমগ্ন। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে সদ্য বেক করা রুটির উষ্ণ সুবাস।
এমন সময় এক ক্লান্ত পথিক ধুলো-মাখা জুতো খুলে ভেতরে ঢুকলেন। কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করল না তিনি কোথা থেকে এসেছেন, তাঁর ধর্ম কী, ভাষা কী কিংবা সামাজিক পরিচয় কী। বরং একজন হাসিমুখে বললেন, “স্বাগতম। আগে চলুন, কিছু খেয়ে নিন।” এটাই ছিল একটি প্রকৃত খানকাহ।
আজকের ভাষায় বলতে গেলে, খানকাহ ছিল একই সঙ্গে একটি আধ্যাত্মিক অবকাশকেন্দ্র, বিদ্যালয়, গণরান্নাঘর, অতিথিশালা, গ্রন্থাগার, পরামর্শকেন্দ্র এবং সর্বোপরি এমন একটি স্থান, যেখানে অহংকার, হিংসা, লোভ ও স্বার্থপরতার মতো হৃদয়ের রোগের চিকিৎসা করা হতো।
একজন মুর্শিদ তাঁর মুরিদদের শুধু জিকির বা ওয়াজিফা দিতেন না; তিনি তাঁদের চরিত্র গড়ে তুলতেন। কোনো ধনী ব্যক্তি যদি অহংকার নিয়ে আসতেন, তবে তাঁকে গরিবদের পাশে বসে একসঙ্গে খেতে বলা হতো। কোনো আলেম যদি নিজের জ্ঞানের গর্বে ভুগতেন, তবে তাঁকে সবার জন্য রুটি বানানোর কাজে পাঠানো হতো।
খানকাহর প্রথম শিক্ষা ছিল অত্যন্ত সহজ, আল্লাহর সামনে সব মানুষ সমান। ভারতীয় উপমহাদেশে যখন মহান সুফি সাধকেরা আগমন করেন, তখন তাঁরা কেবল একটি নতুন ধর্মের প্রচারক হিসেবে আসেননি। তাঁরা এসেছিলেন একটি সভ্যতার নির্মাতা হিসেবে।
লাহোরের দাতা গঞ্জ বখশ, আজমেরের খাজা মইনুদ্দিন চিশতি, দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়া, মুলতানের বাহাউদ্দিন জাকারিয়া এবং গুলবার্গার বান্দা নওয়াজ গেসু দরাজ, তাঁরা এমন সব খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার দরজা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ইসলাম প্রচারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এগুলো উপমহাদেশের যৌথ সংস্কৃতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এখানেই ফারসি ভাষার সঙ্গে স্থানীয় ভাষার মেলবন্ধন ঘটেছিল, সাহিত্য বিকশিত হয়েছিল, সঙ্গীত নতুন এক আধ্যাত্মিক রূপ লাভ করেছিল এবং আমির খসরুর মতো কবিরা তাঁদের মুর্শিদের সান্নিধ্যে ভক্তিকে কালজয়ী শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন।
এ কথা বলা হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, মাদ্রাসা যেখানে মূলত আলেম তৈরি করত, সেখানে খানকাহর লক্ষ্য ছিল প্রকৃত মানুষ তৈরি করা। কিন্তু ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না। প্রতিটি জীবন্ত ঐতিহ্যই একসময় নানা পরীক্ষার মুখোমুখি হয়।
যখন মহান সুফি সাধকেরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের সমাধিগুলো ভালোবাসা ও স্মরণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মানুষ সেখানে ফিরে আসত নতুন শিক্ষা লাভের জন্য নয়, বরং তাঁদের জীবনকে স্মরণ করতে, তাঁদের জন্য দোয়া করতে এবং তাঁরা যে মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করতেন, তার সঙ্গে নিজেদের আবার যুক্ত করতে।
এটি ছিল একেবারেই স্বাভাবিক এক বিবর্তন। ক্রমে খানকাহর সঙ্গে দরগাহের পরিচয় একাকার হয়ে যেতে শুরু করে, অর্থাৎ সেই মাজার, যা কোনো আউলিয়ার সমাধিকে ঘিরে নির্মিত হয়। শুরুতে এ দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। খানকাহ ছিল জীবিত মুর্শিদের শিক্ষাকেন্দ্র, আর দরগাহ হয়ে উঠেছিল তাঁর উত্তরাধিকার ও আদর্শকে স্মরণ করার স্থান।
কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে যেতে যেতে কিছু স্থানে উদ্দেশ্যের পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। যেখানে একসময় সবার জন্য বৈষম্যহীনভাবে লঙ্গরের বিশাল হাঁড়িতে খাবার রান্না হতো, সেখানে ধীরে ধীরে দানের হিসাব-নিকাশ বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। যেখানে মুর্শিদরা তাঁদের মুরিদদের অহংকার জয় করতে শেখাতেন, সেখানে কখনো কখনো ব্যক্তিপূজার প্রবণতা শিকড় গেড়ে বসে। চাদর, ফুল, পবিত্র সুতো কিংবা রেজিস্টারে নাম লেখানোর মতো প্রতীকগুলো, যেগুলো একসময় হয়তো ভক্তির বহিঃপ্রকাশ ছিল, কিছু কিছু দরগাহে ধীরে ধীরে বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সুসংগঠিত অর্থনীতির অংশে পরিণত হয়। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, বাবা কাসিম শাহকে গ্রেপ্তার করে শক্তিশালী চুনার দুর্গে বন্দি রাখা হয়েছিল। তাঁর হাত-পায়ে ভারী লোহার শিকল পরিয়ে দেওয়া হয় এবং দিনরাত পাহারা বসানো হয়।
কিন্তু এখানেই গল্পটি এক অসাধারণ মোড় নেয়। চুনারের প্রবীণদের বর্ণনায় জানা যায়, যখনই আজানের ধ্বনি ভেসে আসত, রহস্যজনকভাবে তাঁর শিকলগুলো খুলে যেত। বাবা কাসিম শাহ নীরবে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে প্রশান্ত মনে নামাজ আদায় করতেন, তারপর আবার নিজেই কারাগারে ফিরে যেতেন। নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিকলগুলো আবার আগের মতো তাঁর হাত-পায়ে আটকে যেত, যেন কিছুই ঘটেনি।
এই বিস্ময়কর ঘটনার কথা শেষ পর্যন্ত সম্রাট জাহাঙ্গীরের কানে পৌঁছায়। কৌতূহলী এবং হয়তো কিছুটা নম্র হয়ে তিনি নিজেই ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করতে আসেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তিনি যা অলৌকিক ঘটনা বলে বিশ্বাস করেছিলেন তা দেখে নিজের আচরণের জন্য অনুতপ্ত হন, বাবা কাসিম শাহের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং তাঁর জন্য একটি খানকাহ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জমি দান করেন।
এই ঘটনার প্রতিটি বিবরণ ইতিহাসসম্মতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই কাহিনি টিকে আছে অলৌকিক ঘটনার জন্য নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত সত্যের জন্য। এর বার্তা চিরন্তন, রাজনৈতিক ক্ষমতা বহুবার নৈতিক কর্তৃত্বকে ভয় পেয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই নৈতিক শক্তির সামনেই একসময় মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার খানকাহগুলোর ইতিহাস এমন অসংখ্য কাহিনিতে সমৃদ্ধ। কিছু ইতিহাসের দলিলে লিপিবদ্ধ, আবার কিছু সাধারণ মানুষের সম্মিলিত স্মৃতিতে বেঁচে আছে। উৎস যাই হোক না কেন, সব কাহিনিই একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে, খানকাহ কখনোই কেবল একটি উপাসনালয় ছিল না; এটি ছিল সমাজের স্পন্দিত হৃদয়।
প্রতীকী ছবি
আজ যদি আপনি গুলবার্গা, আজমের, দিল্লি, কালিয়ার কিংবা খুলদাবাদের খানকাহ ও দরগাহগুলো ঘুরে দেখেন, তবে পাশাপাশি অস্তিত্বশীল দুটি ভিন্ন জগতের মুখোমুখি হবেন। একটি জগৎ বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের। সেখানে আজও লঙ্গরে ক্ষুধার্তদের আহার পরিবেশন করা হয়। পথিকেরা এখনো আশ্রয় পান। কোরআনের তিলাওয়াত আজও ধ্বনিত হয়। অসংখ্য মানুষ এখনো সেখানে শান্তির খোঁজে আসেন, প্রদর্শনীর জন্য নয়। অন্য জগৎটি আধুনিক সময়ের।
পর্যটন, বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ধর্মকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতি, সব মিলিয়ে কিছু পবিত্র স্থানের পরিবেশকে বদলে দিয়েছে। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন সেখানে মানুষের ভিড় অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় ভক্তি এবং বাণিজ্যিক কার্যকলাপ পাশাপাশি অবস্থান করছে।
এই দুই ছবির কোনোটিই একা সম্পূর্ণ সত্যকে তুলে ধরে না। উভয় দিককে না দেখলে আমরা অতীতকেও বুঝতে পারি না, বর্তমানকেও নয়। তাই হয়তো প্রকৃত প্রশ্নটি এই নয় যে খানকাহ বদলে গেছে কি না; প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আমরা কি এর মূল চেতনাকে রক্ষা করতে পেরেছি?
খানকাহ কখনোই শুধু ইট, গম্বুজ কিংবা প্রাঙ্গণ দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয়নি; এটি ছিল একটি দৃষ্টিভঙ্গি, একটি সভ্যতা। এমন এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হতো না তার সম্পদ, বংশপরিচয়, পোশাক কিংবা খ্যাতি দিয়ে; বরং বিনয়, সহমর্মিতা ও চরিত্র দিয়ে। এর উদ্দেশ্য কেবল ধর্মীয় আলেম তৈরি করা ছিল না; এর উদ্দেশ্য ছিল উত্তম মানুষ তৈরি করা।
একজন মুর্শিদ বই পড়ানোর আগে চরিত্র গঠন করতেন। তাঁর শিষ্যরা শিখতেন, বিনয়হীন জ্ঞান বোঝা হয়ে দাঁড়ায়; সেবাহীন ইবাদত অসম্পূর্ণ থেকে যায়; আর যে আধ্যাত্মিকতা মানুষকে মানবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তা ইতোমধ্যেই নিজের আত্মাকে হারিয়ে ফেলেছে। তবু সময়ের প্রবাহে এই প্রতিষ্ঠানও পরিবর্তিত হয়েছে।
অনেক খানকাহ আজও শিক্ষা, দান-খয়রাত ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনার প্রাণবন্ত কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। তবে কিছু খানকাহ ধীরে ধীরে ভিন্ন এক ভূমিকাও গ্রহণ করেছে। তাদের আধ্যাত্মিক প্রভাব সামাজিক প্রভাবে রূপ নিয়েছে, আর সেই সামাজিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবেও পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় নির্বাচনের সময় রাজনীতিবিদদের প্রায়ই বিখ্যাত আধ্যাত্মিক নেতাদের কাছে যেতে দেখা যায়। তাঁরা শুধু আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে যান না; তাঁরা এটাও উপলব্ধি করেন যে, একজন সম্মানিত মুর্শিদের সমর্থন কিংবা শুভেচ্ছা হাজার হাজার অনুসারীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই অর্থে কিছু খানকাহ নৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্র থেকে এমন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যা রাজনৈতিক ভাগ্যও নির্ধারণ করতে সক্ষম। এই বাস্তবতার কথা বলা প্রতিষ্ঠানটিকে ছোট করা নয়; বরং এটাই স্বীকার করা যে, দীর্ঘস্থায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই একসময় ক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। আর ইতিহাস আমাদের শেখায়, ক্ষমতা সর্বদাই তার ছাপ রেখে যায়।
ইবাদতের উদ্দেশ্য কখনোই শুধু নামাজের সংখ্যা বাড়ানো ছিল না; এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষের হৃদয়কে কোমল করা। লঙ্গরের লক্ষ্যও কেবল ক্ষুধার্তকে আহার করানো নয়; বরং মনে করিয়ে দেওয়া যে, মানুষের মর্যাদা শুরু হয় সেই জায়গা থেকে, যেখানে সব ভেদাভেদ শেষ হয়ে যায়।
সম্ভবত এ কারণেই আজকের এই পৃথিবীতে, যেখানে যোগাযোগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি, অথচ বিভাজনও গভীরতর, আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন খানকাহর সেই চেতনাকে। হয়তো ভবন হিসেবে নয়, বরং একটি ধারণা হিসেবে। এমন একটি স্থান, যেখানে জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে বিনয়, ঈমানের সঙ্গে থাকবে সহমর্মিতা এবং সেবার সঙ্গে থাকবে আন্তরিকতা।
প্রকৃত ক্ষতি এই নয় যে সময়ের সঙ্গে অনেক খানকাহ বদলে গেছে। প্রকৃত ক্ষতি হলো, তাদের দেয়াল রক্ষা করতে গিয়ে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ভুলে গেছি সেই মূল্যবোধগুলোকে, যেগুলোর ওপর তাদের ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য কখনোই অন্ধ অনুসারী তৈরি করা ছিল না; বরং চিন্তাশীল, সহানুভূতিশীল এবং মানবিক মানুষ গড়ে তোলা ছিল।
এই কারণেই খানকাহর উত্তরাধিকার বহু রাজ্য ও সাম্রাজ্যের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে, শাসকদের নাম বিস্মৃত হয়েছে, কিন্তু এর নীরব শিক্ষাগুলো আজও বেঁচে আছে, প্রশ্ন না করেই মানুষকে স্বাগত জানানো, প্রতিদানের আশা না করে সেবা করা এবং ক্ষমতার লোভ ছাড়াই নেতৃত্ব দেওয়া। হয়তো খানকাহ কখনোই কেবল একটি স্থান ছিল না। এটি ছিল, এবং আজও রয়েছে, মানুষ হয়ে ওঠার এক অনন্য পথ।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি। এটি প্রতিটি খানকাহ বা প্রতিটি দরগাহর গল্প নয়। আজও বহু খানকাহ নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের মূল চেতনাকে ধারণ করে আছে। অল্প কয়েকটির সীমাবদ্ধতার ভিত্তিতে সব আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠানকে বিচার করা ইতিহাসের প্রতিই অবিচার হবে।
প্রাচীন জনপদ চুনারে আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে একটি পুরোনো কাহিনি বলা হয়। লোকমুখে প্রচলিত আছে, মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাবা কাসিম শাহ সুলেমানির আধ্যাত্মিক প্রভাব এতটাই বিস্তৃত হয়ে উঠেছিল যে তা সম্রাটের দরবারকে অস্বস্তিতে ফেলে। জাহাঙ্গীর আশঙ্কা করেছিলেন, এই নৈতিক কর্তৃত্ব একদিন রাজনৈতিক প্রভাবেও রূপ নিতে পারে।