ফরহান ইসরাইলি | জয়পুর
আজ জয়পুরের আদালতগুলিতে নারী আইনজীবীদের উপস্থিতি স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু প্রায় দুই দশক আগে এই চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন আইন পেশায় নারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম, আর মুসলিম নারী আইনজীবীদের দেখা মিলত আরও কম। সেই সময়ই সমস্ত বাধা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে উপেক্ষা করে আইনজীবী হিসেবে নিজের পথচলা শুরু করেছিলেন নিগার সুলতানা। শুরুর দিনগুলোতে মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি ও কখনও কখনও কটাক্ষের মুখোমুখি হলেও তিনি সেগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের কাজের প্রতি অটল ছিলেন। ধীরে ধীরে নিজের নিষ্ঠা ও দক্ষতার জোরে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং বর্তমানে বিশেষ করে নারী-সংক্রান্ত মামলায় জয়পুরের অন্যতম বিশ্বস্ত আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন।
নিগার সুলতানার কাছে আদালতের পরিবেশ কখনও অপরিচিত ছিল না। তাঁর বাবা সুলতান মোহাম্মদ নাসির ছিলেন জয়পুরের একজন সুপরিচিত আইনজীবী। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার সঙ্গে আদালতে যেতেন এবং খুব কাছ থেকে আইন পেশাকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। নিগার বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমরা আদালত দেখেছি। আমার বাবা শুধু মামলা লড়তেন না, প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। মানুষ তাঁর ওপর আস্থা রাখত, আর সেটাই আমাকে এই পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত করেছে।”
নিগার সুলতানা
পরিবারে ধর্মীয় শিক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হতো। সেই কারণে কিছুদিনের জন্য তাঁকে আজমগড়ে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি আলিমা কোর্স সম্পন্ন করেন। পরে তিনি জয়পুরে ফিরে এসে পড়াশোনা চালিয়ে যান। জয়পুরের মহারানি কলেজে ভর্তি হওয়াই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নিগার বলেন, “সেখানেই আমি বাইরের পৃথিবীকে নতুনভাবে চিনতে শিখি। তখনই ঠিক করি, বাবার মতো আমিও আইন পড়ব এবং মানুষের সেবা করব।”
২০০৫ সালে রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ডিগ্রি অর্জন এবং ২০০৬ সালে রাজস্থান বার কাউন্সিলে নিবন্ধনের পর তিনি জয়পুরের আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই সময় জয়পুরের আদালতগুলিতে নারী আইনজীবীর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “তখন সাঙ্গানের আদালতে আমিই একমাত্র মেয়ে ছিলাম। বিষয়টি নিয়ে খুব একটা ভাবিনি। আমার বাবা আদালতে অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন, তাই কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলত না। তবে মানুষের দৃষ্টি আর মাঝে মাঝে হাসির শব্দ শুনতে পেতাম।” নতুন পরিবেশ হলেও ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে মানিয়ে নেন এবং কাজের প্রতি মনোনিবেশ করেন।
ধীরে ধীরে নিগার নিজেকে শুধু একটি আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। জয়পুরের সাঙ্গানের আদালত, সেশনস কোর্ট এবং হাইকোর্টে কাজ করার সুযোগ পান, যা তাঁর অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। পেশার শুরুতেই তিনি নিজের কাজের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন। নিগার বলেন, “আমার বাবা আমাকে অপরাধমূলক মামলার চর্চা না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাই আমি দেওয়ানি ও রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলায় মনোযোগ দিই।” বর্তমানে এই ক্ষেত্রে তাঁর প্রায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন, বিশেষ করে আদালতের পরিবেশে অনেক নারী নিজেদের সমস্যার কথা খোলাখুলি বলতে সংকোচ বোধ করেন। নিগার বলেন, “নারীরা অনেক সময় পুরুষদের সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। তখনই ভাবলাম, তাঁদের মামলাগুলো আমাকেই নেওয়া উচিত।” ধীরে ধীরে বৈবাহিক বিরোধ-সংক্রান্ত মামলাও তাঁর কাজের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে ওঠে এবং আজ তিনি জয়পুরজুড়ে এই ক্ষেত্রে সুপরিচিত। মুসলিম আইনজীবীদের প্রসঙ্গে নিগারের মত, বর্তমানে জয়পুরে পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। তিনি বলেন, “এখন মুসলিম ছেলে-মেয়েরা এই পেশায় আসছে এবং খুব ভালো কাজ করছে।”
নিগার সুলতানা কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে
নিগারের কাজ কখনও শুধুমাত্র আদালতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কলেজজীবন থেকেই তিনি সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেছেন, যেখানে শিশুদের শিক্ষার পাশাপাশি তাঁদের মায়েদের স্বনির্ভর হওয়ার জন্যও উৎসাহিত করা হতো।
২০০১ সালে সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'পহল এডুকেশন অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি'। এই উদ্যোগের অধীনে জয়পুরের সাঙ্গানের এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় 'লিটল ফ্লাওয়ার অ্যাকাডেমি'। বর্তমানে সেখানে ৫০০-রও বেশি শিশু পড়াশোনা করছে। এলাকায় স্কুলটি একটি সুনাম অর্জন করেছে। আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের শিশুদের কম খরচে শিক্ষা দেওয়া হয় এবং যেসব শিশু সম্পূর্ণ অসচ্ছল, তাঁদের পড়াশোনার ব্যয় জাকাত ও সমাজসেবীদের অনুদানের মাধ্যমে বহন করা হয়।
নিগার সুলতানা স্নাতকোত্তর, বি.এড., এলএল.বি. এবং শ্রম আইন বিষয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছেন। বিয়ের পরও তিনি নিজের কাজ অব্যাহত রেখেছেন। তিনি বলেন, “আমার স্বামী ওয়াসিম আখতার সবসময় আমাকে সমর্থন করেছেন। আইনচর্চা, শিক্ষা বা সমাজসেবা, কোনও ক্ষেত্রেই তিনি আমাকে কখনও বাধা দেননি।”
বর্তমানে তিনি তাঁর বড় ভাই অ্যাডভোকেট জাভেদ আখতারের সঙ্গে আদালতে আইনচর্চা করেন। দুই ভাইবোন মিলে তাঁদের বাবার উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। নিগার সুলতানা একজন স্টেট নোটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন। এছাড়াও তিনি সাঙ্গানের বার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
নিগার সুলতানা কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে
আইন পেশায় আসতে আগ্রহীদের উদ্দেশে নিগারের বিশ্বাস, আরও বেশি নারী যদি এই পেশায় আসেন, তাহলে তার ইতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়বে। তিনি বলেন, “একজন মেয়ে যদি আইন পড়ে, তাহলে সে নিজের অধিকার যেমন রক্ষা করতে পারবে, তেমনি অন্যের অধিকার রক্ষার জন্যও লড়তে পারবে।”
নিগারের মতে, আইনজীবী হওয়া মানে শুধু কথা বলা নয়, বরং মন দিয়ে শোনার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “ভালো শ্রোতা হওয়া খুবই জরুরি। তবেই একটি মামলাকে সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব।” শেষে তিনি বলেন, “একটা সময় ছিল, যখন আমি একাই ছিলাম। আজ একই আদালতে অনেক মেয়ে আইনচর্চা করছে। এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।”