নয়াদিল্লি
জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালকে ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ 'লোকমান্য তিলক পুরস্কার' প্রদান করা হয়েছে। পুনের গুলটেকড়ি এলাকায় মহারাষ্ট্রীয় মণ্ডল ক্রীড়াঙ্গনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেন। দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে এ বছরের এই সম্মানে ভূষিত করা হয়।
তিলক মেমোরিয়াল ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষেত্রে অসামান্য সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ অজিত ডোভালকে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
৮১ বছর বয়সি অজিত ডোভাল মিজোরাম, সিকিম, পাঞ্জাব এবং জম্মু-কাশ্মীরের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি ইসলামাবাদ ও লন্ডনে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসেও কূটনৈতিক দায়িত্ব সামলেছেন। তিনি ভারতের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। ভারত-চীন সীমান্ত সংক্রান্ত আলোচনায় তিনি বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ডোকলাম সংকটের সমাধানে তাঁর কূটনৈতিক ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
১৯৮৩ সালে প্রবর্তিত লোকমান্য তিলক জাতীয় পুরস্কার প্রতি বছর ১ আগস্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশ গঠন ও জাতীয় উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রদান করা হয়। এই পুরস্কারের প্রথম প্রাপক ছিলেন সমাজবাদী নেতা এস. এম. যোশী।
পুরস্কার গ্রহণ করে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অজিত ডোভাল পুনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নিজের শৈশবের বহু স্মৃতি ভাগ করে নেন। তিনি বলেন, "পুনের সঙ্গে আমার একটি ছোট কিন্তু গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ৭৬ বছর আগে, আমার বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন আমি এই শহরে এসেছিলাম। হয়তো আজকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত খুব কম মানুষই সেই সময়ের পুনেকে দেখেছেন।"
তিনি আরও বলেন, "আমি যখন এখানে এসেছিলাম, তখন আমার প্রাথমিক শিক্ষাও এখান থেকেই শুরু হয়। প্রায় দেড় বছর পুনেতে ছিলাম। এরপর বাবা দিল্লির সেনা সদর দফতরে বদলি হয়ে যান। সেই সময়ের অনেক কিছুই আজ আর মনে নেই, তবে দুটি স্মৃতি এখনও একেবারে সতেজ। প্রথম স্মৃতিটি হলো, প্রতি মঙ্গলবার মা আমাকে চতুরশৃঙ্গী মন্দিরে নিয়ে যেতেন। সেখানে অন্যান্য নৈবেদ্যের সঙ্গে দেবীকে প্রসাদ হিসেবে একটি মোটা ও মিষ্টি রুটি নিবেদন করা হতো। বাড়ি ফিরে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে সেই প্রসাদ খেতাম। এই মন্দিরের প্রতি আমার মায়ের গভীর ভক্তি ছিল।"
তিনি বলেন, "প্রতিদিন প্রার্থনার পর বিদ্যালয়ে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো, যেখানে প্রবীণ শিক্ষকরা নৈতিক শিক্ষা, মহাপুরুষদের জীবন এবং শিক্ষার্থীদের কর্তব্যসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট বক্তব্য রাখতেন। একদিন আমাদের হিন্দি শিক্ষক লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের জীবন ও আদর্শ নিয়ে বক্তব্য দেন। তখনই, প্রায় পাঁচ বছর বয়সে, আমি প্রথমবার লোকমান্য তিলকের সম্পর্কে জানতে পারি। সেদিন থেকেই তাঁর জীবন এবং পুনের সঙ্গে জড়িত ইতিহাসের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মায়। আমি কখনও কল্পনাও করিনি যে ৭৬ বছর পরে একই শহরে ফিরে এসে তাঁর স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত এই সম্মান লাভ করার সৌভাগ্য আমার হবে। এই সম্মান আমার কাছে এক বিশেষ সৌভাগ্য।"
লোকমান্য তিলক জাতীয় পুরস্কার পেলেন অজিত ডোভাল
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকমান্য তিলক এবং লোকশাহির আন্না ভাউ সাঠের অবদান স্মরণ করেন। পাশাপাশি তিনি অজিত ডোভালের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। অমিত শাহ বলেন, "গুজরাটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন সময় থেকেই আমি অজিত ডোভালকে চিনি। তিনি একজন জন্মগত দেশপ্রেমিক।"
প্রায় ৪৫ মিনিটের বক্তব্যে অমিত শাহ বলেন, "২০১৪ সালে কেন্দ্রে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির অন্যতম ছিল অজিত ডোভালকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা। এই সিদ্ধান্তই ডোভালের প্রতি সরকারের আস্থা এবং তাঁর কর্মদক্ষতার প্রমাণ বহন করে।"
তিনি আরও বলেন, "আপনারা যেভাবে তাঁকে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করে গর্ব অনুভব করেছেন, ঠিক সেভাবেই তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দিতে পেরে আমিও সমানভাবে আনন্দিত।" অমিত শাহ অজিত ডোভালের দীর্ঘায়ু কামনা করে তাঁকে শতায়ু হওয়ার শুভেচ্ছা জানান।
এদিকে, পুনে সফরের সময় অমিত শাহ প্রখ্যাত মারাঠি কবি ও সমাজ সংস্কারক লোকশাহির আন্না ভাউ সাঠের জন্মবার্ষিকীতেও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সরসবাগ এলাকায় অবস্থিত আন্না ভাউ সাঠের মূর্তিতে তিনি পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। ১৯২০ সালের ১ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী আন্না ভাউ সাঠেকে একজন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক, গণকবি এবং মহারাষ্ট্রের দলিত সাহিত্যের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়।
লোকমান্য তিলক কে ছিলেন?
লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী নেতা, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ এবং প্রখর জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ। ১৮৫৬ সালের ২৩ জুলাই মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরিতে তাঁর জন্ম হয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করেছিলেন এবং দেশবাসীর মধ্যে স্বরাজের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত আহ্বান ছিল, "স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার, এবং আমি তা অর্জন করবই।" আজও এই উক্তি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক স্লোগান হিসেবে স্মরণ করা হয়।
সাংবাদিক হিসেবেও লোকমান্য তিলকের অবদান অনন্য। তিনি ‘কেশরী’ (মারাঠি) এবং ‘মারাঠা’ (ইংরেজি) নামে দুটি সংবাদপত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং দেশবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবাদের বার্তা ছড়িয়ে দেন।
লোকমান্য তিলক পুরস্কারের সূচনা কবে হয়েছিল?
১৯৮৩ সালে পুনে-স্থিত তিলক স্মারক ট্রাস্ট এই পুরস্কারের প্রবর্তন করে। লোকমান্য তিলকের আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং দেশ ও সমাজের প্রতি অসাধারণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মানিত করাই এই পুরস্কারের মূল উদ্দেশ্য। প্রতি বছর ১ আগস্ট, অর্থাৎ লোকমান্য তিলকের মৃত্যুবার্ষিকীর দিন এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারের সঙ্গে একটি মানপত্র, স্মারক এবং নগদ অর্থও প্রদান করা হয়।
কীসের ভিত্তিতে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়?
লোকমান্য তিলক পুরস্কার কোনও একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র, সামাজিক অগ্রগতি, জাতীয় ঐক্য, বিজ্ঞান, শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, প্রশাসন অথবা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। পুরস্কার নির্বাচনের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদি অবদান, জনজীবনে তাঁর ভূমিকা এবং জাতীয় স্বার্থে তাঁর কাজকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পূর্বে এই পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা
গত চার দশকে দেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
এস. এম. যোশী-- প্রথম পুরস্কারপ্রাপক (১৯৮৩)
অটল বিহারী বাজপেয়ী-- প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী
ড. মনমোহন সিং-- প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও অর্থনীতিবিদ
নরেন্দ্র মোদি-- প্রধানমন্ত্রী
সোনিয়া গান্ধী-- কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেত্রী
প্রণব মুখার্জি-- প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি
শরদ পাওয়ার-- প্রবীণ রাজনীতিবিদ
ড. রঘুনাথ মাসেলকর-- প্রখ্যাত বিজ্ঞানী
ড. বিজয় ভাটকর-- সুপার কম্পিউটার ‘পরম’-এর জনক
এন. আর. নারায়ণ মূর্তি-- ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা
সাইরাস পুনাওয়ালা-- শিল্পপতি
ড. ই. শ্রীধরন-- ‘মেট্রো ম্যান’ নামে পরিচিত প্রকৌশলী
অজিত ডোভাল-- জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (২০২৬)
এছাড়াও বহু শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, শিল্পপতি, সমাজসেবী এবং জনজীবনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
এই পুরস্কারের গুরুত্ব
লোকমান্য তিলক পুরস্কার শুধু একটি সম্মান নয়; এটি দেশ গঠনে অসামান্য ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিদের প্রতি সমাজের কৃতজ্ঞতার প্রতীক। এই পুরস্কার লোকমান্য তিলকের জীবনের মূল আদর্শ, স্বরাজ, জাতীয়তাবাদ, শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং জনঅংশগ্রহণ, আজও নতুন প্রজন্মের সামনে স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রতি বছর এই সম্মানের মাধ্যমে নিজ নিজ ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট কাজের মাধ্যমে দেশের মর্যাদা ও উন্নয়নকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বীকৃতি জানানো হয়। ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক সম্মান হিসেবে বিবেচিত লোকমান্য তিলক পুরস্কার জাতীয় স্বার্থে অসাধারণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের উৎসাহিত ও সম্মানিত করার এক গৌরবময় ঐতিহ্য বহন করে।
২০২৬ সালে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালকে এই পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছে, যা এই বার্তাই বহন করে যে বিজ্ঞান, শিক্ষা, রাজনীতি কিংবা সমাজসেবার মতোই জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৌশলগত নেতৃত্বও একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।