AI-এর ছোঁয়ায় ভুয়ো তথ্যের বিস্তার, অনলাইন প্রতারণার নতুন অর্থনীতিতে বাড়ছে বিশ্বাসের সংকট

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 16 h ago
AI-এর ছোঁয়ায় ভুয়ো তথ্যের বিস্তার, অনলাইন প্রতারণার নতুন অর্থনীতিতে বাড়ছে বিশ্বাসের সংকট
AI-এর ছোঁয়ায় ভুয়ো তথ্যের বিস্তার, অনলাইন প্রতারণার নতুন অর্থনীতিতে বাড়ছে বিশ্বাসের সংকট
 
  রাজীব নারায়ণ 

একসময় ভুয়ো খবরকে শুধুই সামাজিক সমস্যার একটি দিক বলে মনে করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার চরিত্র বদলেছে। আজ এটি এমন এক অন্ধকার অথচ লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে, যেখানে অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মানব মনস্তত্ত্ব একসঙ্গে কাজ করে প্রতারণাকে অভূতপূর্ব মাত্রায় অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানিয়েছে। এর ফলে মিথ্যা তৈরি করা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনই তা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া এবং বাস্তব থেকে আলাদা করে চেনাও ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
 
এক সময় ছিল, যখন চোখে দেখা মানেই সত্য বলে বিশ্বাস করা হতো। একটি ছবি ছিল প্রমাণ, একটি ভিডিও ছিল সত্যতার সাক্ষ্য, আর একটি রেকর্ড করা কণ্ঠস্বর বিতর্কের অবসান ঘটাত। এখন আর তা নয়। আজ প্রতিটি ছবি বিকৃত করা সম্ভব, প্রতিটি কণ্ঠস্বর নকল করা যায়, এমনকি যেকোনো বক্তৃতাও অবিশ্বাস্য বাস্তবতার সঙ্গে তৈরি করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্য ও মিথ্যার সীমারেখাকে এমনভাবে অস্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এখন সত্যকেও যাচাই করে নিতে হয়।
 
প্রতীকী ছবি
 
যদি এই বক্তব্য অতিরঞ্জিত মনে হয়, তবে একটি বিষয় ভেবে দেখুন। দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও, ঘিরে ভুয়ো ভিডিও ও বিকৃত অডিও বারবার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। পরে অনেকগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং সেগুলি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার আগেই সেগুলি কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। এর উদ্দেশ্য সব সময় রাজনৈতিক নয়। অনেক সময় জনমত প্রভাবিত করা, আয় বৃদ্ধি করা অথবা আর্থিক প্রতারণা ও সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধের ভিত্তি তৈরি করাই এর লক্ষ্য।
 
আজকের বাস্তব চিত্র
 
এআই মিথ্যা বলার কৌশল আবিষ্কার করেনি, কিন্তু এটিকে অভূতপূর্ব মাত্রায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। বহু বছর ধরে ভুল তথ্যকে ইন্টারনেটের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হতো, কোথাও একটি গুজব, কোথাও একটি বিকৃত ছবি, আবার কোথাও ক্লিক বাড়ানোর জন্য অতিরঞ্জিত শিরোনাম। এগুলি বিরক্তিকর ও বিপজ্জনক হলেও, সেগুলিকে মূলত দায়িত্বজ্ঞানহীন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের কাজ বলেই মনে করা হতো। এখন সেই ধারণা আর সত্য নয়।
 
ভুল তথ্য এখন আর শুধু ছড়িয়ে পড়ছে না, তা পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হচ্ছে। এটি এখন একটি সুসংগঠিত ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যেখানে রয়েছে নির্মাতা, পরিবেশক, প্রযুক্তি সরবরাহকারী, আয়ের মডেল এবং ভোক্তা। এমন এক সময়ে, যখন মানুষের মনোযোগই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, তখন প্রতারণা নিজেই একটি ব্যবসা হয়ে উঠেছে। ফলে সত্যকে এখন প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে এমন এক শিল্পের সঙ্গে, যার মুনাফার ভিত্তিই হলো মিথ্যা।
 
সমস্যার ব্যাপ্তি বিশাল। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ‘মিসইনফরমেশন’ ও ‘ডিসইনফরমেশন’-কে বিশ্বের অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের মতে, এআই-নির্ভর কনটেন্ট সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা আরও কঠিন করে তুলছে। অন্যদিকে, এফবিআই জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ইন্টারনেটভিত্তিক অপরাধে বিশ্বজুড়ে ক্ষতির পরিমাণ ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। পরিচয় জালিয়াতি, ফিশিং এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রতারণাই ছিল এর প্রধান কারণ।
 
প্রতীকী ছবি
 
ভারতও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চমূল্যের সাইবার প্রতারণার ঘটনাও বেড়েছে। এআই-নির্ভর পরিচয় জালিয়াতি, ভুয়ো পরিচয় এবং সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে এই অপরাধগুলি সংঘটিত হচ্ছে। এক সময় যাকে ‘ভুয়ো খবর’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো, তা আজ বাস্তব আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠা একটি অপরাধভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে।
 
লাভজনক ব্যবসা
 
প্রতিটি শিল্পই টিকে থাকে, কারণ সেখানে কেউ না কেউ লাভ করে। ভুল তথ্যের ব্যবসাও তার ব্যতিক্রম নয়। ভুয়ো পোস্টে উসকানিমূলক বিষয়বস্তু থাকে, কারণ ক্ষোভ ও উত্তেজনা বেশি মনোযোগ টানে, আর সেই মনোযোগ থেকেই আয় হয়। অসাধু তহবিল ব্যবস্থাপকরা ভুয়ো বাজার-সুযোগ তৈরি করেন, কারণ মানুষের লোভ তাদের কাছে লাভের উৎস। রাজনীতিবিদরা জনমত প্রভাবিত করতে নানা ধরনের বয়ান তৈরি ও বিকৃত করেন। আবার বহু ওয়েবসাইট শুধুমাত্র বেশি ভিউ ও বিজ্ঞাপনের আয়ের জন্য ভুয়ো খবর প্রকাশ করে।
 
ইন্টারনেট এমন একটি বাজার তৈরি করেছে, যেখানে মানুষের মনোযোগই সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য। সেই মনোযোগ সত্য থেকে এল নাকি মিথ্যা থেকে, তা নিয়ে যারা লাভ করছে তাদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। এই পরিবেশে নির্ভুলতা আর প্রধান লক্ষ্য নয়; ভাইরাল হওয়াই আসল উদ্দেশ্য।
 
এআই বদলে দিয়েছে নিয়ম
 
জেনারেটিভ এআই ভুল তথ্য তৈরির অর্থনীতি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আগে যে কাজের জন্য বিশেষ সফটওয়্যার ও দক্ষতার প্রয়োজন হতো, এখন তা কয়েক মিনিটেই সম্ভব। একটি সাধারণ টেক্সট নির্দেশ থেকেই বাস্তবসম্মত ছবি তৈরি করা যায়। কোনো রাজনীতিকের কণ্ঠস্বর প্রায় হুবহু নকল করা যায়। এমন ভিডিওও বানানো যায়, যেখানে এমন ঘটনা দেখানো হয়, যা বাস্তবে কখনও ঘটেইনি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভুয়ো সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব।
 
প্রতীকী ছবি
 
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রযুক্তিগুলি যেমন দ্রুত উন্নত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের হাতের নাগালেও চলে আসছে। ফলে বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণা তৈরি করার বাধা কার্যত উঠে গেছে। এর অর্থ, ভুল তথ্য এখন আর শুধু দুষ্টুমি করা ব্যক্তি বা সংগঠিত ট্রোল গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অল্প প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং এআই টুলস ব্যবহার করেই যে কেউ এমন কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, যা দেখতে সম্পূর্ণ বাস্তব মনে হয় এবং লক্ষ থেকে কোটি মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
 
শুধু নির্বাচন নয়
 
সাধারণভাবে ভুয়ো খবরের আলোচনা নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত হয়। তা স্বাভাবিক, কিন্তু বিষয়টি এতেই সীমাবদ্ধ নয়। ভুল তথ্য এখন আর্থিক বাজার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ব্যবসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ পরিবার, সব ক্ষেত্রকেই লক্ষ্য করছে। কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ভুয়ো বার্তা ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্কে মানুষ টাকা তুলে নিতে পারে। কোনো সংস্থার ভুয়ো ঘোষণা শেয়ারের দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
 
আবার ডিপফেক কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে বৃদ্ধ বাবা-মাকে বোঝানো হচ্ছে যে পরিবারের কোনো সদস্য জরুরি ভিত্তিতে অর্থ চেয়েছে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও এর বাইরে নয়। ভুয়ো নোটিশ, বানানো পরীক্ষার আপডেট এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে এর প্রভাব এখন আর শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও।
 
কেউই নিরাপদ নয়
 
এই সমস্যার গুরুত্ব বোঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, দেশের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরাও এর বাইরে নন। রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের নামে এআই-তৈরি ভিডিও ও বিকৃত অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেগুলি প্রশ্নের মুখে পড়া বা সরিয়ে নেওয়ার আগেই লক্ষ লক্ষ মানুষ তা দেখে ফেলেছে। বিষয়টি ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নয়; এটি জনবিশ্বাসের অবক্ষয়ের প্রশ্ন।
 
প্রতীকী ছবি
 
যদি মানুষ প্রতিটি বক্তৃতা, প্রতিটি ছবি এবং প্রতিটি সরকারি ঘোষণার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে, তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে বিশ্বাসের। গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে একটি যৌথ বাস্তবতায় মানুষের আস্থার ওপর। সেই আস্থা ভেঙে গেলে দেশ পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একই বিপদ বিচারক, সেনাবাহিনী, কর্পোরেট নেতৃত্ব এবং সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এআই-এর যুগে কয়েক মিনিটেই কারও সুনাম নষ্ট করা সম্ভব, অথচ সংশোধনমূলক তথ্য প্রায়শই অনেক দেরিতে পৌঁছায়।
 
শুধু আইন যথেষ্ট নয়
 
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই সমস্যার মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতও নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী বা যন্ত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিপুল পরিমাণ ভুয়ো তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তবে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে আইন প্রায়ই পিছিয়ে পড়ে। আইন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু শুধু আইন যথেষ্ট নয়।
 
প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে আরও কার্যকর শনাক্তকরণ ও যাচাইকরণ প্রযুক্তি তৈরি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে স্বীকার করতে হবে যে, আজকের দিনে ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’ই নতুন শিক্ষার ভিত্তি। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকে কর্মীদের এআই-নির্ভর প্রতারণা চিহ্নিত করার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সংবাদমাধ্যমেরও দ্রুত খবর প্রকাশের প্রতিযোগিতার মধ্যেও তথ্য যাচাইয়ের মান আরও শক্তিশালী করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাগরিকদের আবারও প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এমন এক সময়ে, যখন চোখে দেখা মানেই সত্য নয়, তখন তথ্য যাচাই করা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।
 
বিশ্বাস হারানোর মূল্য
 
ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধুমাত্র কয়েকটি ভুয়ো পোস্ট সরিয়ে দেওয়া বা কিছু অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সমস্যাটি আরও গভীর। এটি বাজারের সততা, প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা, আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত।
 
প্রতীকী ছবি
 
এখানে একটি বড় বৈপরীত্যও রয়েছে। ভারত প্রতি মাসে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ইউপিআই লেনদেন সম্পন্ন করে, যা দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত রিয়েল-টাইম ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার অন্যতম উদাহরণে পরিণত করেছে। যে ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবসা-বাণিজ্যকে সবার নাগালে নিয়ে এসেছে, সেটিই আবার প্রতারকদের জন্য নতুন আক্রমণের ক্ষেত্রও তৈরি করেছে। এআই-এর যুগে বিশ্বাসই সবচেয়ে মূল্যবান, এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, মুদ্রা।
 
ভুল তথ্যের আধিপত্যের মূল কারণ হলো, প্রতারণা এখন সস্তা এবং মানুষের মনোযোগ থেকে লাভ করা অত্যন্ত সহজ। যতদিন না আমরা এই সমীকরণ বদলাতে পারছি, ততদিন মিথ্যাই বাড়তি সুবিধা পাবে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এই নয় যে মানুষ প্রতিটি মিথ্যাকে বিশ্বাস করবে; বরং একদিন এমন সময় আসতে পারে, যখন মানুষ আর কোনো কিছুকেই বিশ্বাস করবে না।
 
(লেখক একজন প্রবীণ সাংবাদিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।)