ফারহান ইসরাইলি
গত ৩২ বছর ধরে জয়পুরের ব্যস্ত জোহরি বাজারের একটি সাধারণ অফিস অসংখ্য নারীর কাছে আশ্রয় ও আস্থার ঠিকানা হয়ে উঠেছে। গার্হস্থ্য হিংসা, বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য কলহ, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে কিংবা পারিবারিক বিরোধের মতো নানা সমস্যার সমাধানের আশায় প্রতিদিন সেখানে ভিড় জমান বহু নারী। যাঁদের অনেকেই ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক নিয়ে শেষ আশা নিয়েই আসেন। আর সেই অফিস থেকেই সমাজকর্মী ও কাউন্সেলর নিশাত হুসেন গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে হাজার হাজার পরিবারকে নতুন করে বাঁচার পথ দেখিয়ে চলেছেন।
এই কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সমাজকর্মী ও কাউন্সেলর নিশাত হুসেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নারীদের সহায়তা, পারিবারিক বিরোধ মীমাংসা, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সংস্কারের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।
রাজস্থানের করৌলি জেলার সীতাবাড়ি মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন নিশাত হুসেন। তিনটি হিন্দু মন্দিরের মাঝখানে তাঁদের পরিবারই ছিল একমাত্র মুসলিম পরিবার। এই পরিবেশই ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বোধ গড়ে তোলে। শৈশবের কথা স্মরণ করতে গিয়ে নিশাত প্রায়ই বলেন, তখন ধর্ম কখনও বিভেদের কারণ ছিল না। শিশুরা একসঙ্গে খেলত, কেউ কারও ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলত না, আর প্রতিবেশীরা একে অপরের পরিবারের মতোই বাস করতেন।
যে সময়ে তাঁর এলাকায় মেয়েদের পড়াশোনা করা খুবই বিরল ছিল, সেই সময় সামাজিক বাধাকে অগ্রাহ্য করে নিশাত নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যান। তিনি করৌলি জেলার প্রথম মুসলিম মেয়ে হিসেবে মাধ্যমিক (দশম শ্রেণি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাঁর স্কুলের প্রায় ১,২০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র মুসলিম ছাত্রী। তাঁর বাবা, যিনি করৌলি রাজপরিবারের প্রধান দর্জি ছিলেন, সবসময় তাঁর শিক্ষার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। সেই সমর্থনই পরবর্তীকালে তাঁর সমাজসেবার ভিত্তি গড়ে দেয়।
প্রগতিশীল মনোভাবের সরকারি গেজেটেড অফিসার মোহাম্মদ হুসেনকে বিয়ের পর নিশাত তাঁর স্বপ্নপূরণে অটুট সমর্থন পান। স্বামীর উৎসাহে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিশাত অ্যাকাডেমি, যেখানে প্রায় ৩৫০ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে শিক্ষা দেওয়া হতো। তাঁদের অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের সন্তান ছিল। ১৯৮৯ সালের জয়পুর দাঙ্গা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সাম্প্রদায়িক হিংসার সময় স্কুলটি আক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হলেও অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা একজোট হয়ে স্কুলটিকে রক্ষা করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এই প্রতিষ্ঠান কোনও ধর্মের নয়; এটি এমন একটি বিদ্যালয়, যেখানে তাঁদের সন্তানরা শিক্ষা গ্রহণ করছে। নিশাতের কাছে সেই ঘটনা মানবতার এক অনন্য শিক্ষা হয়ে ওঠে। মানুষের এই ঐক্য ও সহমর্মিতা তাঁকে সামাজিক সংস্কার এবং নারী অধিকার রক্ষার কাজে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করতে অনুপ্রাণিত করে।
১৯৯২ সালে তিনি ন্যাশনাল মুসলিম উইমেন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নিবন্ধিত করেন। নিশাতের মতে, সংগঠনের নামের সঙ্গে "মুসলিম" শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবেই যুক্ত করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে মুসলিম নারীরা ভারতের সামাজিক অগ্রগতি ও জাতি গঠনের সক্রিয় অংশীদার, নিছক দর্শক নন। বিগত কয়েক দশক ধরে সংগঠনটি নারী অধিকার, শিক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যাপক কাজ করে চলেছে।
বহু বছর ধরে নিশাত হুসেন তাৎক্ষণিক তিন তালাক, বাল্যবিবাহ এবং নারীদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে আন্দোলন করে আসছেন। তাঁর বিশ্বাস, ইসলাম নারীদের মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে। কিন্তু অনেকেই কোরআনের প্রকৃত শিক্ষা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। তাঁর মতে, তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিষিদ্ধ করার আইন কোরআনের ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি এই আইনকে কোরআনের শিক্ষার বিজয় বলেই মনে করেন, এর বিরোধিতা নয়।
নিশাতের মতে, কঠোর ন্যায়বিচারের শর্ত পূরণ না করে ইসলাম একাধিক বিয়ের অনুমতি দেয় না। যেহেতু একাধিক স্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ণ সমতা বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব, তাই একবিবাহই অধিক নৈতিক ও বাস্তবসম্মত পথ। স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কারণে মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বহু নারীর অভিজ্ঞতা শুনেই তাঁর এই মতামত গড়ে উঠেছে। যদিও তিনি মনে করেন নারীদের আইনি সুরক্ষা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, তবুও তাঁর বিশ্বাস, তিন তালাক আইন নারীদের নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে এবং আইনের আশ্রয় নিতে সাহস জুগিয়েছে।
গত ৩২ বছর ধরে নিশাতের অফিসে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চারটি কাউন্সেলিংয়ের মামলা আসে। এই মামলাগুলির মধ্যে থাকে গার্হস্থ্য হিংসা, দাম্পত্য কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ, দ্বিতীয় বিয়ে এবং পারিবারিক বিবাদ। সম্ভব হলে আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক পুনর্গঠনের দিকেই তিনি গুরুত্ব দেন। তাঁর দাবি, অনেক দম্পতি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে এলেও ধৈর্যশীল কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে পরবর্তীতে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
নিশাতের মতে, তাঁর দল গত কয়েক দশকে হাজার হাজার পরিবারকে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে। অনেক দম্পতি বিবাহবিচ্ছেদের নথি নিয়ে এলেও মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছে একসঙ্গে বাড়ি ফিরেছেন। তাঁর কাজের খ্যাতি বিদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিদেশ থেকেও মানুষ কাউন্সেলিংয়ের জন্য তাঁর কাছে আসেন। প্রয়োজনে তিনি নারীদের আইনি সহায়তা, আশ্রয় এবং অন্যান্য সামাজিক সহায়তাও নিশ্চিত করেন।
বর্তমানে নিশাত জয়পুরের উত্তর মহিলা থানায় অবস্থিত রাজস্থান সরকারের মহিলা সুরক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করছেন। প্রতিদিন বহু নারী গার্হস্থ্য হিংসা থেকে শুরু করে দাম্পত্য বিবাদের অভিযোগ নিয়ে সেখানে আসেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় তাঁকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে—নারীর প্রতি সহিংসতা আর শুধু দরিদ্র বা কম শিক্ষিত পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
এখন চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং রাজনৈতিক নেতাদের পরিবার থেকেও এ ধরনের অভিযোগ আসছে। নিশাতের মতে, এটি প্রমাণ করে যে নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ শিক্ষা বা অর্থ নয়, বরং সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত মানসিকতা।
নিশাত বাল্যবিবাহ রোধের আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে তিনি বহু অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর মতে, ইসলামে কনের স্বাধীন সম্মতি অপরিহার্য এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়েকে ইসলাম সমর্থন করে না। তিনি খাপ পঞ্চায়েত এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক সমাজপঞ্চায়েতেরও সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, তারা প্রায়ই ন্যায়বিচারের পরিবর্তে আপসকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাঁর আরও মত, অপরাধীদের কাছ থেকে আদায় করা আর্থিক জরিমানা প্রতীকী শাস্তি হিসেবে না থেকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের উপকারে আসা উচিত।
নিশাত হুসেন রাজস্থানের প্রথম দিকের নারী কাজিদের অন্যতম। এই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা অর্জনের জন্য তিনি মুম্বইয়ে ইসলামি আইনশাস্ত্র এবং ভারতীয় সংবিধান বিষয়ে পাঁচ বছরের একটি কোর্স সম্পন্ন করেন। সেই সময় নারীদের কাজি হওয়ার ধারণা প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েছিল। কিন্তু তিনি নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু ইসলামি পণ্ডিতও তাঁর কাজের প্রকাশ্য সমর্থন জানান।
নিশাত হুসেন
রাজস্থানে ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন-এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তিন তালাকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া মামলাগুলিকেও সমর্থন জানান। তাঁর বিশ্বাস, আগের তুলনায় তাৎক্ষণিক তিন তালাকের ঘটনা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
নারীকল্যাণে অসামান্য অবদানের জন্য নিশাত হুসেন জাতীয় ও রাজ্য স্তরে বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে জাতীয় মহিলা কমিশনের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মানিত করা হয়। এছাড়াও ড. আম্বেদকর উত্ত্থান পরিষদ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, শান্তি কমিটি এবং একাধিক সামাজিক সংগঠন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নারী অধিকারের ক্ষেত্রে তাঁর কাজের জন্য তাঁকে পুরস্কৃত করেছে।
নিশাত হুসেনের পরিবারেও সমাজসেবার এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মেয়ে আন্দালিব ফাতিমা দুবাইয়ের ইন্ডিয়ান উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি তিনি একাধিক রেস্তোরাঁও পরিচালনা করেন। তাঁর নাতি আবদুল মুকিত, যিনি "পেপার ব্যাগ বয়" নামে পরিচিত, প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাগজের ব্যাগ ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছেন। তাঁর এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের জন্য তিনি আবুধাবি অ্যাওয়ার্ড পান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগও লাভ করেন।
বয়স বাড়লেও নিশাত হুসেন এখনও জয়পুরের জোহরি বাজারের সেই সাধারণ অফিস থেকেই কাজ করে চলেছেন, যেখানে আজও প্রতি সপ্তাহে অসংখ্য নারী ন্যায়বিচার ও পরামর্শের আশায় আসেন। তাঁর দর্শন অত্যন্ত সহজ, স্থায়ী সামাজিক পরিবর্তন ক্ষমতাশালী পদে বসে আসে না; আসে সেইসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে, যাদের পাশে আর কেউ নেই। প্রত্যেক মানুষ যেন ন্যায্যতা, মর্যাদা এবং সহমর্মিতা পায়, সেটাই তাঁর জীবনের লক্ষ্য। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই বিশ্বাসই তাঁকে পথ দেখিয়েছে, আর সেই পথচলায় রাজস্থানের হাজার হাজার নারী ও পরিবারের জীবন বদলে দিয়েছেন নিশাত হুসেন।