ভক্তি চালক
আপনি বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি ইলন মাস্ক কিংবা আমাদের দেশের শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির বিপুল সম্পদের কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন। কিন্তু জানেন কি, ভারতের অন্যতম ধনী মুসলিম নারী কে? তিনি আর কেউ নন, ‘মেট্রো ব্র্যান্ডস’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফারাহ মালিক ভানজি। প্রায় ২৬,০০০ কোটি টাকার বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। তিনি বিলিয়নিয়ার রফিক মালিকের কন্যা।
আজ ফারাহ ভানজি দেশের কোটি কোটি নারীর কাছে ক্ষমতায়নের এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁর দাদু মালিক তেজানি ১৯৫৫ সালে ‘মেট্রো শুজ’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। আজ ফারাহ তাঁর অসীম নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই উত্তরাধিকারকে পৌঁছে দিয়েছেন নতুন উচ্চতায়। চলুন, কোলাবার একটি ক্যাশ কাউন্টার থেকে শুরু হওয়া এই বহুমুখী নারী নেত্রীর অসাধারণ যাত্রার গল্পে চোখ রাখা যাক।
ফারাহ মালিক ভানজি
পুরনো দিনের গল্প ছিল বেশ চমকপ্রদ। সেই সময় জুতো বিক্রেতারা প্রায়ই বিখ্যাত সিনেমা হলের নাম অনুসারে নিজেদের দোকানের নাম রাখতেন। ফারাহ মালিকের কথায়, “সেই সময় মুম্বইয়ের এমজি রোডে ‘মেট্রো’ নামে একটি সিনেমা হল ছিল। সেটি থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে আমার দাদু আমাদের ব্র্যান্ডের নাম ‘মেট্রো’ রাখেন।”
ফারাহর দাদু প্রথমে মুম্বইয়ের গ্রান্ট রোডে একটি জুতোর দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। পরে তিনি কোলাবায় একটি ছোট লন্ড্রির দোকান নেন এবং সেখান থেকেই নিজের ব্যবসা শুরু করেন। সেটিই হয়ে ওঠে ‘মেট্রো শুজ’-এর পথচলার সূচনা।
সেই সময় ব্যবসায় সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল মানুষের মন জয় করা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলা। পুরনো দিনের কথা স্মরণ করে ফারাহ বলেন, “আমার মনে হয়, আমার দাদু ৪০টি ভিন্ন ভাষায় ‘হ্যালো’ বলতে জানতেন। সেই কারণেই আমাদের দোকান এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।”
মুম্বইয়ে এলে মানুষ তিনটি ব্র্যান্ডের দোকানে যাওয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, মেট্রো, কালা নিকেতন এবং চরাগ দিন। সেই সময়ের বলিউডের কিংবদন্তিরাও, অমিতাভ বচ্চন, গোবিন্দা কিংবা জয়া বচ্চন, কোলাবার এই দোকানে আসতে ভালোবাসতেন।
ফারাহ মালিক ভানজি তাঁর পরিবারের সঙ্গে
দোকানে আসা বিপুল সংখ্যক এয়ার হোস্টেস এবং পারসি ক্রেতাদের কারণে পরিবারটি ফ্যাশনের প্রকৃত চাহিদা বুঝতে শিখেছিল। মজার বিষয় হলো, সেই সময় দোকানের পণ্যের দাম আজকের মতো নির্দিষ্ট বা ছাপা থাকত না। একজন মহিলা ক্রেতার পরা শাড়ির ওপর নির্ভর করেই একজোড়া জুতোর দাম নির্ধারণ করা হতো! তিনি যদি দামি শিফন বা সুতির শাড়ি পরতেন, সেই অনুযায়ী জুতোর দাম বলা হতো।
দাদুর পর ব্যবসায় যোগ দেন ফারাহর বাবা রফিক মালিক। তিনি সরাসরি দোকানের উপরের তলা, যেখানে জুতোর স্টক রাখা হতো সেই স্টক রুম, থেকে কাজ শুরু করেন। ফারাহর মতে, ক্রেতা ঠিক কী চান, তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর উপরে বসে থাকা একজন ব্যক্তি ক্রেতার পছন্দ অনুমান করতে করতে সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। সেখান থেকেই এগিয়ে রফিক মালিক ব্র্যান্ডটিকে আরও সম্প্রসারিত করেন এবং একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন।
আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস থেকে গণিতে ডিগ্রি অর্জন করা ফারাহ প্রথমে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেওয়ার ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। ফারাহ বলেন, “আমার আসল আগ্রহ ছিল গণিত ও অর্থনীতিতে। কিন্তু এখানে আসার পর বুঝলাম, এই কাজটি আমি উপভোগ করছি এবং প্রতিদিন নতুন কিছু শিখছি। এরপরই আমি এই ব্যবসায় পুরোপুরি যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।”
২০০০ সালে ফারাহ যখন ব্যবসায় পা রাখেন, তখন ডিজিটালাইজেশনের যুগ সবে শুরু হয়েছে। তিনি বারকোডিং ব্যবস্থা চালু করেন এবং ম্যানুয়াল পদ্ধতির বদলে স্টক বা ইনভেন্টরি নিয়ন্ত্রণকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে আসেন। তৃতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তা হিসেবে, তার ওপর একজন নারী হিসেবে, শুরুতে সরবরাহকারীদের সঙ্গে কথা বলা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। পুরুষ-প্রধান এই ক্ষেত্রে নিজের সম্মান ও অবস্থান তৈরি করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বাবার দেওয়া স্বাধীনতার কারণে তিনি দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছিলেন।
ফারাহ বলেন, “আমার বাবা সবসময় আমাদের ভুল করার সুযোগ দিয়েছেন। তিনি বলতেন, আমরা সেই ভুল থেকে শিখব এবং সামনে এগিয়ে যাব। কিন্তু একই ভুল বারবার করা উচিত নয়।” ফারাহর দূরদর্শিতার ফলেই ২০১০ সালে মাত্র ১০০টি স্টোর থাকা সংস্থাটি আজ সারা ভারতে ৮০০-রও বেশি স্টোরের বিশাল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
মেট্রো ব্র্যান্ডসের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নৈতিক মূল্যবোধ। সংস্থাটি ‘কাস্টমার ডিলাইট’ বা ‘গ্রাহক সন্তুষ্টি’-র নীতিতে কাজ করে। মালিক নিজে প্রতিটি শাখায় বসে থাকতে পারেন না। তাই ফারাহর বাবা একটি অভিনব ব্যবস্থাপনা মডেল তৈরি করেছিলেন। আজও মেট্রোর সমস্ত ম্যানেজার কমিশন ভাগাভাগির ভিত্তিতে কাজ করেন; তাঁদের নির্দিষ্ট বেতন নেই।
ফারাহ গর্বের সঙ্গে জানান, তাঁদের সব ম্যানেজারই সংস্থার ভেতর থেকেই ধাপে ধাপে উঠে এসে এই পদে পৌঁছেছেন; বাইরে থেকে সরাসরি কাউকে ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ করা হয় না। এভাবেই ৭০০-রও বেশি ম্যানেজার সংস্থার অভ্যন্তর থেকে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। একজন সাধারণ কর্মী, যিনি দোকানে ‘স্টক বয়’ হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন, তাঁকে মালিকের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া, আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
সময় বদলালেও দোকানে ক্রেতাদের অভিজ্ঞতাই এখনও মেট্রোর সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে ব্যবসার পিছনের ব্যবস্থাপনায় ফারাহ প্রযুক্তিকে ব্যাপকভাবে যুক্ত করেছেন। বর্তমানে তাঁদের ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। কোন দোকানে কোন পণ্য বেশি বিক্রি হবে, তা নির্ধারণ করে দেয় মেশিন। ChatGPT এবং Business AI-এর মতো প্রযুক্তি ও সিস্টেম নিয়ে কাজ করে তিনি ব্যবসায় পরিবর্তন আনছেন। ফারাহ মনে করেন, সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াই সাফল্যের একমাত্র পথ।
তিন সন্তানের মা, একজন দৃঢ়চেতা স্ত্রী এবং সফল উদ্যোক্তা, এই সমস্ত ভূমিকা ফারাহ অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে সামলে চলেছেন। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে, থ্রোবল খেলতে এবং কোনো হ্রদের ধারে সময় কাটাতে তিনি ভালোবাসেন। ব্যবসার বাইরেও মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটানো এবং প্রত্যেককে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলাই তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য। ফারাহ বলেন, “আজ আমাদের লক্ষ্য হলো প্রত্যেককে নিজের পায়ে দাঁড় করানো। আমি জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি এবং আমি তা সমাজকে ফিরিয়ে দিতে চাই।”
ভবিষ্যতে পরিবারের কেউ এই ব্যবসায় আসবেন কি না, তা নিশ্চিত না হলেও, ফারাহ বর্তমানে এমন একটি সুদৃঢ় পরিকল্পনা তৈরি করছেন, যাতে আগামী ১০০ বছরও এই ব্যবসা টিকে থাকতে পারে। তিনি সবসময় বাবার দেওয়া একটি মূল্যবান পরামর্শ অনুসরণ করেন, “আপনার দৃষ্টিভঙ্গিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জীবন আপনার সামনে অপ্রত্যাশিত বাধা ছুড়ে দিতেই থাকবে। কিন্তু আপনার সঙ্গে কী ঘটছে, তা মাত্র ১০ শতাংশ; আর সেই পরিস্থিতিতে আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন, সেটাই ৯০ শতাংশ। সবকিছু নির্ভর করে আপনি চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি কীভাবে হচ্ছেন তার ওপর।”
কোলাবার একটি ছোট জুতোর দোকান থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ হাজার হাজার কোটি টাকার বিশাল সাম্রাজ্যে রূপ নিয়েছে, শুধুমাত্র দৃঢ় সংকল্প, দূরদর্শিতা এবং সময়ের পরিবর্তনকে সঠিকভাবে চিনে নেওয়ার ক্ষমতার জোরে। ফারাহ মালিক ভানজি শুধু দেশের অন্যতম ধনী মুসলিম নারীই নন; তিনি পরিণত, আধুনিক এবং সহানুভূতিশীল নেতৃত্বের এক জীবন্ত উদাহরণ।