মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের জগতে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা প্রচারের আলোয় আসার চেয়ে নেপথ্যে থেকে কাজ করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। তাঁদের তৈরি কৌশল ও পরিকল্পনাই কখনও কখনও গোটা একটি শিল্পের গতিপথ বদলে দেয়। কর্পোরেট দুনিয়ায় এমন ব্যক্তিদের বলা হয় ‘সাইলেন্ট পারফর্মার’ বা ‘কিংমেকার’। সেই নেপথ্যের দক্ষ কারিগরদের মধ্যে অন্যতম দিল্লির চল্লিশের কোঠার মার্কেটিং পেশাজীবী আফরিন জেব। তাঁর অভিনব মার্কেটিং কৌশল ভারতের কনটেন্ট ক্রিয়েটর বাজারকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে তিনি StudioBackdrops.com-এর চিফ মার্কেটিং অফিসার (CMO)। লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত এক তরুণী থেকে আজকের এমন এক মার্কেটিং নেত্রী হয়ে ওঠার গল্প, যিনি দেশের বড় বড় ব্র্যান্ডের কৌশলকে প্রভাবিত করছেন, আফরিনের এই পথচলা নিঃসন্দেহে অনন্য ও অনুপ্রেরণাময়।
আফরিন জেব
আফরিন জেবের সাফল্য একদিনে আসেনি। প্রায় এক দশক আগে শুরু হয় তাঁর পেশাগত যাত্রা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা এবং গল্প লেখার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। সেই ভালো লাগাকেই পেশায় পরিণত করে প্রায় দশ বছর আগে তিনি কনটেন্ট রাইটার হিসেবে কাজ শুরু করেন। নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিনি কপিরাইটার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের জটিল দিকগুলিও আয়ত্ত করতে থাকেন।
গত চার বছর ধরে আফরিন StudioBackdrops.com-এর সঙ্গে যুক্ত। শুরুতে তিনি কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে সংস্থায় যোগ দেন এবং ব্র্যান্ডের জন্য সৃজনশীল কৌশল তৈরির দায়িত্ব নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বড় পরিসরের প্রোডাকশন ও শুটিং প্রজেক্ট পরিচালনার ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতা বাড়ান। বর্তমানে সংস্থার হেড অব মার্কেটিং এবং CMO হিসেবে তিনি ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
আজকের সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর দুনিয়ায় প্রামাণিকতা এবং দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আফরিনের মতে, শুরু থেকেই তাঁর সংস্থা ‘ভিজ্যুয়াল-ফার্স্ট’ দর্শন অনুসরণ করে এসেছে, যেখানে অন্য সবকিছুর আগে অসাধারণ ভিজ্যুয়ালকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিটি পণ্যের ছবি তোলার ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালার-ক্যালিব্রেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যাতে স্ক্রিনে দেখা পণ্যের রং এবং বাস্তবে থাকা পণ্যের রং যতটা সম্ভব সঠিকভাবে মিলে যায়।
বিভিন্ন এজেন্সি ও ব্র্যান্ডে ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে আফরিনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সংস্থাটির মার্কেটিং পদ্ধতিকে স্বতন্ত্র করে তুলতে সাহায্য করেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভিডিও কনটেন্ট যখন ধীরে ধীরে প্রচলিত পোস্টের জায়গা দখল করতে শুরু করে, তখন তিনি দ্রুত কৌশল বদলে ফেলেন। শুধু ক্রিয়েটরদের কাছে পণ্য বিপণন না করে তিনি নিজেই ভিডিও তৈরি করতে শুরু করেন। বর্তমানে সংস্থাটি ক্রিয়েটরদের শেখায়, কীভাবে সীমিত বাজেটের মধ্যেও আন্তর্জাতিক মানের ভিডিও তৈরি করা সম্ভব।
আফরিন যখন বাজারকে কাছ থেকে বিশ্লেষণ করেন, তখন ভারতের ক্রিয়েটর ইকোসিস্টেমে একটি বড় ফাঁক তাঁর নজরে আসে। সেই সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সামনে মূলত দুটি পথ ছিল, স্থানীয় বাজারে পাওয়া সস্তা কিন্তু নিম্নমানের ব্যাকড্রপ কেনা অথবা বিদেশ থেকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ব্যাকড্রপ আমদানি করা। ছোট ও স্বাধীন ক্রিয়েটরদের জন্য কোনোটিই আদর্শ ছিল না।
আফরিন জেব
এই ফাঁক পূরণ করতে এগিয়ে আসে StudioBackdrops। আফরিনের মার্কেটিং নেতৃত্বে সংস্থাটি ভারতীয় গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চমানের ব্যাকড্রপ সরবরাহ শুরু করে। স্বচ্ছতাকে তারা অন্যতম মূল মূল্যবোধ হিসেবে গ্রহণ করে এবং প্রতিটি পণ্যের বিবরণ সৎ ও নির্ভুলভাবে তুলে ধরে। এই পদ্ধতি গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে সাহায্য করে এবং নিম্নমানের বা বিভ্রান্তিকর পণ্য বিক্রি করা বিক্রেতাদেরও চ্যালেঞ্জ জানায়। বর্তমানে গ্রাহকদের আস্থাই সংস্থাটির অন্যতম বড় সম্পদ।
একটি বলিউড ছবির শুটিংয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং বাড়ির এক কোণে বসে কনটেন্ট তৈরি করা একজন ক্রিয়েটরের প্রয়োজনীয়তা সম্পূর্ণ আলাদা। এই বৈচিত্র্যকে সামনে রেখে আফরিন এমন পণ্যের পরিসর তৈরিতে সাহায্য করেছেন, যা পেশাদার স্টুডিও থেকে শুরু করে স্বাধীন ক্রিয়েটর, সবার চাহিদা পূরণ করতে পারে।
সংস্থাটি তাদের প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের নিয়ম অনুসরণ করে। ফলে দাম যাই হোক না কেন, গুণমানের সঙ্গে আপস করা হয় না। বর্তমানে তাদের পোর্টফোলিওতে AriesX, Indus, Backdrops4ever এবং Baroque Studio-র মতো সাব-ব্র্যান্ড রয়েছে।
সংস্থাটির অন্যতম বড় শক্তি হল, তাদের টিমের সদস্যরা নিজেরাই ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত। ফলে বড় মাপের চলচ্চিত্র প্রযোজনা থেকে শুরু করে নতুন ইউটিউবার, দুই ধরনের ক্রিয়েটরের প্রয়োজনীয়তাই তাঁরা বুঝতে পারেন। তাঁদের লক্ষ্য হল ব্যয়বহুল আমদানি করা সরঞ্জামের পরিবর্তে টেকসই ও সাশ্রয়ী দেশীয় বিকল্প তৈরি করা।
বর্তমানে অনেক আধুনিক সংস্থা মানুষের নজর কাড়তে ভাইরাল মার্কেটিং কৌশলের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আফরিন বিশ্বাস করেন, গ্রাহকের সন্তুষ্টি এবং মুখে-মুখে প্রচারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালে সংস্থাটি ‘Indus Papers’ নামে একটি নতুন পণ্য বাজারে আনে। অতিরঞ্জিত প্রচারের পরিবর্তে এই পণ্যের মার্কেটিংয়ে ভারতীয় পরিচয় এবং গুণমানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাস্তব পরিস্থিতিতে পণ্যটি কীভাবে কাজ করে, তা বোঝাতে আসল ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে এর প্রচার করা হয়।
আফরিন জেব
গ্রাহকদের মধ্যে আগে থেকেই ব্র্যান্ডটির প্রতি আস্থা থাকায় ভারতীয় ক্রিয়েটররা দ্রুত পণ্যটিকে গ্রহণ করেন। এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে সংস্থাটি পরের বছর ‘IndusLight’ বাজারে আনে, যা গ্রাহকদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পায়।
বাইরের দৃষ্টিতে ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফির সরঞ্জামের শিল্পকে এমন একটি ক্ষেত্র বলে মনে হতে পারে, যেখানে উদ্ভাবনের সুযোগ সীমিত। কিন্তু আফরিন বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখেন। তাঁর কাছে উদ্ভাবন কোনও তাত্ত্বিক ধারণা নয়; বরং বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধানই হল প্রকৃত উদ্ভাবন।
সংস্থার ওয়েবসাইটে কোনও নতুন পণ্য প্রকাশের আগে আফরিন নিজে সেটি পরীক্ষা করেন। তাঁর মূল্যায়নের পর অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা পণ্যটির বিস্তারিত পরিদর্শন ও মূল্যায়ন করেন। তাঁর বিশ্বাস, পণ্যকে সৎ ও স্বচ্ছভাবে গ্রাহকের সামনে তুলে ধরাও আজকের বাজারে একটি বড় ধরনের উদ্ভাবন।
সংস্থাটি পণ্যের পাশাপাশি বিস্তারিত টিউটোরিয়াল এবং শিক্ষামূলক ভিডিওও সরবরাহ করে। এর ফলে গ্রাহকরা কেনার আগেই পণ্যটি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যান। আফরিনের কাছে উদ্ভাবনের সহজ অর্থ হল, গ্রাহকের জীবনকে আরও সহজ করে তোলা।
আফরিন জেবের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়া দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে দর্শকরা ক্রমশ কৃত্রিম কনটেন্ট থেকে দূরে সরে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন রয়েছে, এমন গল্পের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
এই ধরনের কনটেন্ট তৈরির জন্য ক্রিয়েটরদের অনেক সময় বড় বা জাঁকজমকপূর্ণ স্টুডিওর পরিবর্তে সাধারণ ও স্বাভাবিক শুটিং পরিবেশের প্রয়োজন হয়। এর ফলে ভারতের টিয়ার-২ ও টিয়ার-৩ শহর এবং গ্রামীণ অঞ্চল থেকে ক্রমশ আরও বেশি সংখ্যক ক্রিয়েটর উঠে আসছেন। তাঁদের অনেকেই নিয়মিত চাকরি করেন অথবা শ্রমনির্ভর পেশার সঙ্গে যুক্ত থেকেও অবসর সময়ে কনটেন্ট তৈরি করছেন।
দর্শকরা তাঁদের স্বাভাবিকতা ও সরলতাকে পছন্দ করছেন। আফরিন মনে করেন, ভবিষ্যতে স্টুডিও বলতে আর শুধুমাত্র ব্যয়বহুল পরিকাঠামো বা বিশাল প্রোডাকশন স্পেসকে বোঝাবে না। বরং এমন যেকোনও নমনীয় পরিবেশই স্টুডিও হয়ে উঠতে পারে, যেখানে কার্যকরভাবে আকর্ষণীয় গল্প বলা সম্ভব।
আজ আফরিন জেব ভারতের ক্রিয়েটর ইকোনমির গতিপথ নির্ধারণকারী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। উদ্ভাবন, স্বচ্ছতা এবং ক্রিয়েটরদের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়ার মাধ্যমে তিনি এমন একটি সমৃদ্ধ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন, যা দেশের প্রতিষ্ঠিত পেশাদারদের পাশাপাশি নতুন ও সম্ভাবনাময় কনটেন্ট ক্রিয়েটরদেরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।