শত্রুর ঘাঁটিতে মহিলা পাইলটের আক্রমণ: কীভাবে করা হয়েছিল ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরিকল্পনা?

Story by  Aasha Khosa | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
শত্রুর ঘাঁটিতে মহিলা পাইলটের আক্রমণ: কীভাবে করা হয়েছিল ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরিকল্পনা?
শত্রুর ঘাঁটিতে মহিলা পাইলটের আক্রমণ: কীভাবে করা হয়েছিল ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরিকল্পনা?
 
আশা খোসা / নয়াদিল্লি

ডিক্লাসিফায়েড (গোপনীয়তামুক্ত): ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগামে মহিলাদের সামনেই ২৬ জন ভারতীয় পুরুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জবাব হিসেবে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরের (PoJK) সন্ত্রাসবাদী শিবিরগুলিতে ভারত যে হামলা চালিয়েছিল, তার প্রথম তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টারি) হলো ‘অপারেশন সিঁদুর’। ৭ মে ভোররাতে শুরু হওয়া এই চার দিনের অভিযানের মাধ্যমে ইসলামাবাদকে ভারত একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছিল, এর পর থেকে প্রতিটি সন্ত্রাসবাদী হামলাকে যুদ্ধের মতো বিবেচনা করা হবে এবং সেই অনুযায়ী তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
 
ডিসকভারি প্লাসে (Discovery Plus) উপলব্ধ এই দুই পর্বের ডকুসিরিজটি একটি বিশেষ মাইলফলক। অভিযানের পরিকল্পনা, নেতৃত্ব এবং দক্ষতার সঙ্গে তা কার্যকর করা ব্যক্তিদের বক্তব্যের মাধ্যমে এই সিরিজ ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর বহু অজানা কাহিনি সামনে এনেছে।
 
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এই অভিযানের আনুষ্ঠানিক বিবরণ প্রদানকারী সর্বোচ্চ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। তিনি এই গোটা কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছেন। পাশাপাশি অভিযানের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য সামরিক নেতা ও কমান্ডাররাও এ বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন। যেহেতু এটি অভিযানের প্রথম সরকারি বিবরণ, তাই এই তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে বেশ কিছু নতুন ও চমকপ্রদ তথ্য।
 
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল
 
অপারেশন সিঁদুরের দশটি বিশেষ ও অনন্য তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
 
১. অভিযানের নামকরণ:
 
তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, প্রস্তাবিত এই অভিযানের কী নাম দেওয়া হয়েছে। জেনারেল দ্বিবেদী তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, এর অস্থায়ী নাম রাখা হয়েছে ‘অপারেশন টিউলিপ গার্ডেন’। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, যেহেতু পহেলগামের হামলা কাশ্মীরে সংঘটিত হয়েছিল, তাই ‘টিউলিপ গার্ডেন’ নামটির সঙ্গে এর একটি যোগসূত্র রয়েছে।
 
এর উত্তরে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, “আপনারা এর নাম ‘অপারেশন সিঁদুর’ রাখছেন না কেন?” সেনাপ্রধান প্রথমে ভেবেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী সিন্ধু নদীর কথা বলছেন। সেই সময় ভারত পাকিস্তানে সিন্ধু নদীর জলপ্রবাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি নামটিকে উপযুক্ত মনে করে সম্মতি জানান। তখন মোদি বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, “উনহোনে হামারি মহিলায়োঁ কা সিঁদুর উজাড় দিয়া”, অর্থাৎ, তারা আমাদের মহিলাদের সিঁদুর মুছে দিয়েছে। সেনাপ্রধান বলেন, তখনই তিনি বুঝতে পারেন, নামটি কতটা শক্তিশালী এবং কীভাবে এটি গোটা দেশকে একত্রিত করতে পারে।
 
২. প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া:
 
পহেলগাম হামলার পরদিন সকাল থেকেই অপারেশন সিঁদুরের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। সৌদি আরব সফর মাঝপথে শেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশে ফিরে আসেন এবং দিল্লি বিমানবন্দরেই শীর্ষ নিরাপত্তা আধিকারিকদের সঙ্গে প্রথম বৈঠক করেন। এনএসএ ডোভাল জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁর দলকে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলেন: “কে এই ঘটনা ঘটিয়েছে? আমরা কি অপরাধীদের বিষয়ে নিশ্চিত?” প্রধানমন্ত্রী ডোভালকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, “তাদের খুঁজে বের করুন, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, মাটিতে, আকাশে কিংবা পাতালেও।”
৩. স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ:
 
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কোনও ধরনের অস্পষ্টতা ছিল না। বিমানবন্দরের বৈঠকের ১২ ঘণ্টার মধ্যেই সামরিক নেতারা অপারেশন সিঁদুরের রণকৌশল তৈরি করতে বসেন। অত্যন্ত গোপনীয় এই ওয়ার রুমে পাকিস্তান অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরের পাশাপাশি পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের ভিতরের লক্ষ্যগুলিও চিহ্নিত করার কাজ চলছিল। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এবং পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করা হয়। সেই সময় ডোভাল প্রধানমন্ত্রীকে এই সম্ভাবনা সম্পর্কে অবহিত করেন এবং প্রধানমন্ত্রী সবুজ সংকেত দেওয়ার আগে বিষয়টি নিয়ে ভাবার জন্য কিছু সময় চেয়েছিলেন।
 
৪. লক্ষ্য নির্ধারণ:
 
ভারতীয় সেনাবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা এবং মিলিটারি অপারেশনস ডিরেক্টরেটের সঙ্গে সমন্বয় করে হামলা চালানোর জন্য ৩৬টি সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটি চিহ্নিত করেছিল। এই ঘাঁটিগুলিতে হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের কাছে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছে দেওয়া, ভারত নিজের মাটিতে সংঘটিত প্রতিটি সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপকে যুদ্ধের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করবে এবং সেই অনুপাতে জবাব দেবে।
 
শেষ পর্যন্ত ৯টি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ৭টি ছিল পাকিস্তান অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরের (POJK) ভিতরে এবং দুটি ছিল পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে, লস্কর-ই-তৈবার সদর দফতর মুরিদকে এবং জইশ-ই-মহম্মদের সদর দফতর বাহাওয়ালপুর।
 
৫. রণকৌশলের পরিকল্পনা:
 
পাকিস্তান অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিগুলিতে হামলার দায়িত্ব দেওয়া হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর নর্দার্ন কমান্ডকে। অন্যদিকে, পাঞ্জাবের গভীরে অবস্থিত মুরিদকে ও বাহাওয়ালপুরে হামলার দায়িত্ব দেওয়া হয় ভারতীয় বায়ুসেনাকে। প্রধানমন্ত্রী মোদির নির্দেশ ছিল স্পষ্ট, এটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ, সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিতে হামলা চালানোর সময় সাধারণ নাগরিকদের জীবন রক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে, আরব সাগরে নৌসেনা আধিপত্য বিস্তার করেছিল। পাকিস্তান যখনই উপলব্ধি করে যে ভারতীয় নৌসেনা গোলাবর্ষণ করতে পারে, তখনই তারা যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত নেয়।

 
৬. চূড়ান্ত গোপনীয়তা:
 
পরিকল্পনার বিষয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের গোপনীয়তা বজায় রেখে সামরিক নেতারা হামলার দিনটির আগের কয়েক ঘণ্টায় নিজেদের গতিবিধি গোপন রেখেছিলেন। ডিজিএমও ঘায়ে জানান, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সচিবকে গভীর রাতে সাউথ ব্লকের পিছনের প্রবেশদ্বার থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেনাপ্রধানকে তাঁর গাড়িচালক ও সহকারীদের মাধ্যমে ওয়ার রুমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। বায়ুসেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল এপি সিং ভোপাল যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তিনি একটি স্থানীয় সর্টির পর অন্য একটি পথ ধরে ওয়ার রুমে পৌঁছে যান।
 
৭. অপারেশন সিঁদুরের প্রতীকী তাৎপর্য:
 
মহিলাদের সামনেই তাঁদের স্বামীদের হত্যা করার প্রতিশোধ নেওয়ার এই রণকৌশল অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মুরিদকেতে হামলা চালানো মিগ (MIG) বিমানের পাইলট ছিলেন একজন মহিলা। কর্নেল সোফিয়া কুরেশি, উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিং এবং আরও কয়েকজন মহিলাকে যুদ্ধ অভিযানের মুখপাত্র হিসেবে বেছে নেওয়াও ছিল গোটা বিশ্বের সামনে ভারতের দৃঢ়তাকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা।
 
৮. হামলা:
 
৭ মে রাত ১টা ৫ মিনিটে এই হামলা চালানো হয়। নেতাদের মধ্যে একজন ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা অনুযায়ীই সম্পন্ন হয়েছিল।” অধিকাংশ নেতা বলেন, তাঁদের পেশাগত জীবনে এটি ছিল সবচেয়ে সন্তোষজনক মুহূর্তগুলির একটি।
 
হামলার ঠিক পরেই ডিজিএমও লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজীব ঘায়ে তাঁর পাকিস্তানি সমকক্ষ মেজর জেনারেল কাসিফ আবদুল্লাহকে এই অভিযান এবং এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করেন। আবদুল্লাহ উত্তর দেন, “এখন আমাকে এসব বলে কী লাভ?”
 
অপারেশন সিঁদুরের সময় সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন সোফিয়া কুরেশি
 
৯. উত্তপ্ত নিয়ন্ত্রণরেখা (LOC):
 
নর্দার্ন আর্মির কমান্ডার জানান, সীমান্ত এবং নিয়ন্ত্রণরেখায় (LOC) পাকিস্তানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান সীমান্ত ও নিয়ন্ত্রণরেখায় গোলাবর্ষণ শুরু করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী তার দ্বিগুণ শক্তি দিয়ে জবাব দেয়।
 
ভারত ড্রোন হামলার জন্যও প্রস্তুত ছিল, যাতে বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেগুলিকে ধ্বংস করা যায়। হতাশ হয়ে পাকিস্তান গুরুদ্বার, মন্দির এবং সাধারণ নাগরিকদের বাড়িতে হামলা চালায়। “আমরা সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমণ করেছিলাম এবং তারা সাধারণ নাগরিকদের আক্রমণ করেছিল।”
 
১০. যুদ্ধবিরতি:
 
ভারত পাকিস্তানের ১১টি সামরিক ঘাঁটি এবং কমান্ড সেন্টারে প্রবল হামলা চালানোর পর পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির হামলা বন্ধ করার জন্য আমেরিকার সাহায্য চান। আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট মার্ক রুবিও পাকিস্তানের অনুরোধ জানাতে ভারতের বিদেশমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করকে ফোন করেন। কিন্তু তাঁকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ভারত কোনও মধ্যস্থতাকারীকে গুরুত্ব দেবে না।
 
শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে আবদুল্লাহ জেনারেল ঘায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে যুদ্ধবিরতির আবেদন জানান। আবদুল্লাহ ঘায়েকে ফোন করে বলেন, “স্যার, আপনারা যথেষ্ট ব্রহ্মোস মিসাইল নিক্ষেপ করেছেন। অনুগ্রহ করে এখন বন্ধ করুন।” সন্ধ্যা ৫টা ৩০ মিনিট থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, তথ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার নেওয়া অধিকাংশ নেতাই বলেন, “(পাকিস্তানের সঙ্গে) অস্বস্তি এখনও অব্যাহত রয়েছে, যেহেতু অপারেশন সিঁদুর এখনও চলছে।”
 
‘অপারেশন সিঁদুর’ শুধুমাত্র একটি সামরিক প্রত্যুত্তর ছিল না, এটি ছিল নতুন ভারতের এক শক্তিশালী হুংকার। দেশের নিরাপত্তা ও সম্মানের ক্ষেত্রে ভারত যে কোনও ধরনের আপস করবে না, এই নির্ভীক অভিযানের মাধ্যমে তা গোটা বিশ্বের সামনে প্রমাণিত হয়েছে।