শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
কোচবিহারের মাথাভাঙা থেকে শুরু হয়েছে এক ব্যতিক্রমী স্বপ্নের যাত্রা। গন্তব্য পবিত্র মক্কা। উদ্দেশ্য হজ পালন। আর সেই গন্তব্যে পৌঁছতে বিমানে কিংবা কোনও যানবাহনে নয়, পায়ে হেঁটেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সংকল্প করেছেন ২৬ বছরের যুবক মজিদুল। তাঁর এই অসাধারণ যাত্রা ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গের মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মাথাভাঙা থেকে মক্কার উদ্দেশে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করেন মজিদুল। তাঁর লক্ষ্য, ভারত থেকে দীর্ঘ সড়কপথ অতিক্রম করে একাধিক দেশ পেরিয়ে সৌদি আরবে পৌঁছনো এবং সেখানে হজ পালন করা। পুরো যাত্রায় তাঁর প্রায় তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।
মজিদুল
সাদা পোশাক, পিঠে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যাগ এবং হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা, এই বেশেই একা পথে বেরিয়ে পড়েছেন মজিদুল। সাধারণ মানুষের চোখে তাঁর এই যাত্রা যেমন বিস্ময়ের, তেমনই তাঁর কাছে এটি বহুদিনের লালিত একটি স্বপ্ন পূরণের প্রচেষ্টা। পথ চলতে চলতে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। কোথাও মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, কোথাও আবার সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
মাথাভাঙা থেকে বেরিয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে তাঁর যাত্রা এগিয়েছে। যখন তিনি যে এলাকা দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। অনেকেই তাঁর সঙ্গে কথা বলে তাঁর দীর্ঘ পথের যাত্রার বিষয়ে জানতে চাইছেন।
মজিদুলের পরিকল্পনা নিছক কয়েকশো কিলোমিটারের পদযাত্রা নয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মাথাভাঙা থেকে মক্কা পর্যন্ত স্থলপথে তাঁর সামনে প্রায় ৮,৫০০ থেকে ৯,০০০ কিলোমিটার পথ রয়েছে। সম্ভাব্য যাত্রাপথে পাকিস্তান, ইরান, ইরাক ও কুয়েত হয়ে সৌদি আরবে প্রবেশের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রমের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি, ভিসা ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।
এই যাত্রার সময়কালও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মজিদুল জানান, সৌদি আরবে পৌঁছতে তাঁর প্রায় তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ মাথাভাঙা থেকে শুরু হওয়া এই পদযাত্রা খুব সহজে শেষ হওয়ার নয়। দীর্ঘ রাস্তা, আবহাওয়ার পরিবর্তন, শারীরিক ক্লান্তি, বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশ, সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে।
তাঁর যাত্রার আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, রোজা রেখেও তিনি পথ চলেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত সংকল্পকে শক্তি করে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার এই দৃশ্য অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার হয়ে উঠেছে।
মজিদুলের যাত্রাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাঁর পথ চলার ছবি ও ভিডিও বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে মাথাভাঙার এই যুবকের ব্যক্তিগত স্বপ্ন ধীরে ধীরে বৃহত্তর মানুষের আলোচনায় উঠে এসেছে। তাঁর সংকল্পের ব্যাপ্তি নিয়ে কোনও সংশয় নেই। সাধারণত ভারত থেকে হজযাত্রীরা বিমান বা জাহাজে সৌদি আরবে পৌঁছন। সেই প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে মজিদুল বেছে নিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ। পায়ে হেঁটে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক যাত্রা করে মক্কায় পৌঁছনোর স্বপ্ন তাঁকে ইতিমধ্যেই একটি ব্যতিক্রমী চরিত্রে পরিণত করেছে।
এই যাত্রার মধ্যে শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, রয়েছে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অদম্য মানসিকতা। মাথাভাঙার এক সাধারণ যুবক নিজের বিশ্বাসকে সামনে রেখে যে পথ বেছে নিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে কঠিন। সামনে রয়েছে দীর্ঘ পথ, অজানা বহু পরিস্থিতি এবং অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। তবু লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে চলেছেন তিনি।
মাথাভাঙার মাটি থেকে শুরু হওয়া সেই পদযাত্রার শেষ গন্তব্য মক্কা। হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা, কাঁধে ব্যাগ আর মনে বহুদিনের স্বপ্ন, এই নিয়েই পথ চলছেন মজিদুল। তাঁর এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, কতটা পথ অতিক্রম করতে সক্ষম হন এবং শেষ পর্যন্ত পবিত্র মক্কায় পৌঁছে হজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে উত্তরবঙ্গের বহু মানুষ।