শিশুর খাবার নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তার সমাধান করছেন পুষ্টিবিদ এলিনা দাউদানি

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 7 h ago
এলিনা দাউদানি
এলিনা দাউদানি
 
বিদুষী গৌর / নয়াদিল্লি

নতুন করে মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের মনে একের পর এক প্রশ্ন ভিড় করে, শিশুকে প্রথম কী খাওয়াবেন, কখন বুকের দুধ দেবেন, কীভাবে উইনিং শুরু করবেন এবং কোন খাবারটি শিশুর জন্য সঠিক? পরিবার-পরিজন, সোশ্যাল মিডিয়া, বিজ্ঞাপন ও বন্ধুদের নানা পরামর্শের ভিড়ে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য খুঁজে পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে। জনপ্রিয় নানা ধারণার মধ্য থেকে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য তথ্য আলাদা করাও নতুন মায়েদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

মায়েদের যা জানা প্রয়োজন এবং তাদের যা বলা হয়, এই দুইয়ের মধ্যকার এই ব্যবধানই এলিনা দাউদানিকে Momfunda তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করে। এটি ভারতে ভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম, যার লক্ষ্য শিশুর পুষ্টি ও শৈশবের প্রাথমিক যত্ন সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা।
 
এলিনা দাউদানি
 
মূলত মুম্বাইয়ের বাসিন্দা এলিনা তাঁর কাজকে একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী বিশ্বাসের ওপর গড়ে তুলেছেন, একটি শিশুর যত্নে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং অভিভাবকত্বের ব্যবহারিক ও আবেগনির্ভর দিক, দুটিরই সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। পুষ্টিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা থেকে মায়েদের জন্য একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা পর্যন্ত তাঁর যাত্রা দেখিয়ে দেয়, কীভাবে বিশেষায়িত জ্ঞান একটি অর্থবহ সামাজিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।
 
এলিনা ডায়েটেটিক্স, মাতৃ ও শিশু পুষ্টিবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত Purdue University-তে Nutrition Science বিষয়ে পিএইচডি করছেন। তাঁর শিক্ষাগত পটভূমি তাঁকে মা ও শিশুদের পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা বোঝার শক্ত ভিত দিয়েছে। একইসঙ্গে, অভিভাবকদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে জটিল পুষ্টিবিজ্ঞানের বিষয়গুলো এমনভাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করেছে, যা পরিবারগুলো বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারে।
 
বিজ্ঞান ও দৈনন্দিন অভিভাবকত্বের এই সংযোগ থেকেই Momfunda-র জন্ম। শুধু রেসিপি বা কোন কোন খাবার খাওয়া উচিত তার তালিকার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে, এই প্ল্যাটফর্ম শিশু ও ছোটদের ঘিরে থাকা বিস্তৃত নানা প্রশ্নের উত্তর দেয়। এর বিভিন্ন কোর্সের মধ্যে ‘The ABCs of Feeding Right’-এর মতো কোর্স মায়েদের শুধু কী করতে হবে তা বলে দেওয়ার পরিবর্তে খাবার ও পুষ্টি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করে।
 
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকত্বের সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে খাবারের ক্ষেত্রে, অনেক সময় প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে। কোনও শিশু একটি নির্দিষ্ট খাবার খেতে অস্বীকার করলে, কোনও মা স্তন্যপান করাতে সমস্যায় পড়লে অথবা নতুন খাবার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিষয়ে অনিশ্চিত হলে দ্রুত উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এলিনার পদ্ধতি সেই অনিশ্চয়তার কিছুটা জায়গা প্রমাণভিত্তিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টা করে।
 
এলিনা দাউদানি
 
তাঁর দর্শন শুধু পুষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। Momfunda-তে নবজাতকের যত্ন, অভিভাবকত্ব, বেবি-ওয়্যারিং, কাপড়ের ডায়াপার ব্যবহার, বিভিন্ন পণ্যের পর্যালোচনা এবং শৈশবের প্রাথমিক পর্যায়ের আরও নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্ল্যাটফর্মটির এই বিস্তৃত পরিসরই প্রতিফলিত করে এলিনার বিশ্বাস, একটি শিশুর সুস্থতাকে আলাদা আলাদা বিষয়ের মধ্যে ভাগ করে দেখা যায় না। খাবার, যত্ন, দৈনন্দিন রুটিন, মায়ের সুস্থতা এবং শিশুর বিকাশ সম্পর্কে পরিবারের বোঝাপড়া, সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
 
এলিনার উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘Indian Galactagogues’ নামের একটি বই, যেখানে স্তন্যপান বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় খাবার ও বিভিন্ন উপাদান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বইটি প্রসব-পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। এই কাজের মাধ্যমে এলিনা ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির পরিচিত ঐতিহ্যকে পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
 
যে দেশে খাবার গভীরভাবে পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে তাঁর কাজ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দাদি-ঠাকুমা, মা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নতুন মা বা শিশুর কী খাওয়া উচিত, সে সম্পর্কে নানা জ্ঞান ও ধারণা চলে আসছে। এর কিছু অংশ মূল্যবান হতে পারে, আবার কিছু দাবি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় টিকেও নাও থাকতে পারে। এলিনার কাজ মায়েদের এই ধরনের প্রথাগুলোকে অন্ধভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করে পুষ্টিবিজ্ঞানের আলোকে পর্যালোচনা করার সুযোগ করে দেয়।
 
ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে সমসাময়িক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার এই সক্ষমতাই একজন পুষ্টিবিদ হিসেবে এলিনার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে, এলিনার যাত্রা দেখায় যে শিক্ষাগত দক্ষতাকে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজে লাগাতে ইচ্ছুক নারীদের জন্য কতটা সম্ভাবনা রয়েছে। Momfunda শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়; এটি বিশেষায়িত জ্ঞানকে শ্রেণিকক্ষ, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলার একটি প্রয়াস।
 
এলিনা দাউদানি
 
তাঁর কাজ ডিজিটাল যুগে নারীদের পরিবর্তিত ভূমিকার দিকটিও তুলে ধরে। ইন্টারনেট বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন পেশাদারদের নিজেদের নিকটবর্তী গণ্ডির বাইরে আরও বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিয়েছে। এলিনার ক্ষেত্রে ডিজিটাল শিক্ষা হয়ে উঠেছে এমন মায়েদের কাছে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম, যারা হয়তো রাত দুটোতেও নির্ভরযোগ্য উত্তরের খোঁজ করছেন, শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক মাসের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছেন অথবা ভালো পুষ্টি বলতে ঠিক কী বোঝায়, তা বোঝার চেষ্টা করছেন।
 
তাঁর প্যারামেডিক্যাল অভিজ্ঞতা তাঁর কাজের ব্যবহারিক দিকটিকেও আরও শক্তিশালী করেছে। পুষ্টিকে একটি বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসেবে না দেখে তিনি শিশুপালনকে একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন, যেখানে জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ এবং দৈনন্দিন যত্ন, সবকিছুকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।
 
তিনি যে বিষয়টি বেছে নিয়েছেন, তার সঙ্গে একটি গভীর মানবিক দিকও জড়িয়ে রয়েছে। একজন মা যখন তাঁর শিশুকে খাওয়ান, তখন তিনি শুধু শিশুকে ক্যালোরি দিচ্ছেন না। তিনি শিশুর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করছেন, তার পছন্দের প্রতি সাড়া দিচ্ছেন, তার সংকেতগুলো বুঝতে শিখছেন এবং খাবারের সঙ্গে শিশুর জীবনের প্রথম দিকের কিছু সম্পর্ক তৈরি করছেন। তাই এই প্রক্রিয়াটি মায়েদের বুঝতে সাহায্য করা একটি মাত্র খাবারের বাইরেও পুরো পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
 
শেষ পর্যন্ত এলিনা দাউদানির গল্প জ্ঞানকে ক্ষমতায়নে রূপান্তরিত করার গল্প। তাঁর শিক্ষাগত যাত্রা তাঁকে দিয়েছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি; মাতৃ ও শিশু পুষ্টির প্রতি তাঁর আগ্রহ দিয়েছে কাজের উদ্দেশ্য; আর Momfunda সেই জ্ঞানকে দিয়েছে একটি প্ল্যাটফর্ম। তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা সবসময় কোনও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বা বাণিজ্যিক সুযোগ থেকে শুরু হয় না। কখনও কখনও এটি একটি প্রশ্ন থেকেই শুরু হতে পারে, আমি কীভাবে অন্য কারও জন্য কোনও বিষয়কে আরও সহজ করে তুলতে পারি?
 

এলিনার ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নই তাঁকে মা ও শিশুদের জন্য নিবেদিত একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির পথে নিয়ে গেছে।তিনি যখন Purdue University-তে Nutrition Science বিষয়ে পিএইচডি চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন তাঁর যাত্রা শিক্ষা, উদ্যোক্তা-ভাবনা এবং সেবার একসঙ্গে মিলিত হওয়ার একটি উদাহরণ হয়ে রয়েছে। তাঁর বই, কোর্স এবং ডিজিটাল রিসোর্সের মাধ্যমে তিনি মায়েদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আরও বেশি জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পালন করতে সাহায্য করছেন।
 
এভাবেই এলিনা দাউদানি শুধু একটি পেশাগত পরিচয় তৈরি করেননি। তিনি পুষ্টিবিজ্ঞান এবং মাতৃত্বের দৈনন্দিন জগতের মধ্যে একটি সেতু গড়ে তুলেছেন, যেখানে সচেতন সিদ্ধান্তই হয়ে উঠতে পারে একটি শিশুর সুস্থ জীবনের সূচনার ভিত্তি।