শিক্ষকতার মোহ: আকর্ষণীয় ওকালতির পেশা ছেড়ে শ্রেণিকক্ষের পৃথিবী বেছে নেওয়া শেহনাজ রহমান

Story by  Munni Begum | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
শেহনাজ রহমান
শেহনাজ রহমান
 
মুন্নি বেগম / গুয়াহাটি

শিক্ষকতার মোহ এমনও হতে পারে যে, একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী আদালতের ব্যস্ততা তথা ওকালতির মতো আকর্ষণীয় পেশা ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন শ্রেণিকক্ষের পৃথিবী। পেশাগত সাফল্য, পরিচিতি এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করার পরও তাঁর মন তাঁকে সেই পেশার প্রতি আকৃষ্ট করে আসছিল, যে পেশার স্বপ্ন তিনি শৈশব থেকেই হৃদয়ের নিভৃত কোণে লালন করে আসছিলেন। আদালতের মেঝেতে আইনের লড়াই চালানোর পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান বিলিয়ে আসা গুয়াহাটির প্রবীণ আইনজীবী শেহনাজ রহমানের কাছে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতাই হয়ে উঠেছিল জীবনের সবচেয়ে প্রিয় অধ্যায়। আইনি পেশা তাঁকে পরিচয় দিয়েছিল, কিন্তু শিক্ষকতার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য।

গুয়াহাটির পাঞ্জাবাড়িস্থিত বিষ্ণুরাম মেধি সরকারি আইন মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক তথা প্রবীণ আইনজীবী, আইনি মধ্যস্থতাকারী শেহনাজ রহমানের কাছে শিক্ষকতা শুধুমাত্র একটি চাকরি নয়, বরং এটি তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবন তাঁকে আদালতের মেঝেতে নিয়ে গিয়েছিল এবং হাতে তুলে দিয়েছিল আইনের বই; তবুও শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরে এসেছিলেন সেই জায়গায়, যেখানে তাঁর মন ছোটবেলা থেকেই পড়ে ছিল, সেটি হলো শিক্ষকতা। কারণ শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধুমাত্র কর্মজীবনের একটি অধ্যায় নয়, এটি তাঁর হৃদয়ের টান।
 
এক অনুষ্ঠানে বিষ্ণুরাম মেধি সরকারি আইন মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক তথা প্রবীণ আইনজীবী শেহনাজ রহমান
 
শৈশব থেকেই শেহনাজ রহমান সবসময় একজন শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি কটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি সম্পূর্ণ করার পর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ডক্টরেট ডিগ্রিও সম্পূর্ণ করেছিলেন। ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পূর্ণ করার মূল উদ্দেশ্য ছিল, ভবিষ্যতে যাতে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। সেই সময়েই শেহনাজ আইনের ডিগ্রিও লাভ করেছিলেন।
 
কিন্তু জীবনের গতিপথ সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। ডক্টরেট সম্পূর্ণ করার সময় তাঁর কর্মজীবনের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন এসেছিল। ডক্টরেট সম্পূর্ণ করার সময় শিক্ষকতার সুযোগ সহজে না পাওয়ায় তিনি জ্যেষ্ঠ ভগ্নীর পরামর্শে আদালতে ওকালতি শুরু করেছিলেন। ধীরে ধীরে আইনি পেশাতেও নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন শেহনাজ। কিন্তু আদালতের ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর মনের ভিতরে জীবন্ত ছিল শিক্ষক হওয়ার সেই পুরনো স্বপ্নটি।
 
আওয়াজ-দ্য ভয়েস-এর সঙ্গে হওয়া এক কথোপকথনে শেহনাজ রহমান বলেন, "আমি ১৯৮৮ সালে বি বরুয়া  কলেজে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার সুযোগ লাভ করেছিলাম। কিছুদিন পর সেই সময়ে পানবাজারে থাকা সরকারি আইন মহাবিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যক্ষ হরেন কলিতা স্যার আমাকে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে পড়ানোর জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি এই সুযোগটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয়বার কিছু না ভেবেই তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলাম। সেইভাবেই শুরু হয় আমার এক নতুন যাত্রা। অতিথি অধ্যাপক থেকে খণ্ডকালীন অধ্যাপক এবং অবশেষে ১৯৯৫ সালে সরকারি আইন মহাবিদ্যালয়ে পূর্ণকালীনভাবে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেছিলাম।"
 
ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে প্রভাষক তথা প্রবীণ আইনজীবী শেহনাজ রহমান
 
দিনের বেলায় আদালতে আইনি পেশা এবং সন্ধ্যার সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, এই দু’টি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করে শেহনাজ উপলব্ধি করেছিলেন যে, আইন তাঁর জন্য পেশা হতে পারে, কিন্তু শিক্ষকতা তাঁর হৃদয়ের জন্য প্রয়োজন। তিনি বলেন, "আমি দু’টি ক্ষেত্রেই কাজ করে তুলনা করে দেখেছিলাম। আইনি পেশার নিজস্ব একটি আকর্ষণ আছে, কিন্তু শিক্ষকতা থেকে যে সন্তুষ্টি পাই, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা। ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, শিক্ষকতা আমি কখনও ছাড়তে পারব না।"
 
শিক্ষকতা এবং আইনি পেশার এই যুগল অভিজ্ঞতা শেহনাজ রহমানকে একজন অনন্য শিক্ষয়িত্রী হিসেবে গড়ে তুলেছে। আইন শুধু বইয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাস্তব জীবন, আদালত, মানুষ এবং সমাজ। আদালতে কাজ করার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিতে পেরেছেন। আদালত পরিদর্শন, আইন-সচেতনতা শিবির, ব্যবহারিক শিক্ষা অথবা মামলা পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা, এই সমস্ত বিষয় ছাত্রছাত্রীদের নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি সহজেই বোঝাতে পারতেন। তিনি বলেন, "ছাত্রছাত্রীরা বইয়ে পড়ার তুলনায় বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিখলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বুঝতে পারে।"
 
কিন্তু শিক্ষকতার সঙ্গে শেহনাজ রহমানের সম্পর্কের সবচেয়ে আবেগিক অধ্যায়টি লুকিয়ে রয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক অত্যন্ত কঠিন সময়ে। শেহনাজ মেঘালয় সরকারের সরকারি আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তাঁর স্বামী আকস্মিকভাবে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে শেহনাজের জীবন যেন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। তিনি গভীরভাবে মানসিক আঘাতে ভেঙে পড়েছিলেন। আইনি পেশার জন্য যে একাগ্রতা, সময় এবং মানসিক শক্তির প্রয়োজন হয়, সেই সময়ে সেগুলির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। এমন সময়ে শিক্ষকতাই যেন তাঁকে আবার জীবনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল। কারণ শ্রেণিকক্ষে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের প্রশ্ন শোনা, তাঁদের পড়ানো, এই কাজগুলিই ধীরে ধীরে তাঁর মনের দুঃখ ও অশান্তি কমাতে সাহায্য করেছিল। তিনি অনুভব করেছিলেন, শিক্ষকতা যেন তাঁর জন্য এক মানসিক শক্তি।
 
ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে প্রভাষক তথা প্রবীণ আইনজীবী শেহনাজ রহমান
 
শেহনাজ বলেন, "আমার স্বামীর মৃত্যুর পর আমি মানসিকভাবে যথেষ্ট ভেঙে পড়েছিলাম। কিন্তু শিক্ষকতার কাজটি আমাকে একজন মা, একজন চিকিৎসক, একজন বন্ধু তথা একজন পরিবারের সদস্যের মতো বেঁচে থাকার সাহস দেওয়ার পাশাপাশি সাহায্য করেছিল। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে গেলে আমি আমার দুঃখ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যেতে পারতাম। যা আমাকে বেঁচে থাকার জন্য নতুন প্রেরণা ও উৎসাহ দিয়েছিল। জীবনের সঙ্গে লড়াই করার নতুন শক্তি প্রদান করেছিল। সেই কারণেই আমি শিক্ষকতাকে আমার জীবনের জন্য একধরনের থেরাপি বলেও মনে করি।"
 
আজ শেহনাজ রহমানের বহু শিক্ষার্থী আইনজীবী, বিচারিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তিনি বলেন, "আদালতে কোনো প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী আমাকে দেখে যখন আমার কাছে এসে ‘মেম, আমি আপনার ছাত্র ছিলাম’ বলে, সেই সময় আমি যে গর্ব ও সন্তুষ্টি অনুভব করি, তা আমি কোনো পেশাগত সাফল্যের সঙ্গে তুলনা করতে পারি না।"
 
শেহনাজ রহমান বিশ্বাস করেন যে, একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য তাঁর নিজের পদবি বা ব্যক্তিগত সাফল্যে নয়; ছাত্রছাত্রীদের সাফল্যেই সেই সাফল্যের প্রতিফলন দেখা যায়।
 
বিষ্ণুরাম মেধি সরকারি আইন মহাবিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে প্রভাষক তথা প্রবীণ আইনজীবী শেহনাজ রহমানের প্রদীপ প্রজ্বালনের এক মুহূর্ত
 
নতুন প্রজন্মের আইন শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর পরামর্শ সরল, যদিও গভীর। তিনি বলেন, "আমি সবসময় নতুন প্রজন্মের আইন শিক্ষার্থীদের সততা, নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দিই। পড়াশোনায় যেমন আন্তরিকতা প্রয়োজন, আইনি পেশাতেও তেমনই আন্তরিকতার খুবই প্রয়োজন। শুধু একজন ভালো আইনজীবী হওয়াই নয়, একজন সৎ এবং বিশ্বাসযোগ্য আইনজীবী হওয়াটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"
 
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিক্ষাদানের পদ্ধতি বদলেছে। অনলাইন উপকরণের প্রাচুর্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবুও মৌলিক বই, আইন, গবেষণা এবং বিশ্লেষণের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছেন। তাই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উভয়কেই সময়ের সঙ্গে নিজেদের নতুন জ্ঞান দিয়ে সমৃদ্ধ করে রাখতে হবে। প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়াকে তিনি সমর্থন করেন না। কারণ নিজে পড়া, চিন্তা করা এবং কাজ করার অভ্যাস কখনও ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। তিনি ছাত্রছাত্রীদের বই, গবেষণামূলক পত্রিকা এবং মূল আইন পড়তে, গবেষণা করতে, নিজে লিখতে এবং আইনি নথি প্রস্তুত করার দক্ষতা উন্নত করতে উৎসাহিত করেন। তাঁর মতে, আমাদের নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু মৌলিক জ্ঞান, পড়াশোনা এবং বিশ্লেষণের বিকল্প কখনও প্রযুক্তি হতে পারে না।
 
ভবিষ্যতের লক্ষ্য নিয়েও শেহনাজ রহমানের সিদ্ধান্ত অটল। শারীরিকভাবে কখনও দুর্বল হয়ে পড়লেও তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দেবেন না। হয়তো পরবর্তীকালে তিনি বড় শ্রেণিকক্ষে পড়াতে নাও পারবেন। তবুও তিনি ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের হলেও পড়াবেন। কারণ তাঁর কাছে শিক্ষকতা চাকরি নয়, এটি জীবনের অংশ। তিনি বলেন, "আমার জন্য শিক্ষকতা করব কি করব না? এটি কোনো প্রশ্ন নয়। কারণ আমি ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন প্রশ্ন হলো, কোথায় এবং কীভাবে শিক্ষকতা অব্যাহত রাখব। আগামীকাল যদি আমি এই মহাবিদ্যালয়ে কাজ করে যেতে না পারি, তবুও আমি শিক্ষকতা ছেড়ে দেব না। আমি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, আইন বিশ্ববিদ্যালয় অথবা অন্য কোনো মাধ্যমে শিক্ষাদান অব্যাহত রাখব। যেভাবে পারি, যেখানেই পারি, ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে যাব।"
 
ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে প্রভাষক তথা প্রবীণ আইনজীবী শেহনাজ রহমান
 
আইনি পেশা শেহনাজ রহমানকে অভিজ্ঞতা, পরিচয় এবং পেশাগত সাফল্য দিয়েছে। কিন্তু শিক্ষকতা তাঁকে দিয়েছে তার থেকেও বেশি মূল্যবান ‘জীবনের উদ্দেশ্য’। জীবন যখন তাঁকে গভীরভাবে ভেঙে দিয়েছিল, শিক্ষকতা তাঁকে আবার উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল। আর যখন জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি কমে এসেছিল, ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকেই তিনি পেয়েছিলেন বেঁচে থাকার এক নতুন শক্তি। সেই কারণেই শেহনাজ রহমানের জীবনকে হয়তো এক কথায় বলা যায়, আদালত তাঁকে আইন শিখিয়েছিল, কিন্তু শ্রেণিকক্ষ তাঁকে জীবন শিখিয়েছিল।
 
এই শিক্ষক দিবসের প্রাক্‌মুহূর্তে তাঁর কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা অন্যের জীবন আলোকিত করার জন্য যে আলো বিলিয়ে দিই, কখনও কখনও সেই একই আলোই আমাদের নিজেদের জীবনের অন্ধকার সময়েও পথ দেখায়।


শেহতীয়া খবৰ