বিশ্বধর্মের অন্তঃস্বর: বিভাজনের ঊর্ধ্বে এক সত্য

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 9 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
  পল্লব ভট্টাচার্য

“ধর্ম হলো জনসাধারণের আফিম।”- কার্ল মার্কস

“আমি ভালো কাজ করলে ভালো লাগে, খারাপ কাজ করলে খারাপ লাগে, এটাই আমার ধর্ম।” - আব্রাহাম লিংকন
 
“আমার ধর্ম খুবই সহজ-আমার ধর্ম হলো দয়া।” - দালাই লামা
 
“ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান খোঁড়া, বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম অন্ধ।” - আলবার্ট আইনস্টাইন
 
সহস্রাব্দ প্রাচীন ধর্ম নিয়ে এই ভিন্নমুখী ও বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গিগুলি আজকের অস্থির ও সংঘাতপূর্ণ বিশ্বপরিস্থিতিতে নতুন করে গভীর আলোচনার দাবি রাখে। একুশ শতকে দাঁড়িয়েও বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় উত্তেজনা ও সংঘাত অব্যাহত। আজও ধর্ম ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের জীবনে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে চলেছে, যেখানে মানুষ ও নেতারা এক ধর্মীয় পরিচয়কে আরেকটির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সব ধর্ম কি সত্যিই একে অপরের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা? যদি আমরা বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলির মূল ধর্মগ্রন্থে ফিরে যাই, তবে কী দেখতে পাব? পার্থক্যের পাহাড়, না কি ঐক্যের এক বিশাল সাগর?
 
দালাই লামা  ও আলবার্ট আইনস্টাইন 
 
এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়াসই করেছেন ত্রিলোচন শাস্ত্রী, অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (ADR)-এর চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি, সেন্টার ফর কালেক্টিভ ডেভেলপমেন্ট (CCD)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক এবং ফার্মভেদার প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর সাম্প্রতিক গ্রন্থ “The Essentials of World Religions”-এ।
 
মানব ইতিহাসের বিস্তৃত বুননে ধর্ম বরাবরই সংস্কৃতি, সমাজ এবং ব্যক্তিজীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ধর্মের নানান দিকের মধ্যে মিস্টিসিজম বা আধ্যাত্মিক রহস্যবাদ এক বিশেষ আকর্ষণীয় অধ্যায়। অলৌকিক ঘটনা ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত এই রহস্যবাদ বিভিন্ন ধর্মীয় কাহিনিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। যেমন, যিশু খ্রিস্টের অলৌকিক কার্যকলাপের বিশ্বাস মানুষকে বিস্মিত ও আকৃষ্ট করে। তবে একজন প্রকৃত নবী বা ধর্মগুরুর পরিচয় কেবল অলৌকিক ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত নবী হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি মানুষের হৃদয় ও মন পরিবর্তন করতে পারেন, জীবনে শান্তি ও সুখের আলো জ্বালাতে পারেন। এই অন্তরঙ্গ ও গভীর মানবিক সংযোগই প্রকৃত আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের আসল পরিচয়।
 
ইসলামের সার্বজনীনতা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয় তার মৌলিক নীতিমালা, পাঁচ স্তম্ভের মাধ্যমে। এর কেন্দ্রে রয়েছে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। এই একেশ্বরবাদী ধারণা বহু ধর্মেই প্রতিধ্বনিত, যা একটি সর্বজনীন ঈশ্বরচেতনার ইঙ্গিত দেয়। যদিও মূল বিশ্বাস অভিন্ন, ঈশ্বরকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মভেদে ভিন্ন। কেউ তাঁকে মানুষের আত্মার অন্তর্গত উপস্থিতি হিসেবে অনুভব করেন, আবার কেউ তাঁকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ন্ত্রণকারী এক বহিরাগত শক্তি হিসেবে কল্পনা করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থেকেই নানা ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের জন্ম হয়, তবু এক ঈশ্বরের ধারণা বিভিন্ন ধর্মকে একসূত্রে গাঁথে।
 
“The Essentials of World Religions” বইয়ের প্রচ্ছদ
 
ধর্মীয় সংঘাতের কারণ হিসেবে প্রায়শই মতাদর্শগত পার্থক্যের কথা বলা হলেও, বাস্তবে এর উৎস অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থ ও পুরোহিততন্ত্রের প্রভাব। পশ্চিম এশিয়ার মতো অঞ্চলের ইতিহাস দেখায়, শান্তি ও অহিংসার বার্তা বহনকারী ধর্মীয় শিক্ষাকে কীভাবে ক্ষমতার লড়াইয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে ধর্ম সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয় এবং করুণা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার মূল শিক্ষা আড়ালে চলে যায়। রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার কেবল তার মূল সত্তাকেই বিকৃত করে না, বরং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে বিভেদ ও বিদ্বেষও বাড়িয়ে তোলে।
 
বৌদ্ধধর্ম মানবজীবনের দুঃখকে অনন্য দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে। জন্ম, বার্ধক্য ও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়কে সে অনিবার্য দুঃখের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে। এই উপলব্ধি মানুষের অস্তিত্বগত প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দুঃখের স্বরূপ স্বীকার করেই বৌদ্ধধর্ম মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়, যেখানে সচেতনতা, করুণা ও অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে অন্তরশান্তির সন্ধান করা হয়।
 
আজকের বিশ্বে ধর্ম এখনও অসংখ্য মানুষের কাছে আশ্রয় ও সান্ত্বনার উৎস। অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক উগ্রতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল সমস্যায় সমাজ যখন বিপর্যস্ত, তখন এই সংকটগুলি আরও গভীরতর হয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৈষম্য ও বেকারত্ব বাড়ায়, রাজনৈতিক চরমপন্থা সমাজকে বিভক্ত করে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তোলে। এই সবকিছুর মাঝখানে ধর্ম একদিকে যেমন আশ্বাস দেয়, অন্যদিকে তেমনই সংঘাতের ক্ষেত্রও হয়ে ওঠে।
 
প্রতীকী ছবি
 
এই সংকট আরও জটিল হয় ভ্রান্ত তথ্যের দ্রুত বিস্তার, সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ এবং ভিন্ন বিশ্বাসব্যবস্থার মধ্যে টানাপোড়েনে। ডিজিটাল প্রযুক্তি তথ্যের প্রবাহ বাড়ালেও ভুয়ো খবর ও ক্ষতিকর ধারণা ছড়ানোর পথও প্রশস্ত করেছে। এর ফলে ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে, জন্ম নেয় অবিশ্বাস ও শত্রুতা। এই অস্থির সময়ে ধর্ম অনেকের কাছে আশ্রয় হলেও, কারও কাছে তা দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
 
ইহুদি ধর্মের উদ্ভব প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে, খ্রিস্টধর্ম প্রথম শতাব্দীতে, ইসলাম ৬১০ খ্রিস্টাব্দে, হিন্দুধর্ম খ্রিস্টপূর্ব ২৩০০ থেকে ১৫০০ সালের মধ্যে, বৌদ্ধধর্ম খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে এবং শিখধর্ম পঞ্চদশ শতকে, প্রতিটি ধর্মই ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করে সেই সময়ের সমস্যার সমাধান দিতে চেয়েছে। এই প্রেক্ষাপট বোঝা সব ধর্মাবলম্বীর জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই মৌলিক বিষয়গুলির অজ্ঞতাই আজ মানবজাতির বহু সমস্যার মূল কারণ।
 
ধর্মকে বোঝার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে ধর্মগ্রন্থ, তার ব্যাখ্যা ও আধ্যাত্মিক নেতাদের চিন্তাধারা সবই গুরুত্ব পায়। এই অনুসন্ধান আমাদের দেখায়, ধর্মের মূল সত্তা গভীর ও মানবিক হলেও, তার প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা থেকেই অনেক সময় সংঘাতের জন্ম হয়। এই ব্যবধানটি চিহ্নিত করাই পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহনশীলতা বৃদ্ধির চাবিকাঠি।
 
প্রতীকী ছবি
 
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বধর্মের অধ্যয়ন আমাদের মানব অস্তিত্বের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক গভীরতায় প্রবেশের আহ্বান জানায়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃত জ্ঞান নিহিত রয়েছে আমরা যা জানি না, তার বিশালতার স্বীকৃতিতে। বিশ্বধর্মের মৌলিক সত্তা অন্বেষণের মধ্য দিয়ে আমরা উপলব্ধি করি সেই অভিন্ন মূল্যবোধগুলি, যা আমাদের মানুষ হিসেবে একসূত্রে বাঁধে, সত্যের সন্ধান, অর্থের খোঁজ এবং বৃহত্তর কিছুর সঙ্গে সংযোগের আকাঙ্ক্ষা। এই উপলব্ধির পথ ধরেই আমরা বিভেদের প্রাচীর ভেঙে গড়ে তুলতে পারি এক অধিকতর সৌহার্দ্যপূর্ণ ও মানবিক বিশ্ব।