কাশ্মীরের অস্থির সময়ে উঠে আসা এক নারী নেত্রী: মেহবুবা মুফতির রাজনৈতিক পথচলা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 11 h ago
কাশ্মীরের অস্থির সময়ে উঠে আসা এক নারী নেত্রী, মেহবুবা মুফতির রাজনৈতিক পথচলা
কাশ্মীরের অস্থির সময়ে উঠে আসা এক নারী নেত্রী, মেহবুবা মুফতির রাজনৈতিক পথচলা
 
এহসান ফাজিলি 

জম্মু ও কাশ্মীরের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মেহবুবা মুফতি রাজ্যের রাজনীতিতে একটি বিশেষ স্থান দখল করেছেন। সশস্ত্র জঙ্গিবাদের তীব্র সময়ে, যখন স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, তখনই তিনি রাজনৈতিক মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীরের নবম এবং শেষ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যখন রাজ্যটি এখনও পূর্ণাঙ্গ রাজ্য ছিল।
 
আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে, ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমবার রাজনৈতিক অঙ্গনে সামনে আসেন। তখন প্রায় সাত বছর ধরে সশস্ত্র বিদ্রোহের কারণে রাজ্যে নির্বাচন হয়নি এবং দীর্ঘ সময় রাজ্যটি গভর্নর শাসন ও রাষ্ট্রপতি শাসনের অধীনে ছিল। বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি সংগঠনগুলির হুমকির কারণে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক নেতাই নির্বাচনে অংশ নিতে দ্বিধা করছিলেন।
সেই সময় রাজ্যের প্রধান দুটি দল ছিল ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং কংগ্রেস। ১৯৯৬ সালের লোকসভা নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ন্যাশনাল কনফারেন্স অংশ না নিলে কংগ্রেস রাজ্যের ছয়টি আসনেই জয়লাভ করে। পরে একই বছরের সেপ্টেম্বরে ফারুক আবদুল্লাহ-র নেতৃত্বে ন্যাশনাল কনফারেন্স বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেয়।
 
বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের জন্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে নিজের বাবা মুফতি মোহাম্মদ সৈয়দের সমর্থনে মেহবুবা মুফতি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। দক্ষিণ কাশ্মীরের আনন্তনাগ জেলার বিজবেহারা কেন্দ্র থেকে প্রথমবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি রাজনৈতিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সৈয়দ, যিনি আগে ভি.পি. সিং-এর জনমোর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, পরে আবার কংগ্রেসে ফিরে এসে সেই নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেন। যদিও ন্যাশনাল কনফারেন্স ৮৭ সদস্যের বিধানসভায় ৫৭টি আসন জিতে বড় জয় পায়, কংগ্রেস পায় মাত্র সাতটি আসন। সেই সময় মেহবুবা মুফতি কংগ্রেস লেজিসলেটিভ পার্টির নেতা হিসেবে উঠে আসেন।
 
১৯৫৯ সালের ২২ মে জন্মগ্রহণ করেন মেহবুবা মুফতি। জম্মুর একটি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮০–এর দশকের শুরুতে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি জাভেদ ইকবাল মুফতিকে বিয়ে করেন। কয়েক বছর পর তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। তাঁদের দুই কন্যা, ইলতিজা মুফতি ও ইরতিকা মুফতি। ১৯৮৭ সালের শেষ দিকে তিনি দিল্লিতে চাকরির জন্য চলে যান এবং পরে ১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হলে কাশ্মীরে ফিরে আসেন।
 
একটি সভায় বক্তৃতা দেওয়াকালীন মেহবুবা মুফতি
 
রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ মূলত বাবার কাছ থেকেই আসে। মুফতি মোহাম্মদ সৈয়দ তখন তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন। ১৯৯৯ সালে বাবা–মেয়ে কংগ্রেস ত্যাগ করে পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) প্রতিষ্ঠা করা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে। ন্যাশনাল কনফারেন্সের বিকল্প আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠা এই দল ধীরে ধীরে কাশ্মীর, জম্মু ও লাদাখ, তিন অঞ্চলেই নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। দল প্রতিষ্ঠার পর মুফতি মোহাম্মদ সৈয়দ, মেহবুবা মুফতি এবং মুজাফফর হুসেইন বেগ রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে জনসমর্থন গড়ে তুলতে কাজ করেন, যখন রাজ্য জুড়ে সশস্ত্র জঙ্গিবাদ তীব্র ছিল এবং বহু অঞ্চল সরকারি সুযোগ–সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। সেই সময় রাজ্যে ফারুক আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন সরকার (১৯৯৬–২০০২) ক্ষমতায় ছিল।
 
১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে শ্রীনগর আসন থেকে ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রার্থী ওমর আবদুল্লাহ-র বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মেহবুবা মুফতি পরাজিত হন। এরপর পরবর্তী তিন বছর পিডিপি নেতৃত্ব রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালিয়ে জনসমর্থন বাড়াতে থাকে।
 
২০০২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পিডিপি প্রথমবার ১৬টি আসন জিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়। ন্যাশনাল কনফারেন্স পায় ২৮টি এবং কংগ্রেস পায় ২০টি আসন। মেহবুবা মুফতি আনন্তনাগ জেলার পাহেলগাম কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। পরে তিনি আসনটি ছেড়ে দেন, যাতে তাঁর বাবা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিধানসভার সদস্য হতে পারেন। সরকার গঠনের জন্য ৪৪টি আসন প্রয়োজন ছিল, ফলে জোট সরকার গঠন ছাড়া উপায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত মুফতি মোহাম্মদ সৈয়দ কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গড়ে সরকার গঠন করেন। চুক্তি অনুযায়ী, দুই দল তিন বছর করে মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকবে। মুফতি ২০০২ সালের ২ নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রী হন এবং ২০০৫ সালের ২ নভেম্বর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন কংগ্রেস নেতা গুলাম নবী আজাদ। তবে অমরনাথ জমি বিতর্কের জেরে ২০০৮ সালের জুলাই মাসে আজাদের সরকার পতন ঘটে।
 
মেহবুবা মুফতি 
 
এদিকে ২০০৪ সালে মেহবুবা মুফতি আনন্তনাগ থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দক্ষিণ কাশ্মীরের শোপিয়ান জেলার ওয়াচি কেন্দ্র থেকে জিতে তিনি ২০১৪ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করেন। ২০১৪ সালে আবারও আনন্তনাগ থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হন।
 
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর একই বছরের নভেম্বর–ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে আবারও ভাঙা রায় আসে। পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি ২৮টি এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২৫টি আসন পায়। দীর্ঘ আলোচনা শেষে মুফতি মোহাম্মদ সৈয়দ বিজেপির সঙ্গে জোট করে ২০১৫ সালের ১ মার্চ সরকার গঠন করেন।
 
কিন্তু ২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি মুফতি মোহাম্মদ সৈয়দের মৃত্যু হলে জোট সরকার ভেঙে পড়ে এবং রাজ্যে গভর্নর শাসন জারি হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল মেহবুবা মুফতি পিডিপি–বিজেপি জোট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বিজেপি সমর্থন প্রত্যাহার করলে সরকার পতন হয় এবং আবারও গভর্নর শাসন ও পরে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। পরে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ এবং অনুচ্ছেদ ৩৫এ বাতিল করা হয় এবং রাজ্যকে ভেঙে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ, দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
 
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আনন্তনাগ থেকে তিনি ন্যাশনাল কনফারেন্স প্রার্থী হাসনাইন মাসুদি-র কাছে পরাজিত হন। ২০২৪ সালে আনন্তনাগ–রাজৌরি আসনে মিয়ান আলতাফ-এর কাছেও হারেন। একই বছর পুনর্গঠিত ৯০ আসনের জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভা নির্বাচনে পিডিপি মাত্র তিনটি আসন পায়।
 
মেহবুবা মুফতি
 
২০১৯ সালের ৫ আগস্ট বিশেষ মর্যাদা বাতিলের আগে পিডিপি, ন্যাশনাল কনফারেন্সসহ বিভিন্ন দলের বহু নেতার সঙ্গে মেহবুবা মুফতিকেও আটক করা হয়। ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ফারুক আবদুল্লাহ ও ওমর আবদুল্লাহও আটক ছিলেন। প্রায় দেড় মাস পর তাঁর মেয়ে ইলতিজা মুফতি তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্ট পরিচালনা শুরু করেন এবং শীতকালে ভালো সুযোগ–সুবিধাযুক্ত স্থানে মাকে স্থানান্তরের জন্য শ্রীনগরের ডেপুটি কমিশনারকে চিঠি লেখেন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাবলিক সেফটি অ্যাক্টের অধীনে আটক হওয়ার পর অবশেষে ২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর মেহবুবা মুফতি মুক্তি পান।
 
২০২০ সালের ২০ অক্টোবর মেহবুবা মুফতি এবং ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ফারুক আবদুল্লাহ মিলে পিপলস অ্যালায়েন্স ফর গুপকার ডিক্লারেশন গঠন করেন। এতে ন্যাশনাল কনফারেন্স, পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি, সিপিআই(এম) এবং বেগম খালিদা শাহ-এর আওয়ামী ন্যাশনাল কনফারেন্স অংশ নেয়। পরে সাজাদ গনি লোন এবং জম্মু ও কাশ্মীর পিপলস মুভমেন্ট এই জোট থেকে দূরে সরে যায়। এই জোটের মূল দাবি ছিল অনুচ্ছেদ ৩৭০ ও ৩৫এ পুনর্বহাল করা। তবে ২০২৪ সালে জোটটি ভেঙে যায়, যখন রাজ্যের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণ রাজ্য মর্যাদা পুনরুদ্ধারের দাবিতে জোর দেয়।