দিনহাটার মাটি থেকে উঠে আসা এক অদম্য কণ্ঠস্বর: সাজিদা পারভিনের লড়াই
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
দিদি নাম্বার 1-এর মঞ্চে যিনি অনন্যা দিদি হিসেবে সারা বাংলার সামনে উঠে এসেছিলেন তাঁর জন্য কোনো বিশেষণই যথেষ্ট নয়। তিনি নিজ গুণে অনন্যা। পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার দিনহাটার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা সাজিদা পারভিন আজ উত্তরবঙ্গ জুড়ে নারীর অধিকার রক্ষার এক শক্তিশালী নাম।
সমাজের প্রান্তিক, শ্রমজীবী নারী, ট্রান্স ও ক্যুইয়ার মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন প্রতিবাদের এক মজবুত প্ল্যাটফর্ম। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘প্রমীলা বাহিনী’ আজ শুধুমাত্র একটি সংগঠন নয়, বরং এক সংগ্রামী চেতনার প্রতীক।
কোচবিহার গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর সহজ জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। কিন্তু সাজিদা বেছে নিয়েছেন কঠিন পথ। তিনি উপলব্ধি করেছেন, গ্রামবাংলার অসংখ্য নারী আজও মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার। অল্পবয়সে বিয়ের চাপ, পারিবারিক সহিংসতা, সম্পত্তি থেকে বঞ্চনা, এই বাস্তবতাই তাঁকে আন্দোলনের পথে নামতে বাধ্য করে।
সাজিদার নেতৃত্বে ‘প্রমীলা বাহিনী’ বর্তমানে কোচবিহারের ১২টি ব্লকে সক্রিয়। প্রায় ১৮ হাজার সদস্য নিয়ে এই প্ল্যাটফর্ম নির্যাতিতা ও সম্পত্তি-বঞ্চিত নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে দৃঢ়ভাবে। গৃহ-সহিংসতার শিকার নারীদের আইনি সহায়তা থেকে শুরু করে জমি ও সম্পত্তির অধিকারের লড়াই, সব ক্ষেত্রেই সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শুধু তাই নয়, তাঁর প্রচেষ্টায় ৪,৫০০-রও বেশি নারী মনরেগা প্রকল্পে কাজের সুযোগ পেয়েছেন, যা তাঁদের আর্থিক স্বনির্ভরতার পথে বড় পদক্ষেপ।
একটি অনুষ্ঠানে সাজিদা পারভিন
তিনি কেবল সংগঠন পরিচালনাতেই সীমাবদ্ধ নন। একজন সামাজিক কর্মী হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন নিজের কর্মযজ্ঞের খাতিরে। নারী অধিকার, শিশু সুরক্ষা এবং ট্রান্স ও ক্যুইয়ার মানুষের শ্রম অধিকারের প্রশ্নে বিভিন্ন মঞ্চে বক্তব্য রেখেছেন। তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টার জন্য একাধিক জায়গায় সম্মানিতও হয়েছেন।
সম্প্রতি, নারী দিবস উদযাপন মঞ্চ ও প্রমীলা বাহিনীর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের প্রাক্কালে ২ মার্চ ২০২৬ দিনহাটা বাস স্ট্যান্ড থেকে দিনহাটা চৌপথী পর্যন্ত যে মহতী মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে, তার অন্যতম প্রেরণাশক্তি সাজিদা পারভিন। তাঁর আহ্বান, শ্রমজীবী, পেশাজীবী নারী, ট্রান্স ও ক্যুইয়ার মানুষ সকলে যেন একসঙ্গে পা মেলান। কারণ তাঁর বিশ্বাস, দাবি যত বড়, লড়াইও তত শক্তিশালী হতে হবে।
সাজিদা পারভিনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা 'প্রমীলা বাহিনী' সংগঠন
সাজিদা পারভিন সমাজের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছুড়ে দিয়েছেন, নারী সব সময় নারীর শত্রু নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এক নারীই অন্য নারীর ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারেন। শিশু ও নাবালিকাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, সাবালক হওয়ার আগেই বিয়ের চাপ, এসবের বিরুদ্ধে তিনি অদম্য তেজ ও সাহস নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন।
দিনহাটার এই সাধারণ পরিসর থেকে উঠে আসা নারী আজ প্রমাণ করেছেন, পরিবর্তনের জন্য বড় মঞ্চ নয়, বড় মনোবলই যথেষ্ট। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শক্তিশালী বাহিনী সমাজকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে পরিবর্তন সম্ভব। সাজিদা পারভিন তাই কেবল একজন সমাজকর্মী নন, তিনি এক যোদ্ধা, নারীর অধিকারের নির্ভীক প্রহরী।