পল্লব ভট্টাচার্য
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ শুধু একটি নতুন সরকারই নির্বাচন করেনি, একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যাকরণও বেছে নিয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির ব্যাপক জয় এবং একই সঙ্গে একটি বিস্তৃত সাংবিধানিক গণভোটের অনুমোদন আঠারো মাসের অন্তর্বর্তী অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি চিহ্নিত করেছে, যা শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনার নাটকীয় পতনের পর। ভারতের জন্য, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামকে কেন্দ্র করে সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য, ঢাকার পরিবর্তন ঘনিষ্ঠ, ঐতিহাসিক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক বরাবরই উষ্ণতা ও সতর্কতার মাঝে দোদুল্যমান থেকেছে। ১৯৭১ সালে ভারত দ্ব্যর্থহীনভাবে সমর্থন দিয়েছিল মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে। মুক্তিযুদ্ধ যে আবেগময় ও কৌশলগত বন্ধন নির্মাণ করেছিল, তা আজও ভিত্তিমূল। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫, এই প্রথম পর্যায় ছিল অসামান্য সামঞ্জস্যের, যা গড়ে উঠেছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ও যৌথ বেদনায়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে মুজিব হত্যা বাংলাদেশের আদর্শগত পথ পরিবর্তন করে দেয়। সামরিক সমর্থিত শাসনব্যবস্থার উত্থান এবং পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আরোহন “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”-এর সূত্রপাত ঘটায়, যা সচেতনভাবে দূরত্ব তৈরি করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আত্মীয়তার সূত্র থেকে।
নব্বই দশকের শুরুতে বিএনপি প্রথম ক্ষমতায় এলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রবেশ করে সন্দেহ-প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন পর্যায়ে। পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভিবাসন, এ তিনটি বিষয় বারবার উত্তেজনার কারণ হয়ে ওঠে। নব্বই দশকের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের সংক্ষিপ্ত আমলে ব্যবহারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যার মধ্যে ছিল উল্লেখযোগ্য গঙ্গা জল চুক্তি। কিন্তু ২০০১–২০০৬ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ভারতীয় নিরাপত্তা মহলে জমে থাকা অভিজ্ঞতা আজও এক নিম্নবিন্দু হিসেবে স্মরণ করা হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন, যেমন ULFA এবং NSCN, বাংলাদেশে আশ্রয় পায়। চট্টগ্রামে কুখ্যাত ১০-ট্রাক অস্ত্র জব্দকাণ্ড দু’দেশের আস্থার ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলে।
২০০৯ থেকে ২০২৪, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকাল, প্রায়শই ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের “সুবর্ণ অধ্যায়” হিসেবে বিবেচিত। ঢাকার সন্ত্রাস দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে স্থিতিশীলতা দিয়েছে। জমি-সীমান্ত জটিলতা মিটেছে, ছিটমহল বদল হয়েছে, আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্প বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যুৎ গ্রিড যুক্ত হয়েছে, পাইপলাইন নির্মিত হয়েছে, বাণিজ্য অভূতপূর্বভাবে বিস্তৃত হয়েছে। আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও মিজোরামের জন্য বাংলাদেশ এক প্রতিবেশী নয়, একটি অর্থনৈতিক করিডর হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গও আগের উদ্বেগ থেকে অনেকটাই মুক্তি পেয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির এই পালাবদল সেই সমীকরণকে নতুন রূপ দিচ্ছে। বিএনপির জয় তারেক রহমানকে দিয়েছে প্রভাবশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ইসলামপন্থী জোট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। গণভোটে ৭৩ শতাংশ সমর্থনে সংবিধানে এসেছে পরিবর্তন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং “বাঙালি জাতীয়তাবাদ” ও “ধর্মনিরপেক্ষতা”-র জায়গায় সমতা, মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার মতো ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কৌশলগত অর্থে, বাংলাদেশ তার পরিচয়কে সাংস্কৃতিক মিলের বদলে সার্বভৌম স্বাতন্ত্র্যের ওপর দাঁড় করাতে চাইছে।
ভারতের জন্য, বিশেষত আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য, এই উদ্বেগ বাস্তব। ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত নদী ও জঙ্গলঘেরা, অনেকটাই অরক্ষিত। ঢাকায় স্থিতিশীলতা থাকলে গৌহাটি ও আগরতলাও শান্ত থাকে, এ ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে। ২০০১–২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত আমলে সীমান্তপারের জঙ্গি আস্তানা আসামে সহিংসতা বাড়িয়েছিল। হাসিনার সময় কঠোর দমনাভিযানে এই নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে। আজ উদ্বেগ, নতুন সরকার নিরাপত্তা সহযোগিতায় কম আগ্রহী হলে আবারও উগ্র নেটওয়ার্ক মাথা তুলতে পারে কিনা।
আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা জেএমবি, অতীতে সীমান্ত অতিক্রম করে হামলার সক্ষমতা দেখিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মালদা–মুর্শিদাবাদ, জনগোষ্ঠী, অভিবাসন ও ধর্মীয় প্রভাবের সূক্ষ্ম সমীকরণে সংবেদনশীল। আসামে অভিবাসন প্রশ্নে স্মৃতি এখনো তাজা, সীমান্তপারের কোনও অস্থিরতা সহজেই আবেগকে উসকে দিতে পারে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা সংকটও নতুন মাত্রা যোগ করে, যার প্রতিক্রিয়া কখনও কখনও ভারত পর্যন্ত পৌঁছে।
ভারতের “চিকেনস নেক”, সিলিগুড়ি করিডর, কৌশলগত ভাবনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাংলাদেশ সীমান্তের রংপুর বিভাগের অদূরে। চীনের সহযোগিতায় লালমনিরহাটে অবকাঠামো উন্নয়ন নয়াদিল্লির নজরে। ভারতের উদ্বেগ সম্ভাব্য ঘেরাও নয়, কৌশলগত দুর্বলতা। ঢাকার বিদেশনীতি চীনের দিকে বেঁকে গেলে বা পাকিস্তানি গোয়েন্দা প্রভাব বৃদ্ধি পেলে উত্তর-পূর্বের নিরাপত্তা সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
পাকিস্তানের আইএসআই পুনরায় “ঢাকা সেল” সক্রিয় করতে পারে, এমন আশঙ্কা ভারতীয় নিরাপত্তা মহলে মাঝে মাঝে ওঠে। যদিও এসব দাবি যাচাইসাপেক্ষ, ইতিহাস বলছে, জিও-পলিটিকাল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে অস্থিরতা ছড়ানোর চেষ্টা প্রায়ই হয়। সম্পর্ক যখন টানাপোড়েনপূর্ণ থাকে, তখনই উপ-ক্ষতিকারী নেটওয়ার্কগুলো বেশি সুযোগ পায়। তাই বিএনপির সামনের বড় চ্যালেঞ্জ, সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশকে যেন কোনও ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চে পরিণত হতে না দেওয়া।
তবে ২০২৬ সালের এই পালাবদলকে শুধু নিরাপত্তার চোখে দেখলে ভুল হবে। ভারত–বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আন্তর্নির্ভরতা গভীর ও বহুমাত্রিক। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ইতিমধ্যে ১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। জ্বালানি সহযোগিতা বিদ্যুৎ, পাইপলাইন ও গ্রিড সংযোগ, দু’দেশকেই স্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে, যা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। শুল্ক ছাড় কমলে ঢাকা নতুন বাজার ও বিনিয়োগ খুঁজবে। ভারতের ইইউ-সহ বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তি টেক্সটাইল প্রতিযোগিতায় নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে, ফলে বাংলাদেশ হয়তো চীন বা অন্য অংশীদারদের দিকে আরও ঝুঁকবে।
তারেক রহমান
২০২৬ সালে মীরসরাই ও মংলায় ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল বাতিল হওয়া, একদিকে প্রশাসনিক অসন্তোষ, অন্যদিকে কূটনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ঢাকা নিষ্ক্রিয়তা দেখেছে, নয়াদিল্লি দেখেছে শীতলতা। এই ঘটনাগুলো দ্রুত অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তা বোঝায়। বিএনপির “বাংলাদেশ ফার্স্ট” মনোভাব ভারতবিরোধিতা নয়, এটি সার্বভৌমত্ব-সচেতন। অতীতে ভারতের একদলনির্ভর কূটনীতির অভ্যাস, সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক, এখন কৌশলগতভাবে সীমাবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার তরল বাস্তবতায় সম্পর্কগুলোকে ব্যক্তিনির্ভর নয়, প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য পরিস্থিতি আবেগ ও অর্থনীতির মিশ্রণ। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, পারিবারিক বন্ধন, সবই অটুট। কিন্তু রাজনৈতিক বয়ান দ্রুত পরিচিতি বদলে দিতে পারে। সংবিধান থেকে “ধর্মনিরপেক্ষতা” বাদ যাওয়া দুই বাংলায় ভিন্ন ভিন্ন প্রতিধ্বনি তুলতে পারে। এটি পশ্চাদপসরণ হতে হবে এমন নয়, কিন্তু তা দুই বাংলার প্রতীকী ভাষা বদলে দেয়।
আসামের জন্য ঝুঁকি আরও তীব্র। অভিবাসন প্রশ্ন এখনও রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত। সীমান্তপারের যেকোনো অস্থিরতা, অর্থনৈতিক, জলবায়ুগত কিংবা সংখ্যালঘুতা-সঙ্কটজনিত, রাজ্যকে প্রভাবিত করবেই। তাই বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল শাসন আসামের অভ্যন্তরীণ শান্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তাহলে ভারত কীভাবে এই অনিশ্চয়তাকে সুযোগে রূপান্তর করবে? প্রথমত, নীতিকে ব্যক্তিনির্ভরতার বাইরে আনতে হবে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান সংবেদনশীল, এখানে নীরব ও সতর্ক কূটনীতি জরুরি। দ্বিতীয়ত, নয়াদিল্লিকে স্পষ্ট করতে হবে যে সম্পর্কের ভিত্তি বাংলাদেশের মানুষ ও প্রতিষ্ঠান, কোনও একক রাজনৈতিক শক্তি নয়। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা সহযোগিতা দলীয় পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে হবে, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, মানবিক সীমান্ত নীতি। “জিরো-কিলিং” নীতি, প্রযুক্তি ও সমন্বয়ে বাংলাদেশের মনোভাবকে গুরুত্ব দেবে এবং উগ্রবাদী প্রচারের সুযোগ কমাবে।
প্রতীকী ছবি
চতুর্থত, ভূঅর্থনৈতিক একীকরণকে ত্বরান্বিত করতে হবে, CEPA চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সুরক্ষিত থাকবে। ভারত–নেপাল–ভূটান–বাংলাদেশ বিদ্যুৎ গ্রিড আরও প্রসারিত হলে পারস্পরিক নির্ভরতা অটুট হবে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিকল্প করিডর, মিয়ানমার ও অভ্যন্তরীণ সড়ক পথে, অবিশ্বাসের বার্তা নয়, বাস্তবসম্মত বহুমুখীকরণ। সবশেষে, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হবে- শিক্ষা, গণমাধ্যম, ইতিহাসচর্চা, যুব বিনিময়, যাতে রাজনৈতিক ওঠানামা আস্থা নষ্ট না করে। ভারতের পূর্বের একদলনির্ভর কূটনীতি, এখন বদল জরুরি।
১২ ফেব্রুয়ারির রায় কোনও সংঘাতের পূর্বাভাস নয়, বরং পুনর্মূল্যায়ন। পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্রের মাঝে যে ভৌগোলিক বাস্তবতা রয়েছে, তা সহাবস্থানেরই নির্দেশ দেয়। আসামের শান্তি, পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা এবং উত্তর-পূর্বের যোগাযোগ, সবই বাংলাদেশে স্থিতিশীলতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী। ভারত যদি কৌশলগত ধৈর্য, পারস্পরিক সম্মান ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার সঙ্গে নতুন সরকারকে এগিয়ে নিয়ে যায়, তবে নদীগুলো বিভাজনের নয়, সংহতির স্রোত বয়ে নিয়ে যাবে। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল মঞ্চে সুবিবেচনা লুকিয়ে আছে অতীতের সুবর্ণ স্মৃতিতে নয়, গড়ে ওঠা নতুন সাম্যাবস্থায়।