সুষমা রামচন্দ্রন
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে চতুর্থ বৈশ্বিক শীর্ষ সম্মেলন এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভবিষ্যত প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সমতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ে বিরল আন্তর্জাতিক ঐকমত্য এখানে গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি, এতদিন যেসব আলোচনা মূলত কয়েকটি শক্তিধর দেশের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখানে এবার গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠও গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সম্মেলনের শেষে জারি করা ঘোষণাপত্রে ৮৯টি দেশ স্বাক্ষর করেছে, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও, যারা এর আগে প্যারিসে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত ছিল।
ঘোষণাপত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মানবসম্পদের উন্নয়নের ওপর, যাতে প্রযুক্তির প্রসারের পাশাপাশি সামাজিক ক্ষমতায়নও নিশ্চিত করা যায়। এই লক্ষ্য পূরণে নতুন প্ল্যাটফর্ম ও কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে মৌলিক AI সম্পদকে আরও সাশ্রয়ী করা এবং স্থানীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে, প্রযুক্তির প্রসারে যেন নতুন ধরনের বৈষম্য, অর্থাৎ ‘AI বিভাজন’ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। এজন্য শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো এবং সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
‘AI ইমপ্যাক্ট কমন্স’ (AI Impact Commons) গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফল ব্যবহারিক উদাহরণগুলোকে ভাগাভাগি করা এবং বৃহত্তর পরিসরে প্রসারিত করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
সম্মেলনে নৈতিক মূল্যবোধের ওপর বিশেষ জোর দেওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন সেই সব বিশেষজ্ঞরা, যারা AI উন্নয়নের ক্ষেত্রে কিছু সময়ের জন্য বিরতি বা নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছেন। কারণ, এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা যেমন বিপুল, তেমনি সমাজের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকিও কম নয়। মানুষের কল্যাণে এর বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্ষতির দিকটিও সমানভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে একটি উদ্বেগজনক ঘটনার মাধ্যমে, যেখানে অভিযোগ উঠেছে যে অন্তত একজন তরুণকে আত্মহত্যার পথে প্ররোচিত করতে AI–চালিত চ্যাটবট ChatGPT ভূমিকা রেখেছিল। এ কারণেই প্যারিসে অনুষ্ঠিত আগের সম্মেলনটির নাম রাখা হয়েছিল ‘AI সেফটি সামিট’(AI Safety Summit)।
AI উন্নয়নের দ্রুত প্রতিযোগিতায় সাময়িক বিরতির পক্ষে অনেক বিশিষ্ট বিজ্ঞানীও মত দিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট রাসেল সতর্ক করে বলেছেন, নিয়ন্ত্রণহীন উন্নয়ন মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, গবেষণাগারে পরিচালিত কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, AI সিস্টেম কখনও কখনও বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে মানুষের ক্ষতি করার সিদ্ধান্তও নিতে পারে। অন্যদিকে নারী বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, এই প্রযুক্তিতে লিঙ্গ বৈষম্যের প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে, কারণ অধিকাংশ কোডারই পুরুষ।
এই পরিস্থিতিতে AI ব্যবস্থাকে কেবল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো- যেমন কম্পিউটার, ডেটা সেন্টার, শক্তি, মডেল বা অ্যাপ্লিকেশন, এই দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সামগ্রিক ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও মূল্যায়ন করা জরুরি।একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে, বিশেষ করে ভারতসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর ক্ষেত্রে, তা হলো কর্মসংস্থান। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক AI ইমপ্যাক্ট সামিটে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। এ নিয়ে মূলত দুটি মতবাদ রয়েছে। এক পক্ষের মতে, AI এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে সমাজের অধিকাংশ সাধারণ বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
অন্য পক্ষের মত হলো, প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কাজের ধরন বদলে যাবে এবং নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে, যেমনটা ঘটেছিল শিল্পবিপ্লবের সময়। সম্মেলনে উপস্থিত দেশের শীর্ষ তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা দ্বিতীয় মতের পক্ষেই সওয়াল করেন এবং মূল্য সংযোজনমূলক পরিষেবার ওপর AI–এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগকে কিছুটা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন। তবে একই সময়ে দেশের শেয়ারবাজারে বড় আইটি কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরপতনের মুখে পড়ে। কারণ, Anthropic তাদের Claude Code নামের নতুন AI ব্যবস্থা ঘোষণা করে, যা এই সংস্থাগুলোর দেওয়া অনেক পরিষেবাই নিজে থেকে করতে সক্ষম। পরে Claude–এর আরও উন্নত ক্ষমতার ঘোষণা বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে বিক্রির ঢেউ সৃষ্টি করে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরত লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি হলো, কাজের স্তরের নীচের অংশের অনেক দায়িত্বই AI সিস্টেমের হাতে চলে যেতে পারে। স্বল্পমেয়াদে এর সমাধান হলো কর্মীদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা, যাতে তারা প্রযুক্তির পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় প্রশ্ন হলো, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কীভাবে এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যাতে শিক্ষার্থীরা AI–নির্ভর নতুন পৃথিবীতে টিকে থাকার মতো দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
এই চ্যালেঞ্জ কেবল উচ্চশিক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। সরকারি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে এখনও যথেষ্ট বিনিয়োগ করা হয়নি। যদিও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরেই AI–কে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই উদ্যোগ সফল হতে হলে মৌলিক শিক্ষার মান ও সহায়ক অবকাঠামোকে বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। তবেই দেশের তরুণ জনসংখ্যার সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
এই প্রেক্ষাপটে গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই সম্মেলনে সতর্ক করে বলেছেন, ডিজিটাল বৈষম্য যেন AI বৈষম্যে পরিণত না হয়। এই মৌলিক বিষয়গুলোই নির্ধারণ করবে ভারত ভবিষ্যতেও উদ্ভাবন ও প্রতিভার বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে কি না। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ চিপ ডিজাইনার ভারতে অবস্থান করছেন, যা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে দেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। তবে এই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ভবিষ্যতেও বজায় রাখতে হলে শিক্ষাগত অবকাঠামোর উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
দিল্লিতে গ্লোবাল এআই ইমপ্যাক্ট সম্মেলনের একটি দৃশ্য
প্রতিভার প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল যে, AI–এর ক্ষেত্রে ভারত এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। কিন্তু দিল্লির সাম্প্রতিক সম্মেলন দেখিয়েছে, এই দৌড়ে ভারত এখনও পিছিয়ে পড়েনি। এখানে একাধিক বড় ভাষা মডেল (LLM) উন্মোচিত হয়েছে, যেগুলো বিদেশি ভিত্তিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। ‘সার্বভৌম AI’(Sarvam AI)-এর দিকে অগ্রযাত্রা আরও স্পষ্ট হয়েছে Sarvam AI–এর নতুন মডেল উন্মোচনের মাধ্যমে, যা ২২টি ভাষায় তাৎক্ষণিক কথোপকথন এবং গভীর বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। এর পাশাপাশি Bharatgen, Gnani.ai, Tech Mahindra এবং Fractal Analytics–এর মডেলও প্রকাশিত হয়েছে। এই মডেলগুলোর অনেকগুলোই IndiaAI Mission–এর ফল, যা ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এই সম্মেলন ভারতের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। আগামী কয়েক বছরে AI ও ডিপ টেক খাতে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বড় অঙ্গীকারও। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (Reliance Industries) আগামী সাত বছরে দেশে AI অবকাঠামো গড়ে তুলতে ১১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। আদানি গ্রুপ (Adani Group) ডেটা সেন্টার নির্মাণে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি মাইক্রোসফট (Microsoft) জানিয়েছে, এই দশকের শেষ নাগাদ গ্লোবাল সাউথ অঞ্চলে AI খাতে ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওপেন AI (OpenAI) এবং চিপ নির্মাতা AMD–ও টাটা গ্রুপ (Tata Group)–এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে AI সক্ষমতা গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কিছুটা দেরিতে শুরু করলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যত দুনিয়ায় ভারত দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা এবং বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক বিনিয়োগ করা, যাতে ভবিষ্যতের অগ্রবর্তী প্রযুক্তির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়।