দেবকিশোর চক্রবর্তী
বাংলাদেশের যশোর জেলার কেশবপুরে সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। তাঁদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্নে এক গুরুতর সতর্কবার্তা।
নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী পেশাগতভাবে যুক্ত ছিলেন নড়াইল থেকে প্রকাশিত দৈনিক বিডি খবর-এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক হিসেবে। একই সঙ্গে তিনি একজন ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তাও ছিলেন। তাঁর হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশ্যে আসতেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় মহলে প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠে।
সমাজ কর্মী হালিমা খাতুন
সুন্দরবন অঞ্চলের দাবাং নামে পরিচিত বিশিষ্ট সমাজকর্মী হালিমা খাতুন বলেন, "পশ্চিমবঙ্গের একজন মুসলিম নাগরিক হিসেবে আমি এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের নিঃশর্ত নিন্দা জানাই। সাংবাদিকরা সমাজের বিবেক—তাঁদের কণ্ঠ রোধ করা মানে গণতন্ত্রকেই হুমকির মুখে ফেলা। ইসলাম শান্তি, ন্যায় ও নিপীড়িত মানুষের সুরক্ষার কথা বলে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন সাংবাদিককে এভাবে হত্যা করা সেই মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা। সব ধর্মের মানুষের উচিত এর বিরুদ্ধে একযোগে প্রতিবাদ করা।"
সাংবাদিক জাফর আলি খান
কলকাতা সুপরিচিত প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক জাফর আলি খান বলেন, “একজন সাংবাদিককে এভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই শুধুমাত্র একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দেখা যায় না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। সেখানে এমন আঘাত গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই উদ্বেগজনক। ধর্ম বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এই অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরি।”
পশ্চিমবঙ্গের একটি জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলের আপোষহীন সাংবাদিক সফিকুল ইসলাম বলেন,“বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্নগুলি দীর্ঘদিন ধরে উঠছে, রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকাণ্ড সেগুলিকে আরও জোরালো করেছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি না হলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠবে।”
বিশিষ্ট ক্রিকেট প্রশিক্ষক আব্দুল মুনায়েম
একই ধরনের প্রতিক্রিয়া শোনা যায় বঙ্গ ক্রিকেটের সফল প্রশিক্ষক আব্দুল মুনায়েম-এর কণ্ঠে। তিনি বলেন,“পশ্চিমবঙ্গের সচেতন মুসলিম সমাজ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি গভীরভাবে লক্ষ্য করছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের উপর ধারাবাহিক হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধরনের সহিংসতা সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।”
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর একাধিক সহিংস ঘটনার খবর সামনে এসেছে, যা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং ও জনতা-নির্ভর সহিংসতা একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে, যার প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। ভারত সরকার ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনায় একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
২০২২ সালের জনগণনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ-এ হিন্দু জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৯৫ শতাংশ। মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডকে তাঁরা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চোখে নয়, বরং মানবতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দেখছেন। তাঁদের দাবি, দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই পারে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে।