পিক্সেলের CEO আওয়াইস আহমেদ: ছোট্ট গ্রামের স্বপ্ন থেকে মহাকাশে ‘শকুন্তলা’র যাত্রা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 5 h ago
পিক্সেলের CEO আওয়াইস আহমেদ
পিক্সেলের CEO আওয়াইস আহমেদ
 
সানিয়া আঞ্জুম 

কর্নাটকের আলদুর গ্রামের এক কৌতূহলী বালকের মহাকাশকে ঘিরে দেখা স্বপ্ন আজ বাস্তবের পথে এগিয়ে চলেছে। পিক্সেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আওয়াইস আহমেদের যাত্রা শুধু রকেট, উপগ্রহ কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কাহিনি নয়; এর সঙ্গে মিশে রয়েছে শৈশবের স্বপ্ন, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই, এক তরুণ উদ্যোক্তার অনিশ্চয়তাপূর্ণ পথচলা এবং এক অপ্রত্যাশিত বিনিয়োগ চুক্তির আবেগঘন অধ্যায়। সেই চুক্তির সূত্রেই পিক্সেলের একটি উপগ্রহের নাম রাখা হয় ‘শকুন্তলা’, বিনিয়োগকারী দুই ভাইয়ের মায়ের নামে। কৌতূহল থেকে উদ্ভাবন এবং ব্যক্তিগত আবেগ থেকে মহাকাশ অভিযানের এই যাত্রা দেখিয়ে দেয়, বড় স্বপ্নের পিছনে কখনও কখনও বিজ্ঞানের পাশাপাশি কাজ করে মানুষের বিশ্বাস, সম্পর্ক ও সাহস।
 
পিক্সেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও (CEO) আহমেদ ছোটবেলা থেকেই মহাবিশ্বের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। তাঁর বাবা বাড়িতে বিশ্বকোষ নিয়ে আসতেন, যা তাঁকে গ্রামের সীমানার বাইরের এক বিশাল জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিত। আহমেদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, “মহাকাশ আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে।” এমন এক সময়ে, যখন ইন্টারনেটের সুযোগ ছিল সীমিত, তখন বইই হয়ে উঠেছিল তাঁর কল্পনার বাইরের সম্ভাবনাগুলিকে জানার জানালা।
 
পিক্সেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আওয়াইস আহমেদ
 
পরবর্তী সময়ে তাঁর যাত্রা তাঁকে নিয়ে যায় বিআইটিএস পিলানিতে। সেখানে তিনি গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং শিক্ষার্থীদের পরিচালিত মহাকাশ প্রযুক্তি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হন। পাশাপাশি, তিনি হাইপারলুপ ইন্ডিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং লিড হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এটি ছিল একটি ছাত্রদল, যারা স্পেসএক্সের হাইপারলুপ প্রতিযোগিতার জন্য একটি পরিবহণ পড তৈরি করেছিল। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছিল, আগে থেকে তৈরি কোনও নকশা বা নির্দেশিকা না থাকলেও কীভাবে নতুন কিছু তৈরির চেষ্টা করতে হয়। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “হাইপারলুপ পড কীভাবে তৈরি করতে হয়, তা গুগলে সার্চ করে জেনে নেওয়া যায় না।”
 
তাঁর এই উপলব্ধি তাৎক্ষণিক উত্তর পাওয়ার যুগে বেড়ে ওঠা তরুণদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা তুলে ধরে। বর্তমানে তথ্য পাওয়া আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় অনেক সহজ। কিন্তু অর্থবহ উদ্ভাবনের জন্য এখনও প্রয়োজন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, দলগত প্রচেষ্টা এবং এমন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার সাহস, যার উত্তর সহজে পাওয়া যায় না।
 
২০১৯ সালে আহমেদ এবং তাঁর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্ষিতিজ খান্ডেলওয়াল মিলে পিক্সেল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল অত্যাধুনিক হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং প্রযুক্তিতে সজ্জিত উপগ্রহ তৈরি করা। প্রচলিত উপগ্রহচিত্রের তুলনায় হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং আলোর অসংখ্য তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। এর ফলে ফসল, উদ্ভিদরাজি এবং পরিবেশের পরিবর্তন সম্পর্কে এমন সূক্ষ্ম তথ্য জানা সম্ভব হয়, যা অন্যথায় সহজে নজরে আসে না।
 
লক্ষ্যটি ছিল অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু বাস্তবের চ্যালেঞ্জগুলিও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ সংস্থাটির প্রয়োজন ছিল বিনিয়োগ, নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণের সুযোগ এবং ক্রমবিকাশমান বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের জটিল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। পিক্সেলের শুরুর দিনগুলির অভিজ্ঞতা থেকে আহমেদের বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, “একটি মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থা গড়ে তুলতে শুধু বৈজ্ঞানিক মেধা থাকলেই হয় না, এর সঙ্গে আরও অনেক কিছু জড়িয়ে থাকে।”
 
 
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “আমরা সবসময় এমন উৎক্ষেপণের সুযোগ খুঁজি, যা আমাদের সময়সীমা এবং খরচ, দুইয়ের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।” তাঁর এই বক্তব্য উদ্যোগপতিদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। বড় স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে বাজেট, সময়সীমা এবং কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতিও থাকতে হয়।
 
পিক্সেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আওয়াইস আহমেদ
 
২০১৯ সালে পিক্সেল প্রথমে রাশিয়ার সোয়ুজ উৎক্ষেপণ কর্মসূচির মাধ্যমে উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য বুকিং করেছিল। পরে, ২০২০ সালে ভারত সরকার মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলির অংশগ্রহণের সুযোগ আরও প্রসারিত করার ঘোষণা করার পর, ইসরোর মাধ্যমে উপগ্রহ উৎক্ষেপণের প্রস্তাব পায় সংস্থাটি। এই সুযোগে আনন্দিত হয়েছিলেন আহমেদ। তাঁর কথায়, “আর আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে সেই সুযোগ গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলাম। শুরু থেকেই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সেটাই।”
 
কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোয়নি। উৎক্ষেপণের সময়সূচিতে বিলম্ব ঘটে এবং সংস্থার দলকে এমন সম্ভাবনার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হয় যে, তাদের প্রথম পরীক্ষামূলক অভিযান সফল নাও হতে পারে। মহাকাশ অভিযানের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে বিকল্প ব্যবস্থা রাখার যুক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আহমেদ বলেন, “কারণ মহাকাশে এমনটা ঘটার সম্ভাবনা কখনওই শূন্য নয়।”
 
পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে কিংবা কাজে বিলম্ব ঘটলে যে তরুণরা হতাশ হয়ে পড়েন, তাঁদের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপরীত কিছু নয়। বরং নিজের স্বপ্নকে সত্যিই গুরুত্ব দিয়ে দেখার একটি অপরিহার্য অংশ।
 
এরপর আসে শকুন্তলার গল্প, যা পিক্সেলের প্রাথমিক যাত্রার সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত অথচ ব্যক্তিগত আবেগে ভরা অধ্যায়গুলির অন্যতম। বিনিয়োগ সংগ্রহের চেষ্টা করার সময় কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলার পর এক সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন আহমেদ। তিনি চেয়েছিলেন, দীর্ঘ আলোচনার পর এবার যেন একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়।
 
বিনিয়োগের বিনিময়ে তিনি দুটি প্রতিশ্রুতি দেন। প্রথমত, ভবিষ্যতে যদি আবার ইলন মাস্কের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়, তাহলে ওই বিনিয়োগকারীও তাঁর সঙ্গে গিয়ে ইলন মাস্কের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, পিক্সেলের পরবর্তী উপগ্রহটির নামকরণের সুযোগ পাবেন সেই বিনিয়োগকারী। শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি সম্পন্ন হয়। সংস্থাটিতে বিনিয়োগকারী দুই ভাই তাঁদের মায়ের নামে উপগ্রহটির নাম রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এই নামকরণের কারণ ব্যাখ্যা করে আহমেদ বলেন, “শকুন্তলা তাঁদের মায়ের নাম। তাই এটি ছিল তাঁদের মায়ের জন্য একটি উপহার।”
 
পিক্সেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আওয়াইস আহমেদ
 
এই ছোট্ট ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অসাধারণ তাৎপর্য। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়ানোর জন্য তৈরি একটি উপগ্রহের নাম কোনও ইঞ্জিনিয়ার কিংবা কমিটি ঠিক করেনি; বরং দুই ভাই তাঁদের মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে এই নাম বেছে নিয়েছিলেন। জটিল যন্ত্রপাতি এবং প্রযুক্তিগত হিসাব-নিকাশের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশ, যা সম্ভব হয়েছিল একটি কথোপকথন এবং একটি তরুণ সংস্থার উপর আস্থা রাখার সাহসের মাধ্যমে।
 
আহমেদ আরও ব্যাখ্যা করেন, প্রাথমিক পর্যায়ে পাওয়া এই বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি কীভাবে পরবর্তীকালে আরও বড় অঙ্কের অর্থসংগ্রহের পথ সুগম করেছিল। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় যে, উদ্যোগপতি হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু নতুন ধারণাই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন সম্পর্ক, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং এমন একটি ভবিষ্যতের পক্ষে অন্যদের আস্থা অর্জনের ক্ষমতা, যা তখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি।
 
মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহারিক দিকগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাক্ষাৎকারের সময় উৎক্ষেপণের খরচ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আহমেদ অনুমান করেছিলেন, স্পেসএক্সের রাইডশেয়ার কর্মসূচিতে প্রতি কিলোগ্রাম উপগ্রহের জন্য উৎক্ষেপণ খরচ ছিল প্রায় ৬,০০০ মার্কিন ডলার। ইসরোও তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উৎক্ষেপণের সুযোগ দিচ্ছিল বলে তিনি জানান। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, খরচ, সময় এবং প্রয়োজনীয় কক্ষপথে পৌঁছতে সক্ষম রকেটের প্রাপ্যতার উপর ভিত্তি করেই পিক্সেল উৎক্ষেপণের সুযোগ বেছে নিত। কারণ, তৈরি হয়ে যাওয়া উপগ্রহগুলিকে উপযুক্ত উৎক্ষেপণের অপেক্ষায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বসিয়ে রাখার মতো আর্থিক সামর্থ্য সংস্থাটির ছিল না।
 
অবশেষে ২০২৪ সালে শকুন্তলা নিজের অভিযান সম্পন্ন করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। কক্ষপথে তার অবস্থানের সময়সীমা নির্দিষ্ট ছিল, কিন্তু এই অভিযান পিক্সেলের প্রাথমিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। এরপরও সংস্থাটি নিজেদের উপগ্রহ প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চালিয়ে যায়। এই অভিযান বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির একটি বৃহত্তর সত্য তুলে ধরে, প্রতিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তা সম্পূর্ণ সফল হোক কিংবা ত্রুটিপূর্ণ, ভবিষ্যতের উন্নতির পথে অবদান রাখতে পারে।
 
আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য আহমেদের যাত্রা মহাকাশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বৃহত্তর এক বার্তা বহন করে। তাঁর কথায়, “শুরু করার আগে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা জরুরি নয়। প্রয়োজন শেখার মানসিকতা, সমস্যার সমাধানে নিরলস পরিশ্রম করার শৃঙ্খলা এবং নিজের ধারণাকে সমর্থন করার জন্য অন্যদের কাছে সাহায্য চাওয়ার আত্মবিশ্বাস। প্রত্যেক তরুণ উপগ্রহ তৈরি করবে না ঠিকই, কিন্তু প্রত্যেকেই কৌতূহল ও দৃঢ়সংকল্পকে কাজে লাগিয়ে সমাধানের যোগ্য কোনও সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে।”
 
আওয়াইস আহমেদ  তাঁর পরিবারের সঙ্গে 
 
আলদুরে বিশ্বকোষ পড়া থেকে শুরু করে মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণকারী একটি সংস্থার নেতৃত্ব দেওয়া পর্যন্ত আহমেদের যাত্রা দেখায়, কোনও আগ্রহকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে অনুসরণ করলে তা কীভাবে আরও বৃহত্তর সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে পারে। তাঁর গল্প সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কোনও সরল পথের কাহিনি নয়। বরং এটি উপযুক্ত সুযোগকে চিনে নেওয়া, প্রতিকূলতার মোকাবিলা করা এবং ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার গল্প।
 
আর সম্ভবত এই কারণেই শকুন্তলার কাহিনি এত স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী যাত্রাগুলিও গড়ে ওঠে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে। শৈশবের একটি স্বপ্ন, এক প্রতিষ্ঠাতার দৃঢ়সংকল্প, একটি ধারণার উপর দুই ভাইয়ের বিশ্বাস এবং একজন মায়ের নাম, সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে এই একই কাহিনি।
 
আকাশের দিকে তাকালে নক্ষত্রগুলিকে আমাদের কাছে কখনও কখনও অসম্ভব দূরের বলে মনে হয়। কিন্তু প্রতিটি অসাধারণ যাত্রার সূচনা হয় কোনও সাধারণ জায়গা থেকেই, একটি প্রশ্ন, সামান্য কৌতূহল এবং প্রথম পদক্ষেপটি নেওয়ার সাহসের মধ্য দিয়ে।


শেহতীয়া খবৰ