আমিনুরের হাতেই তৈরি হয় কোচবিহারের ঐতিহ্য ৩৪ ফুটের ‘রাসচক্র’! ধর্ম আলাদা হলেও ঐতিহ্যের টানে বেঁচে আছে ২০০ বছরের সম্প্রীতির পরম্পরা

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 6 h ago
শিল্পী আমিনুর হোসেন
শিল্পী আমিনুর হোসেন
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

কোচবিহারে মুসলিম পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের হাতে আজও বেঁচে রয়েছে মদনমোহনের রাস উৎসবের ঐতিহ্য। এখানে ঐতিহ্য আর সম্প্রীতির বন্ধনকে জুড়ে দিয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শিল্পী আমিনুর হোসেন। কোচবিহার জেলার একটি মুসলিম পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের প্রতিনিধি তিনি। অথচ তাঁর নিঁপুন হাতের ছোঁয়ায় গড়ে উঠছে হিন্দু ধর্মের অন্যতম পবিত্র উৎসব মদনমোহন ঠাকুরের রাস উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ৩৪ ফুটের বিশাল ‘রাসচক্র’।

শোনা যায়, দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসছে এই নিয়ম। পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে আজও এই কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন আমিনুর। তাঁর হাতের প্রতিটি বাঁশের কাঠিতে গড়ে ওঠা শিল্পকর্ম মনে করিয়ে দেয় বাংলার মাটিতে ধর্মের ঊর্ধ্বে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর।
 

কোচবিহারের হরিণচওড়া এলাকায় তোর্সা নদীর তীরে নিজের বাড়িতেই কাজে মগ্ন শিল্পী। বাঁশ সহ নানা সরঞ্জাম নিয়ে রাসচক্র তৈরির কাজে ব্যস্ত আমিনুর। বাঁশ, রঙিন কাগজ, আঠা, সুতো সহ একের পর এক উপকরণ থেকেই রূপ নিচ্ছে বিশাল এই কাঠামো। নিঁখুত হতে হবে এই কাজটি। তাই এই রাসচক্র বানাতে প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন নিখুঁত মাপজোক, অভিজ্ঞতা ও ধৈর্য।
 
আমিনুরের কথায় জানা যায়, প্রায় এক মাস ধরে চলবে এই কর্মযজ্ঞ। ধর্মীয় আচার ও তিথি মেনে সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার গ্রহণ করে লক্ষ্মীপুজোর দিন থেকে কাজে হাত দিয়েছেন তিনি। কারণ, আমিনুরের কাছে রাসচক্র তৈরি করা হল পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া এক গুরুদায়িত্ব।
 
ইতিহাস বলছে, মহারাজা হরেন্দ্র নারায়ণের আমলে দুই শতাব্দীরও বেশি আগে মদনমোহনের রাস উৎসব ভেটাগুড়িতে শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ধলুয়াবাড়ি হয়ে ১৮৯০ সালে বর্তমান মদনমোহন ঠাকুরবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে স্থায়ী রূপ পায় এই উৎসব। আর ঠিক ওই সময় থেকেই আমিনুরের পরিবার রাসচক্র নির্মাণের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
 
শিল্পী আমিনুর হোসেন
 
কথা বলে জানা যায়, আমিনুরের দাদুর বাবা পান মহম্মদ মিয়াঁর হাত ধরে শুরু হয়েছিল ‘রাসচক্র’ তৈরির এই পরম্পরা। এরপর তাঁর বাবা আলতাফ মিয়াঁ সেই দায়িত্ব সামলে এসেছেন। বর্তমানে ওই মুসলিম পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে টানা চার বছর ধরে সেই ঐতিহ্যের ভার আমিনুর হোসেন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
 
দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ড সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ২৪ নভেম্বর মদনমোহন ঠাকুরবাড়িতে শুরু হওয়ার কথা ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের। জানা গেছে, ওই দিন রাত ৯টায় দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ডের সভাপতি তথা কোচবিহারের জেলাশাসক রাসচক্র ঘুরিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করবেন। বলা ভালো, সেই বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণের আগে আমিনুরের হাতে তৈরি হচ্ছে উৎসবের অন্যতম প্রধান প্রতীক।
 
তবে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াইয়ের আড়ালে থাকে দুশ্চিন্তাও। রাসচক্রের শিল্পী আমিনুরের আক্ষেপ, বর্তমান বাজারে এই কাজের জন্য আশানুরুপ পারিশ্রমিক মেলে না। ফলে আগামী দিনে এই পারিবারিক পরম্পরা ধরে রাখা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি।
 
শিল্পী আমিনুর হোসেন
 
আসল কথা হলো, এই রাসচক্র প্রস্তুত করতে লেগে যায় কয়েক সপ্তাহ। শ্রম, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা মিশিয়ে কাজ করার পরও যথাযথ মূল্য না পেলে হয়ত একসময় হারিয়ে যেতে পারে বহুদিনের এই শিল্প। তাই রাসচক্রের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি শিল্পীর শ্রমের মর্যাদা পাওয়া দরকার। ধর্মের পরিচয় নিয়ে নানা বিভাজনের কথা শানা গেলেও কোচবিহারের এই পরম্পরা মনে করিয়ে দেয় সম্প্রীতি বেঁচে থাকে মানুষের কাজের মধ্যে। বেঁচে থাকে প্রজন্মের উত্তরাধিকারে।
 
তাই বলা যেতে পারে, আমিনুরের হাতে তৈরি ৩৪ ফুটের রাসচক্র এ বাংলার মিলেমিশে বেঁচে থাকার ইতিহাসেরও প্রতীক। তার প্রতিটি বাঁকে জড়িয়ে রয়েছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, শিল্পীর নিষ্ঠা আর ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়া মানবিকতার বার্তা। যেখানে ধর্মের পরিচয় নয়, মানুষের কাজই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় পরিচয়।